অবিন্যস্ত প্রতাপের মন্ত্রিত্ব ভার

সোমবার, ১০ জুন ২০১৯

ভারতের লোকসভা সদস্য নির্বাচিত অতঃপর মন্ত্রিত্বের সাধ পাওয়া প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গিকে নিয়ে সরগরম সোশ্যাল মিডিয়া। মোদি সরকারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, পশুপালন, ডেইরি, মৎস্য দপ্তরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া সারেঙ্গির সাদাসিদে জীবনবোধ মানুুষের মন জয় করেছে। পোশাক-পরিচ্ছদ ও চালচলনে অতি সাধারণ এবং হালকা গড়ন গোঁফ-দাড়িতে অবিন্যস্ত মানুষটি মন্ত্রী হয়ে সর্বত্র তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। গত ৩০ মে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় শপথ নিয়েছেন ভারতের ওড়িশার বালেশ্বর থেকে নির্বাচিত এই বিজেপি নেতা। মন্ত্রিসভায় যখন সারেঙ্গির নাম ঘোষণা করা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি করতালি পড়েছিল অপরিচিত এই ব্যক্তিটির জন্য। কারণ কুঁড়েঘরে থাকা, সাইকেলে করে চলাফেরা করা, এমনকি নির্বাচনী প্রচারে অটোতে চড়ে সাধারণ মানুষের দুয়ারে গিয়ে ভোট চাওয়াটাও নজর কেড়েছে কৌত‚হলী মানুষের। আগ্রহের বড় জায়গা দখলে নেয়া সারেঙ্গির সাধারণ জীবনাচরণ বর্তমান উচ্চাভিলাষী সমাজ ব্যবস্থায় প্রায় বিরল।

এই কলির কালে নির্লোভ, নিঃস্বার্থ, নিখাদ, নিরহঙ্কারী মানুষ খুঁজে পাওয়া দুর্লভ-দুষ্কর। সমাজ প্রসারিত পৃষ্ঠে যে দুয়েকজন আছেন তাও মন্দ মুমূর্ষুতায় পতিত। তাই সুস্থ-স্বচ্ছ বোধশক্তির মানুষগুলো নিজেদের আড়াল করে রাখেন সহজ-সরল সাদামাটা জীবনাচরণের আত্মশুদ্ধির ভাঁজে। লোভ-লালসাগ্রস্ত বিলাসী জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় মোহ পরাস্ত করতে পারে না তাদের। তাদের অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়া যায় সামনের দিকে।

আমরা কেবল মোহে মত্ত। প্রতাপ সারেঙ্গির মতো অর্থবিত্তহীন সাদাসিদে মানুষকে কি আমরা আমাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করতে পারব? ওড়িশার জনগণের মতো আমরা তেমনটা হতে পারব না। আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন। এ দেশের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে এমন প্রতাপ সারেঙ্গিকে দলের পক্ষ থেকে যেমন প্রার্থী বিবেচনা করা অসম্ভব তেমনি ভোট বিবেচনায়ও কোনো ভোটার সারেঙ্গি সমতুল্য কাউকে ভোট দিতে সম্মত হবে না। কারণ এখানে অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তিই যোগ্যতার মাপকাঠি। অর্থ দিয়ে নির্বাচনের প্রার্থিতা কেনা যায়। আবার অর্থের জোরে নির্বাচনী বৈতরণী পারও হওয়া যায়। আমাদের মানসিকতা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতাপের জায়গা নেই। অর্থ দিয়ে ভোট ও প্রার্থিতা কেনার বাংলাদেশি বাস্তবতা ওড়িশায় নেই। আর নেই বলেই প্রতাপ সারেঙ্গির মতো মানুষ লোকসভার সদস্য হন, আবার মন্ত্রীও হন।

মন্ত্রিত্বে প্রশংসা কুড়ানো প্রতাপের রয়েছে কিছু সমালোচিত দিকও। ওড়িশায় প্রবল জনপ্রিয় এই মানুষটি নানা ঘটনায় সমালোচিতও হয়েছেন। এসব নেতিবাচক দিক পাত্তাই পায়নি সারেঙ্গির জনপ্রিয়তার কাছে। সারেঙ্গি তার এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার জন্য সাইকেলে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ভুবনেশ্বরে প্রায়ই তাকে দেখা যেত হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে রাজ্য পরিষদের সভায় যাচ্ছেন। রাস্তার ধারের কোনো সাধারণ খাবার দোকানে খাচ্ছেন। রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। যখন তিনি মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন তার নির্বাচনী এলাকায় উৎসব শুরু হয়ে যায়। সমর্থকরা আতশবাজি পুড়িয়ে এবং মিষ্টি বিতরণ করে তাদের উল্লাস প্রকাশ করেন। [সূত্র : আমাদের সময়, ০১.০৬.১৯] সমাজের জন্য অধিক অবদান থাকলে ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এলোমেলো প্রতাপের বেলায় তেমনটাই হয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে বদলে দিতে প্রতাপ সারেঙ্গির মতো মানুষই প্রয়োজন। তাই বলব, জয়তু প্রতাপ।

বিশ্বজিত রায়
লেখক : জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj