বই বিতর্ক : জবাব দেবে কে?

মঙ্গলবার, ১১ জুন ২০১৯


এ কে খন্দকার তার বইয়ে ভুল তথ্যের জন্য মাফ চেয়েছেন। তার স্ত্রী বলেছেন তিনি নাকি এখন প্রায় উন্মাদ। এসব কথায় এখন আর আগের মতো বিশ্বাস জন্মায় না। কারণ আমরা ঘরপোড়া গরু। তা ছাড়া বাংলা সিনেমায় এমন কত পাগল দেখলাম। যারা নায়িকার বিরহে বা কিছু পাওয়ার জন্য পাগল হতো। আবার পাওয়ার পর পুরো ঠিক। খন্দকার সাহেব ইতিহাসের একজন অনিবার্য মানুষ হওয়ার পরও যা করলেন তার জন্য তাকে পাগল ভাবাও না-জায়েজ। মূলত তিনি যা ভাবেন তাই বলেছিলেন এখন আবার পল্টি খেলেন মাত্র। বই লিখে এমন কাণ্ড কি শুধু তিনি করলেন? সম্প্রতি বিস্মৃতপ্রায় এক বিচারপতির বইয়ের কথা কি আমরা ভুলে যাব? যিনি পাকি কায়দায় সাংবিধানিক ক্যু করার হুমকি দিয়েছিলেন।

এখন এস কে সিনহা দেশে নেই। কিন্তু তিনিই ছিলেন একদা টক অফ দ্য টাউন। বলা উচিত টক অফ দ্য কান্ট্রি। অতিসম্প্রতি তার যে বইটি আলোর মুখ দেখেছে সবাই জানতেন এমন একটা কিছু আসছে। বিদেশে গিয়ে তিনি যেসব কথা বললেন বা লিখলেন তার সবটা যেমন অসত্য না তেমনি অর্ধসত্য মিথ্যার চাইতেও ভয়ঙ্কর। বইটি পড়ে দেখুন বুঝতে পারবেন সবটা তার লেখা নয়। ইতোমধ্যে রটে গেছে চারজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি আছেন এর পেছনে। মজার ব্যাপার এই, যদিও বলা হচ্ছে জামায়াত অর্থায়ন করেছে কিন্তু যে চারজনের নাম এসেছে তারা সবাই বহিরাঙ্গিকে জামায়াতবিরোধী। তাহলে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, সবাই কি তলে তলে এক? না এ কোনো বানোয়াট অভিযোগ? শেখ হাসিনার সরকার গদিতে না এলে সিনহা কি প্রধান বিচারপতি হতে পারতেন? পারতেন না। সে কৃতজ্ঞতা যেমন প্রকাশিত হয়নি তেমনি এটাও বলি, কৃতজ্ঞতা মানে কেবল অন্ধ আনুগত্য নয়। তবে মূল বিষয় হলো ভোটের আগে এই পুস্তিকার প্রকাশনা। নানা ষড়যন্ত্র আর সংঘাতের সমাজ আমাদের। ফলে কোনটা আসল কোনটা নকল বলা মুশকিল। বিষয়গুলো তদন্ত বা চুলচেরা বিশ্লেষণের প্রয়োজন। একজন প্রধান বিচারপতি এভাবে চলে গেলে অনেক কিছু প্রশ্নবিদ্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক।

তবে সিনহা বাবুকে যেমন দেখেছি তাতে এটা নিশ্চিত তিনি হট হেডেড। তার এই গরম মেজাজ আর সরকারের কঠোর অবস্থান মিলে তৈরি হওয়া পরিবেশ আমাদের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে? বিশেষত জবাবদিহিতা? সেটা এখন না বললেও বোঝা যায়। আমি মনে করি সরকারেরও বলার আছে। কেউ জুডিশিয়াল ক্যু’র নামে সরকার উৎখাতের বন্দোবস্ত করবেন আর সরকার কি নীরবে তা হজম করবে? তাও যদি হয় পাকি স্টাইলে। শুরুতে আনুগত্যের পর কোন ইন্ধনে বা কোন প্ররোচনায় এত কিছু ঘটল সেটা বের করে আনা দরকার। আমরা রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ থেকে লতিফ সাহেব হয়ে সিনহা অবধি একটা বিষয় দেখছি কোথাও রাষ্ট্রযন্ত্রে কিছু একটা গলদ আছে। বিব্রত হওয়া থেকে শেষমেষ সাইড বদলে এটাই প্রমাণিত- হয় ভয় নয়, প্রলোভন নয়তো কোনো বিশেষ কারণে সবাই এমন কিছু করতে চান। এই কেনটা যতদিন প্রশ্নবোধক থাকবে এর কোনো সদুত্তর মিলবে না।

এটা বলব, এখন এই টপ অফ দ্য কান্ট্রি আমাদের কারো জন্য হিতকর না। সংবিধানে যেসব প্যাঁচ আছে বা করে রাখা হয়েছে তাতে সিনহার রাষ্ট্রপতি হওয়ার গল্প মানতে পারি না। কিন্তু কিছু একটা নিশ্চয়ই ছিল পেছনে। সবার ওপর এটা সত্য যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে না। সেটাই প্রমাণিত হোক। কুয়াশা কাটুক। দেশ চলুক তার নিজের গতিতে। বিচারপতি যেন অসত্য বলে পার পেয়ে না যান আর যদি তার কথায় সত্য থাকে তারও একটা বিহিত হোক।

আর এ কে খন্দকার তো আমাদের জাতির বারোটা বাজাতে গিয়েছিলেন। এমন সব কথা যা পড়লে মনে হবে বঙ্গবন্ধু আসলে স্বাধীনতা চাননি। জিও পাকিস্তান বলার ব্যাপারটা কি আসলে সত্য? যদি না হয়ে থাকে তাহলে এমন কথা লেখা তাও তার মতো মানুষের কলমে? এ জন্য কি তার শাস্তি হওয়ার বিষয়টা উড়িয়ে দেয়া যায়? বড় আজব দেশ আমাদের। আজব এক সমাজ। কত ছোট ছোট অপরাধে মানুষ প্রাণ হারায়। সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয় আর কত বড় অপরাধ করেও অনেকে পার পেয়ে যায়। আওয়ামী লীগ কি অস্বীকার করতে পারবে যে বিএনপির কেউ কিন্তু এমন করে না। যার মানে এই বিএনপি বন্ধু ও দুশমন চেনে। তাদের দোস্তরা যেমন দুশমনরাও এমন কিছু লেখে না। তাহলে আওয়ামী বেলায় এসব কেন হয়? কোথায় গলদ? মোশতাক থেকে এ কে খন্দকার বা সুরেন্দ্র সিনহা তিনজন তিন কিসিমের তিন ঘরানার মানুষ। এমনকি ধর্মও আলাদা। তারপরও সবাই মিলে যা করলেন তার নাম ইতিহাস আর আওয়ামী বিরোধিতা। এর জবাব আওয়ামী লীগকে দিতেই হবে। নিজেদের দল আদর্শ আর জাতির কল্যাণে জানানো উচিত তাদের পোষ্য বা তাদের ঘরে বড় হওয়া মানুষরা কেন এমন করেন? কি কারণে করেন? আমাদের কি জতুগৃহে বা আঁতুড়ঘরে কোনো সমস্যা আছে? না এ আমাদের জাতিগত স্বভাব?

এর জবাব আগামী প্রজন্মের জন্য এমনকি আমাদেরও জানা জরুরি। মানুষের মনের সংশয় দূর হওয়া জরুরি।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj