বঙ্গবন্ধুর সৃজিত পদ আর বাড়েনি : নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকের পদায়ন না করায় বাড়ছে ভেজাল

বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও শুধুমাত্র ভেজালের কারণে দেশের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষই অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন। যেকেনো খাদ্য নমুনার শতকরা ৫০ ভাগেই মিলছে ভেজাল। অপর্যাপ্ত নজরদারিতে সুপার শপেও বিক্রি হচ্ছে পচা মাছ, মাংস, ফলমূল। খাবারে ভয়াবহ এই ভেজালের কারণে ইতোমধ্যে দেশে দুই শতাধিক রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। খাদ্যে ভেজাল বন্ধে ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ৫৫৬টি সেনেটারি ইন্সপেক্টরের পদ সৃষ্টি করেছিলেন গত সাড়ে চার দশকে তা আর বাড়ানো হয়নি। বঙ্গবন্ধুর গড়ে তোলা পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটেরও একই পরিস্থিতি। জনগণের নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৪ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণয়ন করলেও পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির পর সামরিক শাসকরা জনগণের খাদ্য-পুষ্টি উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপই নেয়নি।

তবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নেন। ১৯৫৯ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ রহিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন করে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রণয়ন’ করেন। একই সঙ্গে স্বতন্ত্র সংস্থা ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ও গঠন করেন। তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগের ৫৫৬ ও স্থানীয় সরকারের ৮৩ জন মিলে ৬৩৯ সেনিটারি ইন্সপেক্টর দিয়ে সারা দেশের ২৫ লক্ষাধিক খাদ্য স্থাপনার নিবন্ধনসহ ২৪ ঘণ্টার নজরদারি কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যে ভয়াবহ ভেজাল প্রতিরোধে দেশের দুই হাজার ২০০ জন সেনেটারি ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীর পদায়নের দাবি জানিয়েছেন স্বাধীনতা সেনিটারিয়ান পরিষদ-স্বাসেপ নেতারা। গত ১৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এ ব্যাপারে তারা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাও দিয়েছেন।

স্বাসেপ নেতাদের দাবি, জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে। খাবারে ভেজালের কারণে দুই শতাধিক রোগের প্রকোপ দেখা দেয়ায় ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে সরকারের ঘোষিত ‘রূপকল্প-২০২১’ সামনে রেখে সঠিক কর্মসূচি অনুসরণ ও সম্ভাবনাময় বিশাল কর্মবাহিনী সেনেটারি ইন্সপেক্টর ডিপ্লোমাধারীদের নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে পদায়ন করার দাবি তুলেছেন তারা। পরিদর্শকদের নজরদারি ও তদারকি কর্মকাণ্ড বৃৃদ্ধি পেলে একদিকে যেমন খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে, তেমনি খাদ্য স্থাপনার প্রিমিসেস ফি/নবায়ন ফি বাবদ প্রতিবছর আড়াইশ থেকে পাঁচশ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হবে। পাশাপাশি নতুন সৃষ্ট রোগ নিয়ন্ত্রণ, জনগণের চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস, চিকিৎসা খাতে বিদেশে হাজার কোটি টাকা পাচার রোধ করা সম্ভব হবে।

গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে স্বাসেপ নেতারা তাদের প্রস্তাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। চলমান এসডিজি ও সরকারের ‘উন্নয়ন কর্মসূচি-২০৪১’ আলোকে প্রস্তাবনায় সারা দেশে নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক/সেনিটারি ইন্সপেক্টরের ৬৬৯৪টি পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়। প্রস্তাবনার আলোকে পরামর্শ তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন বিভাগের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. জসিম উদ্দিন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব রফিকুল ইসলাম মিলন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন আহমদ।

স্বাসেপের সাংগঠনিক উপদেষ্টা এম খছরু চৌধুরী বলেন, দেশে প্রায় ২৫ লাখ খাদ্য স্থাপনায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টি করা পদের বাইরে একটি পদও সৃষ্টি হয়নি। শুধুমাত্র তদারকির অভাবেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে দেশে ৬৩টি আইন থাকলেও তার ফলপ্রসূ প্রয়োগ না থাকায় দিন দিন খাদ্য ঝুঁকি বাড়ছে। ভেজাল খাদ্যে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে দেশ। স্বাসেপের সদস্যসচিব এনামুল হক মোল্লা বলেন, খাদ্যে ভেজালের ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য কে বা কারা দায়ী তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারবেন সেনেটারি ইন্সপেক্টরা। তাই দেশের ২ হাজার ২৮৭ জন ইন্সপেক্টরকে কাজে লাগালে আগামী দুই/তিন বছরের মধ্যেই ভেজালের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, বিশ্বের সব দেশেই খাদ্যে ভেজাল দেয়া অভিযুক্তদের কঠোর বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তবে আমাদের দেশে অভিযোগকারীদের এক সময় অভিযুক্তদের সঙ্গে হাত মেলাতে দেখা যায়। তিনি আরো বলেন, খাদ্য পরিদর্শকরা কতজন ভেজালকারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সেটাই দেখার বিষয়। দেশপ্রেম ও সততার সঙ্গে সবাই সক্রিয় হলে খাদ্যে ভেজাল শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj