ভারতের লোকসভা নির্বাচন ও একটি পর্যালোচনা

সোমবার, ১০ জুন ২০১৯


সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আবারো নরেদ্র মোদি সরকার গঠন করেছেন। বহু ভাষী, বহু জাতিক, বহু আদর্শিক, বহু ধর্মে বিশ্বাসী কোটি কোটি মানুষের দেশ হলো বিশাল ভারত। যে দেশে ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে আজ ২০১৯ এই দীর্ঘ ৭২ বছর ধরে আজ এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র মোটামুটি অব্যাহতভাবে লালিত হয়ে এসেছে যার নজির পৃথিবীতে বিরল। আর সে কারণেই আজ অন্তত দুটি মাস ধরে গণতান্ত্রিক বিশ্বেও শত শত কোটি মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ভারতের নির্বাচনের প্রতি।

ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালের বিশ্বস্ততম বন্ধু। তাই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ আরো গভীরভাবে নজরে রেখেছিল সে দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতির দিকে, লোকসভার ভোটের দিকে, নির্বাচনী ফলাফলের দিকে। এভাবে আর কোনো দেশের নির্বাচনের প্রতি বাঙালি জাতির নজর রাখতে কোনো দিনই দেখা যায়নি। দেখা যায়নি পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার বা অপরাপর প্রতিবেশী দেশের নির্বাচনকালে।

বিস্ময়কর হলেও জানা গেছে যে, অতীতের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি উত্তর প্রদেশ এবারো কংগ্রেসের হাতে ধরা দিল না। সেখানে এবার রাহুল গান্ধীর মতো কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাজিও পরাজয়বরণ করলেন। সেখানেও বিজেপির প্রাধান্য বজায় থাকছে অবিশ্বাস্যভাবেই। রাহুল অবশ্য কেরালার একটি আসন থেকে জয়লাভ করেছেন।

গুজরাটও আবার বিস্ময়ের সৃষ্টি করল। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ওই প্রদেশে প্রায় সব ক’টি আসনে বিপুল ভোটাধিক্যে বিজয়ী হলেও ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস আশাতীত সংখ্যক আসনে বিজয় ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হলেও, লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে আবারো ২০১৪ সালের মতো চিত্রই। গত বছর ভাবা গিয়েছিল গুজরাটসহ কয়েকটি বিধান সভার নির্বাচনী ফলাফল কংগ্রেসের অনুক‚লে যাওয়ায় তা রীতিমতো প্রভাব ফেলবে এবারের লোকসভা নির্বাচনেও। কিন্তু সে ধারণা শেষ পর্যন্ত ভ্রান্ত প্রমাণিত হলো, বিজয় আবার অর্জন করল বিজেপিই।

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসকে প্রায় অস্তিত্বহীন করে ফেলেছে এবারের নির্বাচনী ফলাফল। সেখানেও উত্থান ঘটেছে বিজেপির। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস যে উগ্র বাম-বিরোধিতা করে কয়েক বছর আগে ক্ষমতা দখল করে পশ্চিম বাংলায় দক্ষিণপন্থিদের উত্থানের সুযোগ করে দিয়েছিলেন, বিজেপি তার যথার্থ সদ্ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হতে পেরেছে। আগামী নির্বাচনে যদি পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে পরজিত করে বিপুলসংখ্যক আসনে বিজয়ী হয়ে পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি সরকার গঠন করেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। রাজনীতির গতিপ্রকৃতি তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

কী আশ্চর্য! ২৩ মে-২৪ মে ফলাফল গণনা ও ঘোষণার আগ পর্যন্ত যখন সব এক্সিট পোল জানালো মোদির দল পুনরায় ক্ষমতায় আসছেন তবে তাদের আসন সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পাবে। বিজেপির আসন সংখ্যা হ্রাস পাবে এ প্রশ্নে কারো দ্বিমত ছিল না। যদিও মোদি কোনোক্রমে টিকে যেতে পারেন এমনটি ভাবছিলেন সবাই। বুথ ফেরত জরিপে পশ্চিম বাংলায় গেরুয়া বসনধারীরা তাদের পূর্বেকার দুটি আসনের জায়গায় এবার বড়জোর ১০/১২টি আসন পেতে পারে এই রূপই ধারণা দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তারা ২২টি আসনে জিতেছে।

এবার কোনো রকমে কংগ্রেস দুটি আসন ধরে রাখতে পারলেও বামফ্রন্ট সবাইকে হতাশ করেছে একটিও আসন না পেয়ে। বিজেপির যেমন ভূমিধস বিজয় অর্জিত হলো তেমনই করুণতম পরাজয় ঘটল টানা ৩০/৩৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা লাল ঝান্ডার গৌরবমণ্ডিত বামফ্রন্ট। পরিণতিতে পশ্চিমবঙ্গেও মানুষের সেখানকার সমাজে এক গভীর বিপর্যয় যে নেমে আসার আশঙ্কা অনেকেই তা স্বীকার করেন। শুধুই বা পশ্চিমবাংলার মানুষ কেন সমগ্র ভারতের মানুষকেই যে ভুগতে হবে অনেকের ভাবনাতেই তার প্রকাশ ঘটেছে। ফেসবুক একটি পোস্টে জানা গেল উত্তর প্রদেশের একটি অঞ্চল থেকে আতঙ্কে মুসলিমরা পালাচ্ছেন।

ভারতের নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এই ফলাফল দেখে বলেছেন, ‘ভারতের মানুষ বোকা ও মূর্খ তাই তারা বিজেপির মতো দলকে বিজয়ী করেছে। স্বনামের খ্যাত আন্তর্জাতিক মর্যাদাসম্পন্ন বেশ কয়েকটি বিদেশি পত্রিকাও, যেমন ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউইয়র্ক টাইমসসহ বেশ কয়েকটি বহুল পঠিত সংবাদপত্র ‘ভারতে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিজয়’ ও ‘ভারতে বিভেদপন্থি হিন্দুত্ববাদী মোদির দল বিজয় অর্জন করল’ জাতীয় শিরোনামে খবর প্রকাশ করে তাদের অভিমতের প্রকাশ ঘটিয়েছে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ পৃথিবীর সব দেশে সরকার প্রধানরা প্রথামাফিক রাষ্ট্রীয় শুভেচ্ছা অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাকিস্তান ভাবছে, সর্বাগ্রে শুভেচ্ছা জানাই নতুবা যদি আক্রান্ত হই, শ্রীলঙ্কাও অনুরূপ জঙ্গি ও বিদ্রোহী প্রশিক্ষণের আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত। বাংলাদেশ ভাবে পুরনো ছিটমহল সমস্যার সমাধান যেহেতু সম্ভব হয়েছে তদ্রƒপ হয়তো তিস্তা নদীর জল সংকটেরও সমাধান হবে। এ ব্যাপারে ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালে আন্তরিকভাবেই ছিটমহল সমস্যার সমাধান করতে চাইলেও সংবিধান সংশোধনের মতো সংখ্যাধিক্য না থাকায় এবং তৎকালীন বিজেপি ও সাম্প্রদায়িক দলগুলো তাতে সমর্থন না দেয়ায় সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব না হওয়াতে কংগ্রেস সরকার তা করতে পারেনি।

তিস্তা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রেও কংগ্রেস সরকার যথেষ্ট চেষ্টা করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোঁয়ার্তুমির ফলে তা সম্ভব হয়নি। এখন যদি মমতা রাজি হন তখন বিজেপি নেতা মোদি কী করেন তার পরীক্ষাটা ভালোভাবে করা যায়। তবে নতুন করে মোদি সরকার গঠনের পর তিস্তা সমস্যার সমাধান যে আরো দুরূহ হয়ে গেল সে কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন। তবে নির্বাচিত প্রতিবেশী দেশের সরকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অভিনন্দন জানিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ়তর করা এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধগুলো মিটিয়ে ফেলার কথা না বলার কোনো কারণ নেই। তবে তা সবই সৌজন্যমূলক এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন।

অভিযোগ উঠেছে যে, পশ্চিমবাংলায় বামেরা ‘রামে’ ভোট দিয়েছে বলেই ওই রাজ্যে বিজেপি এত বড় বিজয় অর্জন করতে পেরেছে। প্রচারটি চালিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিকৃত মস্তিষ্কের মতো তিনি এক এক বক্তৃতায় এক এক কথা বলছেন যা অনেক সময় স্ববিরোধীও হয়ে পড়ছে। মমতা বলেছেন, তার রাজ্যে লোকসভার যে ৪২টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হলো এর ৪২টিতেই তৃণমূল বিজয়ী হবে। কিন্তু কার্যত বিজয়ী হলো তার প্রায় অর্ধেক এবং বিজেপি সেখানে তৃণমূলের প্রায় সমশক্তি সম্পন্ন হয়ে উঠেছে তলে তলে ঘুণাক্ষরেই তিনি তা টের পাননি। দাবিটি যখন মিথ্যা প্রমাণিত হলো তখন ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’-এর মতো তিনি বামদের ঘাড়ে দোষটি চাপালেন। তবে এ কথাও ঠিক, অনেকে বিশ্বাসও করেন যে বহু বাম কর্মী বিজেপিকে ভোট দিয়েছে পশ্চিমবাংলায়। বামফ্রন্টের পোড় খাওয়া নেতৃত্ব কদাপি এমন সিদ্ধান্ত নেবেন না এ প্রশ্নে আমি নিশ্চিত। তবে এমনটা হতেই পারে যে, নেতৃত্বেও নির্দেশ অমান্য করে কিছু কিছু নির্যাতিত (তৃণমূলের গুণ্ডাদের দ্বারা) কর্মী হয়তো বিজেপিকে ভোট দিয়ে থাকবে। তৃণমূল নেত্রী কট্টর কমিউনিস্ট বা বামফ্রন্ট বিরোধী। সিপিএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছিল। নন্দীগ্রামে পুলিশদের ওপর গুলি চালিয়েছিল যার জন্য মুখ্যমন্ত্রী ভুল স্বীকার করে দুঃখও প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে পুলিশ প্রচণ্ড বাড়াবাড়ি করেছিল আর সেটাকে পুঁজি করেই মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় এলেন বিপুল শক্তি নিয়ে। এবার তার দ্বিতীয় দফা শাসন চলছে।

কিন্তু ২০১৯-এর ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ভারতবাসী কেন এমন রায় দিলেন তা নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। ভাবতে হবে বামপন্থিরা (যেমন সিপিআই, সিপিএম প্রভৃতি) এবং উদার অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যবাহী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে সেখানকার জনগণ কেন এমন করুণভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন। এ বিষয়ে ভাববেন ভারতের জনগণই বিশেষ করে ভারতের ক্ষতিগ্রস্ত রাজনৈতিক দলগুলো। আমার দৃষ্টিতে এই দুটি শক্তির পরাজয়ের কারণগুলো নি¤œরূপ :

এক. কংগ্রেসের ওপর ঐতিহাসিক দায়িত্ব বর্তেছিল তাদের জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা ভারতে কত নিচে নেমে গেছে সেটা গভীরভাবে উপলব্ধি করার। সঙ্গে সঙ্গে কথাও বুঝা উচিত ছিল ভারতের সমাজদেহে ধীরে ধীরে কি পরিমাণ হীন সাম্প্রদায়িকতা স্থান করে নিয়েছে। এই বিষয় দুটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে ভারতের সব অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে একটি মোর্চায় সংগঠিত করে সবগুলো কেন্দ্রে ‘কমন’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে সম্মিলিতভাবে লড়াই করা;

দুই. এ ব্যাপারে অপর সব অসাম্প্রদায়িক দল, বিশেষ করে সব বামপন্থি শক্তিরও উচিত ছিল একই উদ্দেশ্যে সময় থাকতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

তিন. বামফ্রন্টের ¯েøাগান ছিল, ‘মোদি হঠাও, ভারত বাঁচাও’, ‘মমতা হঠাও, বাংলা বাঁচাও’। শ্রæতিমধুর যতই হোক, বাস্তব কথাটা হলো লোকসভার নির্বাচন দিয়ে তো মমতাকে হঠানো সম্ভব না। মোদিকে হঠানোই প্রধান কাজ কারণ প্রগতিশীল ভারত গড়ার ক্ষেত্রে প্রধান শর্তই হলো আরএমএস, বজরং দল প্রভৃতি উগ্র হিন্দু সমর্থিত বিজেপি এবং তার পাহারাদার নরেন্দ্র মোদি। তার জন্য ঘনিষ্ঠতম মিত্র কংগ্রেসের সঙ্গে যে কোনো মূল্যে ঐক্য গড়ে তুলে আরো সব অসাম্প্রদায়িক আঞ্চলিক দলগুলোকে ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করে নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হওয়া।

চার. ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়া স্বপ্নে বিভোর তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাতে রাজি হতেন না হয়তো কিন্তু সামগ্রিকভাবে অনেক লাভ হতো। স্মরণে রাখা দরকার প্রত্যক্ষভাবে মুসলিমদের পুড়িয়ে হত্যা করা এক বিজেপি নেতাকে গুজরাট থেকে জিতিয়ে নিয়েছে বিজেপি। এটাও লক্ষণীয় যে লোকসভা নির্বাচনে সর্বমোট ২৭ জন মুসলিম প্রার্থী বিজয়ী হলেও, বিজেপি থেকে কিন্তু একজন মুসলিম প্রার্থীকেও তারা বিজয়ী করে আনেনি।

পাঁচ. বিজেপি বা এনডিএ জোটের নরেন্দ্র মোদিও বিকল্প প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাউকে ভারতবাসীর সামনে তুলে ধরতে পারতেন।

রণেশ মৈত্র : প্রবীণ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj