বুড়োখোকার বাবা : শাহনেওয়াজ চৌধুরী

বুধবার, ১২ জুন ২০১৯

‘আজকাল কি যখন-তখন বাবার কথা মনে পড়ে তোর?’

‘সব সময়ই মনে পড়ে। বাবার কথা কি দিনক্ষণ বেছে মনে পড়বে?’

‘তা নয়। কিন্তু আজকাল খুব বেশি মনে করছিস বাবাকে। সে দিন বাবার কথা মনে করে কেঁদেছিস! তুই তো দেখছি ছোট্ট খোকার মতো বাবার কথা মনে করে কাঁদিস! কিন্তু তোকে তো এখন আর ছোট্ট খোকা বলা যাবে না। বলতে হবে বুড়োখোকা।’ কথাটা বলে বাবা হাসলেন।

বাবার প্রাণখোলা হাসি দেখল বুড়োখোকা। দেখে ভালো লাগল তার। কিন্তু বাবার হাসি দেখতে দেখতে ভেতরে ভেতরে একটু লজ্জা পেল। ওই যে বাবা বললেন- ‘বাবার কথা মনে করে চুপি চুপি কাঁদছিস!’

হ্যাঁ, সে চুপি চুপিই কেঁদেছে সে দিন। যেন কারো চোখে পড়ে না যায়। তবু বাবা কেমন করে দেখে ফেললেন! শুধু শুধু কি বাবা তাকে বুড়োখোকা বলে ডাকলেন!

ভাবতে ভাবতে মুহূর্তে লজ্জা কেটে গেল বুড়োখোকার। কাঁদবে না? বাবার জন্য তার কান্না পেতেই পারে! এসব ভাবছিল বুড়োখোকা, তখনই বাবা বললেন, ‘কাঁদবি না। কাঁদলে আরো বেশি মন ভারী হয়। বাবার কথা মনে করে কেন এত মন ভারী করবি?’

কী যে বোকার মতো কথা বলেন বাবা! বাবার কথা কার না মনে পড়ে! যার বাবা নেই, তারই তো বাবার কথা বেশি বেশি মনে পড়ে। ভাবতে ভাবতে বুড়োখোকার চোখ ভিজে উঠল আবার।

বাবা বললেন, ‘এই যে এখন আবার কাঁদতে শুরু করেছিস!’

বুড়োখোকা থামে। কিন্তু বাবার ওপর খুব রাগ ধরল তার। বাবাকে সে বলল, ‘আচ্ছা তোমার বাবা যখন দূরে থাকতেন, তখন তোমার কি বাবার কথা মনে পড়ত না?’

‘হ্যাঁ পড়ত। গ্রামে থাকতাম আমরা। বাবা দূর শহরে যেতেন। সেখানে চাকরি করতেন। মাঝেমধ্যে দিন কয়েকের ছুটিতে বাড়ি আসতেন।

তারপর ছুটি কাটিয়ে যখন চলে যেতেন, তখন কী যে খারাপ লাগত আমাদের! আমি তখন দূর শহরটার কথা কল্পনা করতাম। যেখানে আমার বাবা থাকেন।’ একটু থেমে বুড়োখোকার বাবা বললেন, ‘কিন্তু তোর বাবাকে মনে করা আর আমার বাবাকে আমার মনে করার মধ্যে পার্থক্য আছে।’

‘হ্যাঁ, তা তো আছেই। তোমার বাবা দূর শহরে যেতেন। তখন বাবাকে মনে করে তোমার যতই মন খারাপ হতো, তুমি জানতে- সময় হলে তোমার বাবা ঠিক ফিরে আসবেন। কিন্তু আমার বাবা? আমার বাবা তো আর কখনো ফিরে আসবে না!’ বলতে বলতে বুড়োখোকার গলা ধরে এল।

বুড়োখোকাকে স্বাভাবিক করতে বাবা বললেন, ‘তোর কথাই ঠিক। কিন্তু একটু অন্যভাবে চিন্তা করে দ্যাখ- যখন বুড়ো হয়ে আমার বাবা মরে গেলেন, তার কথা মনে পড়লে কেবল মনের চোখে তার মুখটাকে দেখতে হতো। তোর কাছে তো তোর বাবার একটা ছবি আছে। আমার কাছে তাও ছিল না। তখন একটা ছবি তুলে রাখার গুরুত্ব কে অত বুঝত!’

তার বাবা তো ঠিকই বলেছেন! -নিজ মনে ভাবে বুড়োখোকা। কথাটা বুঝতে পেরে মাথা দুলতে থাকল তার। যেন বাবার কথাটা খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। বাবার কথাটা মনে ধরেছে তার।

বাবা বললেন, ‘কিন্তু ছবির চেয়েও তোর বাবাকে মনে করার মতো আরো কত কী আছে! কেবল দেখার মতো চোখ থাকা চাই। বোঝার মতো মন থাকা চাই।’

বাবার এমন কথা শুনে বুড়োখোকার মনে এক অদ্ভুত ভাবনা খেলে গেল। তাহলে কি বাবা তার আশপাশেই আছেন? বাবার কথা মনে করে সে ওভাবে কাঁদে বলেই কি বাবা তার কাছে আসেন না? হয়তো তাই! ভাবতে ভাবতে অদ্ভুত চোখে বাবার মুখের দিকে তাকাল বুড়োখোকা।

অমন অদ্ভুত চোখে বুড়োখোকাকে তাকাতে দেখে বাবা একটু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘তুই যা ভেবেছিস তার অনেকটাই ঠিক। তোর বাবাকে শুধু খুঁজে নিতে হবে তোকে।’

বুড়োখোকা অবাক হলো। বাবা তার ভাবনার কথা বুঝলেন কীভাবে? কিন্তু অবাক হওয়ার চেয়ে আগ্রহভরা কণ্ঠে বুড়োখোকা জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন করে খুঁজে নেব?’

বাবা আরেকটু হেসে নিলেন। তারপর বললেন, ‘তুই আসলেই বুড়োখোকা। সেই ছোটবেলার মতো বোকাই রয়ে গেছিস!’

বাবার কথায় আরেকবার লজ্জা পেল বুড়োখোকা। তবু সেই আগ্রহভরা দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকল সে। মনের ভেতরে প্রচণ্ড তাড়া- বাবা জলদি বলে ফেলুক কেমন চোখে তাকালে বাবাকে দেখতে পাব। এতটা বছর গেল, একবারো কি বাবাকে দেখার মতো চোখে তাকায়নি সে? মুখ ফুটে কাউকে বলেনি, কিন্তু তার চোখ দুটি কি বাবাকে খোঁজেনি? সেই যে অনেক বছর আগে, অনেক রাতে মা তার ঘুম ভাঙিয়ে ছিলেন- ‘খোকা ওঠ। তোর বাবা চলে যাচ্ছে।’

ঘুম ঘুম চোখে বুড়োখোকা দেখল- সত্যি তার বাবা চলে যাচ্ছেন। ওকে বুকে জড়িয়ে বাবা বলেছিলেন- ‘তোর জন্য দেশ আনতে যাচ্ছি বাবা। কিন্তু দেশটাকে কি খুব সহজে আনা যায়? যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনতে হয়।’

বুড়োখোকা তখন ক্লাস টুয়ে পড়ে। সেই থেকে বাবার অপেক্ষায় থেকেছে সে। বাবা তার জন্য দেশ নিয়ে ফিরবেন।

কিন্তু বাবা ফেরেননি। অপেক্ষায় থেকে থেকে বুড়োখোকা মাকে জিজ্ঞেস করে বাবার কথা- ‘বাবা কবে আসবে মা?’

মা বলতেন- ‘তোর বাবা তোর জন্য দেশ নিয়ে ফিরবে।’ বলেই কেঁদে ফেলতেন।

মা ওভাবে কেন কাঁদতেন, বুঝতে পারত না বুড়োখোকা। কেবল এইটুকু বুঝতে পেরেছিল- বাবার কথা জিজ্ঞেস করলেই বুঝি মা ওভাবে কাঁদবেন! তাই সহজে জিজ্ঞেস করত না।

আরেকটু বড় হয়ে বুড়োখোকা ঠিক বুঝতে পেরেছিল- দেশ আনার কথা বলে বাবা আসলে কোথায় গিয়েছিলেন। আর হয়তো ফিরে আসবেন না! কেবল এইটুকু বুঝতে পারেনি- বাবা কথা রেখেছেন। সে আর ফিরে না এলেও দেশটাকে ঠিকই দিয়ে গেছেন তার খোকাকে।

হ্যাঁ, এখন বুঝতে পারছে বুড়োখোকা- বাবার কথা-ই ঠিক। দেশটাকে খুব সহজে আনতে পারেননি বাবা। বুকের রক্ত ঢেলে দিতে হয়েছে। আর সেই রক্তহীন বুকের ভেতরে আগলে রাখা দেশটাকে তার খোকার জন্য রেখে গেছেন।

বাবার বলা ওই কথাটার অর্থও এখন ঠিক বুঝতে পারছে বুড়োখোকা- সত্যি, দেখার মতো চোখ থাকতে হয়। বোঝার মতো মন থাকতে হয়।

এই যে সকালবেলা ঘাসের ডগায় শিশির, কমলা রং রোদ, পাখির শিস- এসব নিয়েই তো এই সুন্দর দেশটা! এই যে গাছের ছায়া, ডানা মেলা হিমেল হাওয়া- এসব নিয়েই আমাদের এই দেশ। আর এই যে রাতের আকাশ, রূপকথার মতো মনকাড়া চাঁদ, থৈ থৈ জোছনা- এই তো আমার দেশ! এমন দেশের খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নেয়া কী যে প্রশান্তির! একাত্তরে এমন সুন্দর দেশটা-ই তো বাবা তাকে দিয়ে গেছেন। এসবের মধ্যেই মিশে আছেন বাবা। এতদিন কেবল এসব দেখার দৃষ্টি ছিল না। তাই দেখতে পায়নি বুড়োখোকা। বুঝতে পারেনি- শুধু তার বাবা কেন? তার মতো কত শত ছেলের বাবা সেই যে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ আনতে গিয়েছেন, আর ফেরেননি!

ভাবতে ভাবতে চোখ ভিজে উঠল বুড়োখোকার। আর আগের মতোই বাবা তাকে কান্না থামাতে বললেন। কেননা বুড়োখোকা যে তার হারিয়ে যাওয়া বাবাকে খুঁজে পেয়ে স্বপ্নে বিভোর, এই স্বপ্নটা যেন মুছে না যায়! জমতে থাকা রাশি রাশি স্বপ্নগুলো যেন সবার চোখে ছড়িয়ে দিতে পারে বুড়োখোকা।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj