এক টাকার মাস্টার

বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯

ফেরদৌস জুয়েল, গাইবান্ধা থেকে : গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারি ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের মো. লুৎফর রহমান। মাস শেষে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে যারা প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়তে পারে না ৬৬ বছর বয়সী এই গৃহশিক্ষক প্রতিদিন হেঁটে এমন ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি গিয়ে পাঠদানের পর প্রতিজনের কাছ থেকে মাত্র এক টাকা করে নিতেন বলে কালক্রমে তিনি পরিচিতি হয়ে উঠেন এক টাকার মাস্টার হিসেবে। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এক টাকা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান করিয়েছেন। অভাবের সংসার চালাতে না পেরে বর্তমানে তিনি প্রতিজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তিন থেকে পাঁচ টাকা করে নেন।

১৯৫০ সালের ৭ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা লুৎফর রহমান ১৯৭২ সালে স্থানীয় গুনভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরিতে যোগ দেন। তখন ছাত্রছাত্রীরা বিদ্যালয়মুখী ছিল না। তিনি শিশুদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিতেন। সে সময় বিদ্যালয় ছুটির পর বিনা পয়সায় বাড়িতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ানো শুরু করেন লুৎফর রহমান। সেই থেকে শুরু।

১৯৭৪ সালের দিকে বসতভিটা ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পড়ে নদীতে সব বিলীন হয়ে গেলে লুৎফর রহমান পরিবারসহ আশ্রয় নেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারি ইউনিয়নের ডাকাতিয়া গ্রামে। এ গ্রামে এসেও লুৎফর রহমান ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া শেখানো চালিয়ে গেছেন। বিনিময়ে এখানেই প্রতিজনের কাছ থেকে প্রতিদিন পাঠদানের জন্য নেয়া শুরু করেন এক টাকা করে। এখানেও ঠাঁই হয়নি তার। এ বাড়িও নদী ভাঙনের কবলে পড়লে ১৯৮৭ সালের দিকে আশ্রয় নেন একই ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। পরিবারে স্ত্রী লতিফুল বেগম গৃহিণী, দুই মেয়ে লিম্মি ও লিপির বিয়ে দিয়েছেন। আর দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে লাভলু মিয়া এসএসসি পাস করার পর অর্থাভাবে আর পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। তিনি এখন ইজিবাইক চালান। আর অপর ছেলে লিটন মিয়া একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন।

বাগুড়িয়া গ্রামের কাঠমিস্ত্রি মজিদ মিয়া (৩৮) ও মাছ ব্যবসায়ী ডাবারু বর্মণ (৪৬) বলেন, মাসে ৪০০-৫০০ টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। তাই লুৎফর স্যারের কাছে অল্প টাকায় পড়াচ্ছি। এতে আমাদের অনেক উপকার হচ্ছে।

কেন এক টাকা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো শুরু করেছিলেন জানতে চাইলে লুৎফর রহমান বলেন, নদী ভাঙনে নিঃস্ব হওয়া গরিব এলাকা এটি। বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের পড়াতে চাইতেন না। তাই মাত্র এক টাকা করে নিয়ে পড়ানো শুরু করি। দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালকের ছেলেমেয়েরা তো মানুষ হবে। আমার অনেক ছাত্রছাত্রী আজ ভালো চাকরি করছে। এটাই আমার আনন্দ।

সারাদেশ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj