মোদির বিজয় : বাংলায় বিজেপি আসছে?

রবিবার, ৯ জুন ২০১৯

খবর বা গুজব, যাই হোক, প্রচারণা ছিল যে, নির্বাচনে জেতার জন্য মোদি কেদারনাথের গুহায় গিয়ে ধ্যান করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই সংবাদ শুনে মোদিকে ফোন করে বলেছেন, ২০২০-এ তার জন্য ওই গুহাটি রিজার্ভ রাখতে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নির্বাচনে জিতেছেন। মোদি জিতলেন। সামনে ট্রাম্পের পালা। ভারতে নরেন্দ্র মোদি বিশাল বিজয় পেয়েছেন। বিজেপি এখন একমাত্র সর্বভারতীয় দল যার আশপাশে কেউ নেই। কংগ্রেস দ্বিতীয় অবস্থানে।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর অবস্থা শোচনীয়। বাংলা থেকে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট আগেই বিদায় নিয়েছে। এবার তৃণমূলের যাওয়ার পালা। দিদির বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। এ জন্য অবশ্য তিনি নিজেই দায়ী। নিজের হাতে গড়া দল ‘তৃণমূল’ তিনি নিজেই ধ্বংস করে দিচ্ছেন। এ থেকে ফেরার রাস্তা যে নেই তা বোঝা যাবে ২০২১-এ বা তার আগেই। আপাতত মমতার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন তছনছ হয়ে গেছে। মুখ্য মন্ত্রিত্ব যাই যাই করছে। বাংলায় কমিউনিস্টরা মৃত। কংগ্রেস নেই। তৃণমূল যাচ্ছে। বিজেপি আসছে?

নির্বাচনে জিতে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘কেউ যদি জিতে থাকে, তবে ভারত জিতেছে; গণতন্ত্র জিতেছে, জনতা জিতেছে’। উৎফুল্ল জনতাকে তিনি বলেছেন, এই জয় নতুন ভারত প্রতিষ্ঠার ম্যান্ডেট। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন, ভারতীয়রা বোকা ও মূর্খ তাই বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্ন বলেছেন, বাংলায় বিজেপির উত্থান অশনি সংকেত। আসলে কি তাই? এমন তো হতে পারে, অনেকদিন পর ভারতবাসী ‘ভারতীয় সভ্যতার’ মূল খুঁজে পাচ্ছেন?

এবারের নির্বাচন মূলত ছিল নরেন্দ্র মোদি ভার্সেস রাহুল গান্ধীর মধ্যে রেফারেন্ডাম। মোদি সুনামি রাহুলকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এই নির্বাচন পারিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বিপক্ষে ম্যান্ডেট দিয়েছে। হয়তো এ কারণে আগামী নির্বাচনে গান্ধী পরিবারকে ডিঙিয়ে পাঞ্জাবের ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন। তিনি পাঞ্জাবে কংগ্রেসকে আধিপত্য দিয়েছেন। দলে তার প্রভাব বাড়ছে। অনেকের মতে, রাহুল নয়, ক্যাপ্টেন সিং হচ্ছেন মোদির যোগ্য প্রতিদ্ব›দ্বী।

রাহুল গান্ধী তার পরিবারের ঐতিহ্যবাহী ‘আমেথি’ আসনে বিজেপির স্মৃতি ইরানির কাছে হেরেছেন। তবে কেরালায় মুসলিম অধ্যুষিত একটি আসনে জয়ী হয়েছেন। ভারতীয় নির্বাচন ঐতিহাসিক ঘটনা। নব্বই কোটি ভোটার, মাসব্যাপী নির্বাচন। মমতার পশ্চিমবঙ্গ ব্যতীত অন্যত্র কোনো গোলমাল শোনা যায়নি। নির্বাচনে গণতন্ত্র জিতেছে। আঞ্চলিক বিভক্ত রাজনীতি পরাজিত হয়েছে। ভারত বিশ্বে বৃহত্তম গণতন্ত্র। এর নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশংসনীয়। ঐতিহ্যগতভাবে ভারত হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষ এবং উদার। তৃণমূল, সিপিএম ও কংগ্রেসের উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতা, যা কার্যত ‘হিন্দু বিদ্বেষ বা মুসলিম তোষণ’, সাধারণ মানুষ পছন্দ করেনি। বিজেপি এবার নির্বাচনে হিন্দুত্ব, রাম মন্দির বা গো-হত্যা ইস্যু সামনে আনেনি। ২০১৪-এর নির্বাচনের অনেক প্রতিশ্রæতি মোদি রাখতে পারেননি। তবে তিনি ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, দেশের নিরাপত্তা এবং ইসলামী সন্ত্রাস মোকাবেলায় তিনি একমাত্র যোগ্য প্রার্থী।

সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এ মুহূর্তে মোদির সমকক্ষ আর কেউ নেই? ভারতীয় রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টাচ্ছে। বাংলার দৃশ্যপট আরো দ্রুত পাল্টাবে। মমতা ব্যানার্জী যে ভাষায় গালাগালি করেছেন, মানুষ তা পছন্দ করেনি। বিজেপি ১৮টি আসন পেয়েছে। বিজেপি নেত্রী রুপা গাঙ্গুলীর ভাষ্যমতে, তৃণমূলের গুণ্ডামি না থাকলে বিজেপি ৩০টি আসন পেত। রাহুল গান্ধীর ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ ¯েøাগান বুমেরাং হয়েছে। ভারতীয়রা এটি পছন্দ করেনি। মোদি চোর এ কথা ভারতবাসী বিশ্বাস করেনি। বরং তার স্বচ্ছ ইমেজ গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে মোদির ভাবমূর্তি যতটা কাজ করেছে, মমতার কদর্য রাজনীতি ঠিক ততটাই মানুষকে তৃণমূল থেকে বিজেপির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তৃণমূলের বাংলাদেশি স্টাইল ‘মাসল ও সাম্প্রদায়িক’ রাজনীতি ভোটারকে বিজেপিমুখী করেছে। কলকাতার সাবেক মেয়র সিপিএম নেতা বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য তাই বলেছেন, ‘মমতার পিঠে চড়েই বিজেপি রাজ্যে ঢুকেছে’। বিজেপি নেতা সুনীল দেওধর বলেছেন, মমতার অপশাসনের ফলে শুধু বাম নয়, তৃণমূলের একটি অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে।

কেউ কেউ মনে করেন, বাংলাদেশে ক্রমাগত সংখ্যালঘু নির্যাতন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে ভালো করতে সাহায্য করেছে। মমতার অতিরিক্ত মুসলিম তোষণে সেখানকার হিন্দুরা ভাবছে তাদের অবস্থা না বাংলাদেশের হিন্দুদের মতো হয়? তাই তারা মুক্তির পথ হিসেবে বিজেপিকে বেছে নিয়েছে। থিওরি একেবারে ফেলনা নয়?

ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রেখে বাংলাদেশ চায় ভারত সেক্যুলার থাকুক। আপাতত মনে হচ্ছে, ভারত আর সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে না? ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই, এর জন্য বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক ইসলামি শক্তির রমরমা অনেকাংশে দায়ী। পশ্চিমবঙ্গ বাম বলয় ছেড়ে ডানে ঝুঁকছে।

১৯৭৭-র পর এই প্রথম বাংলায় কোনো জাতীয় দল এতটা ভালো করতে সক্ষম হলো। কংগ্রেস ১৯৪৭-৭৭ পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করেছে। ১৯৭৭-২০১১ বামফ্রন্ট। ২০১১ থেকে তৃণমূল। তৃণমূল ভয় পাচ্ছে, সামনে হয়তো বিজেপি। তৃণমূলের বর্ষীয়ান সম্পাদক চন্দন মিত্র বলেই ফেলেছেন, ‘বিজেপি ইজ এ গভর্নমেন্ট ইন ওয়েটিং’। মমতা ব্যানার্জী ‘জয় শ্রীরাম’ ¯েøাগান শুনে যেভাবে ক্ষেপে যাচ্ছেন, তাতে মনে হয় এই একটি মাত্র ¯েøাগানেই তিনি কুপোকাৎ হবেন?

দিল্লিতে বিজেপির দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতারোহণ উপমহাদেশে ভারসাম্যের তেমন পরিবর্তন ঘটাবে বলে মনে হয় না! তবে মোদির নেতৃত্বে ভারত আরো শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে। মোদির এই বিজয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। মোদি ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো। যদিও শেখ হাসিনা দু’দুবার মোদির শপথ অনুষ্ঠান এড়িয়ে গেছেন বলে কথা উঠেছে। ভারতীয় স্বার্থে মোদির বাংলাদেশকে প্রয়োজন আছে। চীন প্রশ্নে সামান্য মতানৈক্য বাদে বাংলাদেশ-ভারত তেমন বৃহৎ কোনো সমস্যা নেই। একদিকে শত্রু মিয়ানমার, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আর বাকিটা ভারত বেষ্টিত বাংলাদেশের পক্ষে নিজেদের স্বার্থেই ভারতের সঙ্গে থাকতে হবে।

কারো কারো ধারণা, এনআরসি প্রশ্নে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দিতে পারে। আসামে এনআরসি চলছে। অমিত শাহ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হবে। মমতা বলছেন, হবে না। এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সমস্যা হলে লাভবান হবে চীন। ভারত এ থিওরি বোঝে। তবে এটিও সত্য, অবৈধ নাগরিক বিতাড়নের অধিকার ভারতের আছে। বাংলাদেশের জন্য মিলিয়ন ডলার প্রশ্নটি হচ্ছে, তিস্তা কি হবে?

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj