বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আজ : ছকে বাঁধা জীবনে কোনো ‘স্বপ্ন’ নেই ওদের

বুধবার, ১২ জুন ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ : তিন বেলা খাওয়া, রাতে ঘুম আর দিন কিংবা মাস শেষে রোজগারের টাকাটা বাবা-মার হাতে তুলে দেয়ার ছকে আটকে আছে স্বপন, সাইদুল, আকাশ ও শম্পার স্বপ্ন। তবে মাঝে মাঝে বাবা-মা, ভাইবোনের সঙ্গে সময় কাটাতে চায় ওরাও। এই চারজনের স্বপ্ন যেমন একই ছকে বাধা, তেমনি ওদের পরিচয়ও এক। ওরা শ্রমজীবী শিশু। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ওরা কাজ করে।

স্বপন (১২) কামরাঙ্গীরচরের হাজী লেহাজউদ্দীন অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। হাজারীবাগের তানিয়া লেদার এন্টারপ্রাইজের কারখানায় কাজ করে সাইদুল (১৩)। মতিঝিলের একটি হোটেলে কাজ করে আকাশ (১২)। আর শম্পা (১৪) শান্তিনগরে গৃহপরিচারিকার কাজ করে।

স্বপন অ্যালুমিনিয়ামের গোলাকৃতি প্লেট মেশিনে ধরে রেখে হাঁড়ি-পাতিল-বাটির আকার দেয়। বয়স কম তাই মজুরিও কম। স্বপন জানায়, দৈনিক প্রায় ১০-১১ ঘণ্টা কাজ করে সপ্তাহে গড়ে ৮০০ টাকা পায় সে। মাঝে খাবারের জন্য কিছু সময় বিরতি মেলে। কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় হাত কাটে। ফোস্কাও পড়ে। কিন্তু কাজ থামে না। সাইদুল ছোট দোকান ঘরটায় এক কোনায় সাইজ করে রাখা শুকনা চামড়ায় খালি হাতেই আঠা লাগিয়ে তৈরি করছে মানিব্যাগ। থাকা খাওয়া বাদে সাইদুল মাসে পায় এক হাজার টাকা। সপ্তাহের ছয় দিন কাজ। শুক্রবার ছুটি। আঠার গন্ধে অনেক সময় মাথা ধরে, শরীর গুলিয়ে আসে সাইদুলের। কিন্তু এ কারণে তো আর কাজ কামাই করা চলবে না।

আকাশের কাজ শুরু হয় সকাল সাড়ে ৮টায়। রাত ১১টা অনেক সময় ১২টা পর্যন্তও কাজ করতে হয় তাকে। থালা-বাসন পরিষ্কার করার কাজ করে আকাশ। খাওয়া দেয় হোটেল মালিক। আর মাস শেষে আকাশ পায় দুই হাজার টাকা।

এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সিলেটের চা বাগানের মেয়ে শম্পা ঢাকায় আসে। খাওয়া-পরা ছাড়া মাস শেষে শম্পা মা-বাবার কাছে পাঠায় চার হাজার টাকা। শম্পার কাজ শুরু হয় ভোর ৭টায়। আর রাত ১২টা অবধি তার দুই হাত চলে সমান তালে। বাসার ছোট বাচ্চাটি দেখভালের দায়িত্ব তারই। শম্পা বলে, বাসার ছোট বাবুটার বয়সী আমার ছোট একটা ভাই আছে। বাবুর সঙ্গে খেলার সময় আমার ভাইটার কথা খুব মনে পড়ে। বাবা-মার জন্যও মন খারাপ হয়।

এই প্রেক্ষাপটে আজ ১২ জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। এ বছর দিবসটি প্রতিপাদ্য ‘শিশুশ্রম নয়, শিশুর জীবন হোক স্বপ্নময়’। দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বাণী দিয়েছেন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রোটেকশন সেক্টরের পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন ভোরের কাগজকে বলেন, যে শিশুর সম্ভাবনা ছিল শিক্ষক হওয়ার, বিজ্ঞানী হওয়ার কিংবা আগামীতে জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার; সে আজকে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামে খেয়ে-পরে বাঁচা ছাড়া অন্য স্বপ্ন দেখতে পারে না। শিশুশ্রম নিরসনে নেয়া কার্যক্রমের একটা বড় কৌশল হওয়া উচিত শিশুদের মাঝে বিকল্প স্বপ্ন তৈরি করা। কাজেই আমরা যদি সত্যিই বিশ্বাস করি শিশুরা আগামী দিনের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তাহলে আমাদের স্বার্থেই শিশুদের স্বপ্ন দেখার পথকে প্রশস্ত করতে হবে। এবারের বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্যও তাই।

তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ঘোষণা করেছি, তা অর্জন করতে হলে অনতিবিলম্বে আমাদের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা হালনাগাদ করে তার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনগুলোকেও কাজে লাগাতে হবে।

এক জরিপে বলা হয়েছে, শিশু শ্রমিকের ৯৪ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। যার বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। মাত্র ৬ শতাংশ শিশুশ্রমিক কাজ করছে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে। মোট ৪৭ ধরনের কাজ করে শিশুশ্রমিক। যে কাজের অধিকাংশই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শিশুশ্রমকে চ্যালেঞ্জ মনে করছে সরকার।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের প্রোগ্রাম অফিসার হালিমা আক্তার জানান, ৩৮টি কাজকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকা তৈরি করছে। সরকারের নতুন সংশোধিত শ্রম আইন-২০১৮তে বলা হয়েছে, ১৪- ১৮ বছরের বয়সী কোনো শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তবে শিশুদের কল্যাণে সরকার ইতোমধ্যে অনেক ভালো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে মন্ত্রণালয় ২৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত এক লাখ শিশুকে প্রত্যাহার করে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা দেয়া হবে। এর আগে সরকার ২০১০ সালে জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি প্রণয়ন করেছে। এই নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিশুশ্রম নিরসন কার্যক্রম মনিটরিং এর জন্য গঠিত জাতীয় বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj