কেমন কাটলো ঈদ কেমন যাবে ঈদের পর?

শনিবার, ৮ জুন ২০১৯


ঈদ কেমন কাটলো- এ প্রশ্নের জবাবে এক কথায় সবাই হয়তো ভালো বলবেন না। একেকজন একেক জবাব দেবেন- এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যিনি আওয়ামী লীগ সমর্থক তিনি বলবেন, খুব ভালো কেটেছে ঈদ। আনন্দ উদযাপনে কারো কোনো সমস্যা হয়নি। অসংখ্য মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। তারা মোটামুটি নিরাপদে বাড়ি পৌঁছেছেন। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। একসঙ্গে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। সড়কপথে এবার যানজট ছিল না বললেই চলে। নৌপথও ছিল নির্বিঘ্ন। তবে রেলের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিলম্ব হলেও কারো গন্তব্যে পৌঁছতে সমস্যা হয়নি।

বৃষ্টির কারণে কোনো কোনো জায়গায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠানে কিছু সমস্যা হয়েছে। ঈদের সময় মানুষ সাধারণত উৎসবের মুডে থাকে, তাই টুকটাক সমস্যা কেউ হিসাবের মধ্যে ধরেন না। শোলাকিয়ায় যেমন দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠানে বিঘ্ন ঘটেনি, তেমনি দিনাজপুর গোরা শহীদ ময়দানে লক্ষাধিক মানুষ সমবেত হয়ে নামাজ পড়েছেন সানন্দচিত্তেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও মানুষের উচ্ছ¡সিত ঈদ উদযাপনের চিত্রই প্রকাশ পেয়েছে।

মানুষ সাধ্য অনুযায়ী কেনাকাটা করেছেন। বেচাবিক্রি খুব খারাপ হয়েছে, মানুষ একেবারেই কিছু কিনতে পারেনি, এমন খবর খুব বেশি পাওয়া না গেলেও এটা ঠিক যে, কৃষকের ঘরে ঈদ উৎসব একটু ফিকে ছিল। ধানের দাম না পাওয়ায় অনেক প্রান্তিক চাষি চরম দুর্দশার মধ্যে ছিলেন। এক মণ ধান বিক্রি করে এক কেজি মাংস কেনা যায়নি। দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। নানা ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে মানুষের হাতে টাকাপয়সা কিছু হলেও আছে। আবার এটাও ঠিক যে, দেশে বৈষম্যও বাড়ছে। কিছু মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। ধনী আরো ধনী হচ্ছে। ধনবৈষম্য বাড়লেও এখন দেশে চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও কমছে। না খেতে পাওয়া মানুষ দেশে এখন নেই বললেই চলে। ঈদের ছুটিতে এবার কত মানুষ দেশের বাইরে গিয়েছেন, তার হিসাব বের করতে পারলে বোঝা যেত দেশ সামনে অগ্রসর হচ্ছে কিনা। দেশে সব সময় কিছু মানুষ থাকেন যাদের ‘কিছু ভালো লাগে না’। তারা ভালো কিছু দেখেন না।

বিএনপি সমর্থকরা বলবেন না যে, তারা খুব আনন্দের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে। তার মুক্তির বিষয়টি অনিশ্চিত। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। তার চিকিৎসা চলছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার ঈদ কেটেছে হাসপাতালেই। আত্মীয়স্বজন তার সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে দলের নেতারা ঈদের দিন দেখা করার অনুমতি পাননি। খালেদা জিয়া আত্মীয়দের মাধ্যমে সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

বিএনপি যেহেতু রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে ভালো নেই, সেহেতু তাদের ঈদ উদযাপনও ভালো হওয়ার কথা নয়। বিএনপি কীভাবে সংকট ও বিপদ কাটিয়ে উঠবে, তা কেউই বলতে পারছেন না। বিএনপি যতটা সংকট-জর্জর, আওয়ামী লীগ ততটা নয়। তার মানে আবার এটা নয় যে, আওয়ামী লীগের কোনো সংকট নেই। বিএনপির সংকট দীর্ঘদিন ক্ষমতায় না থাকা। আর আওয়ামী লীগের সংকট টানা তিন মেয়াদে থাকা। বাইরে থেকে দেখে সবারই মনে হবে, আওয়ামী লীগ অত্যন্ত নিরাপদ অবস্থায় আছে। দেশে বিরোধী দল নেই বললেই চলে। শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকা গণতন্ত্রের দুর্বলতারই লক্ষণ। আওয়ামী লীগ এই দুর্বলতার বিষয়টি দীর্ঘদিন উপেক্ষা করতে পারবে না। টানা ক্ষমতায় থাকলে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। একশ্রেণির সুবিধাবাদী-সুযোগসন্ধানী দলে ঢুকে পড়ে। আবর্জনা ফিল্টার করার ব্যবস্থা না থাকলে এক সময় তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা মোহাম্মদ নাসিম সম্প্রতি বলেছেন, আওয়ামী লীগে ‘ভেজাল’ ঢুকেছে। আওয়ামী লীগ যদি সময় থাকতে ভেজালমুক্ত হওয়ার চেষ্টা না করে তাহলে দলটি ভেতর থেকে ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনেই দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে অতীতে দলকে সংশোধনের ব্যাপারে যত কথা বলা হয়েছে বাস্তবে ততটা করতে দেখা যায়নি।

দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ আছে বলেই মানুষ শান্তিতে ঈদ উদযাপন করতে পেরেছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন, এই যে দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে, এটা কি কৃত্রিম, না স্বাভাবিক? আমাদের গণতন্ত্র ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। এখানে রাজনীতিতে স্থবিরতা কাম্য নয়। রাজনীতি যদি প্রবহমান না হয়, তাহলে অপশক্তির মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়- সরকারকে, আওয়ামী লীগকে এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে এবং সে অনুযায়ী কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু সব ব্যাপারেই দেখা যায়, আওয়ামী লীগের দলগত প্রস্তুতি কম। দলীয় প্রধানের ওপর নির্ভরতা বেশি। ছোটখাটো ব্যাপারেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়, হস্তক্ষেপ করতে হয়। সব দেশের সরকারের প্রধানদেরই একটি কোর টিম থাকে এবং সেই টিমের পারফরম্যান্সও দৃশ্যমান থাকে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনারও নিশ্চয়ই সে রকম টিম আছে। কিন্তু সেই টিমের পারফরম্যান্স মানুষের চোখে পড়ে না। এবার ঈদের আগের অন্তত তিনটি ঘটনায় মানুষের উদ্বেগ ও হতাশা বেড়েছে।

প্রথম ঘটনাটি একজন সরকারি কর্মকর্তার বদলির আদেশ এবং তা স্থগিত হওয়া। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে গত ৩ জুন বদলির আদেশ দেয়া হয়। তিনি আড়ং, পারসোনাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কিছু আইনি পদক্ষেপ নেয়ায় তাকে ‘প্রভাবশালী’ মহলের চাপে বদলি করা হয় বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ‘এলিট ক্লাবের’ বিরুদ্ধে যাওয়ার শাস্তি হিসেবেই তার বদলিকে দেখা হয়। আবার খবরটি প্রচার হওয়ায় তার বদলির আদেশও দ্রুত রহিত হয়। বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই শাহরিয়ারের বদলি রদ হয়। প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছেই স্বাভাবিক বলে মনে হয়নি। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে, যারা সরকারের হয়ে কাজ করছেন তারা সরকারপ্রধানের চাহিদা বা মনোভাব বুঝতে পারছেন না। সরকারপ্রধান সততার পক্ষে হলেও তার পারিষদ দল উল্টো পথে হাঁটতে পছন্দ করছেন। এগুলো ভালো লক্ষণ নয়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে। চাঁদ উঠেছে কি ওঠেনি, তা নিয়ে এবার জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি যে নাটকীয়তা করেছে তা কোনো ভালো দৃষ্টান্ত নয়। চাঁদ ওঠার একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে। কেউ চোখে দেখতে না পেলেই চাঁদ ওঠে না, তা নয়। নানা কারণে চাঁদ দেখতে না পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু চাঁদ উঠে তার নিজস্ব নিয়মে, মেঘবৃষ্টি বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তার হেরফের হয় না। কিন্তু এবার জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি প্রথমে ঘোষণা দেয় যে, দেশের কোথাও শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। আবার দুই ঘণ্টা পরে জানানো হয় যে, চাঁদ উঠেছে। চাঁদ দেখা না-দেখার দ্ব›েদ্ব এবার ঈদের আনন্দই মাটি হতে বসেছিল। কেন এমন জটিলতা দেখা দিল? এর দায় কার? বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সুশাসনের অভাবেই এমনটা ঘটেছে। তার কথা অসত্য প্রমাণের শক্ত যুক্তি আছে কি?

তৃতীয় ঘটনাটিও কম চমকপ্রদ নয়। বিদেশে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বিমানের বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজটি নিয়ে কাতার যান ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ। কিন্তু পাসপোর্ট সঙ্গে না থাকায় তাকে দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক করে কাতার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। তিনি পাসপোর্ট ছাড়া ঢাকা বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেন কীভাবে? বিষয়টি কি হালকা করে দেখার মতো?

উপরের তিনটি ঘটনাই কিন্তু এক ধরনের বিশৃঙ্খলার, নিয়ন্ত্রণহীনতার এবং স্বেচ্ছাচারিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারকে ‘অকেজো’ বা অকর্মন্য প্রমাণ করার চেষ্টা কোনো মহল থেকে করা হচ্ছে কি? গুজব ডালপালা বিস্তারের আগেই সরকারকে এসব খুচরা বিপদ মুক্ত হওয়ার সক্ষমতা দেখাতে হবে। ঈদ যেমন ভালো কেটেছে, শান্তি ও স্বস্তিতে কেটেছে, ঈদের পরের সময়টাও একই রকম নিরাপদে কাটবে তার নিশ্চয়তা বিধান সরকারকেই করতে হবে।

বিভুরঞ্জন সরকার : যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj