বর্বরতার দ্রুত অবসান হোক

শনিবার, ৮ জুন ২০১৯

শিশুর ওপর নির্যাতন-নিপীড়নে যোগ হচ্ছে বর্বরতা, নৃশংসতার নিত্যনতুন ধরন। ধর্ষণসহ শিশুর প্রতি চরম সহিংসতা আর অমানবিক নিষ্ঠুরতা ক্রমাগত বেড়ে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু অপহরণ, ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা। বেসরকারি সংগঠন ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ২৩৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ৩৫ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে; এদের মধ্য একজনের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে সাত জনকে। বর্তমান সময়ে নগর জীবনের ব্যস্ততার কারণে মা-বাবা তার সন্তানকে বঞ্চিত করছেন ¯েœহ-আদর-ভালোবাসা, উপযুক্ত শাসন থেকে। মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার চেয়ে কাগুজে শিক্ষা নিয়ে রাতারাতি বিত্ত-বৈভব গড়ে তোলার একটা অশুভ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। দাদা-দাদি, চাচা-চাচির মতো নিকটাত্মীয়ের সান্নিধ্যবঞ্চিত শিশু-কিশোর ঘরের মাঝে একাকিত্বে ভোগে। শিশু-কিশোরের মনোজগতে বিশাল শূন্যতা বাসা বাঁধে। সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিপথগামী বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে মাদক গ্রহণ করে ধীরে ধীরে ধর্ষণের মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

শিক্ষাঙ্গনেও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা ও খেলাধুলার ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকে পড়ছে নানা নেশায় যা তাদের চরিত্র গঠনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শিক্ষকদের মানবিক শিক্ষাদানের সময় ও মানসিকতা কম। আগের দিনে প্রতিটি শিক্ষক যে কোনো বিষয় পড়ানোর ফাঁকে নৈতিক শিক্ষাদান করতেন যা শিক্ষার্থীর মনে স্থায়ী আসন গেড়ে বসত। আজ তা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা সহজে চলে যাচ্ছে নীতিহীনতার দিকে, জড়িত হচ্ছে কুকর্মে। পেশিশক্তির বলে পরাভূত করা যাবে সমাজের শত বাধা-বিপত্তি- এমন ধারণা তাকে যে কোনো ধরনের অপরাধমূলত কাজে প্রলুব্ধ করছে। রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে অর্থবল থাকলে তো কথাই নেই। এসব থেকে পরিত্রাণ পেতে দেশে সুশিক্ষা ব্যবস্থা, সুস্থ সামাজিক পরিস্থিতি ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারা ফিরিয়ে আনতে হবে। রাস্তাঘাটে, যানবাহনে শিশু ও নারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে তৎপর হতে হবে। ধর্ষণের মতো দুষ্ট ক্ষতকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে ধর্ষকের স্বরূপ উন্মোচিত করতে হবে। ধর্ষিতা ও তার পরিবারকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আইনি সহায়তা দিতে হবে।

ধর্ষণের মামলায় অনেকক্ষেত্রে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ধর্ষণের সুষ্ঠু বিচারে বাধা হয়ে দাঁড়ায় যা পক্ষান্তরে ধর্ষণের বিস্তার ঘটায়। মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিও ধর্ষণকে উৎসাহিত করে। শিশু ধর্ষণের ঘটনার ভয়াবহতাকে জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনায় করে দ্রুত সম্ভব অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও বিচার সম্পন্ন করতে হবে। ধর্ষণের ব্যাপারে রাষ্ট্রের শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ এবং ধর্ষণ প্রতিরোধে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ সহায়ক হতে পারে। শিশু ধর্ষণ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে প্রণীত আইনসমূহ বাস্তবায়নের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে। ধর্ষণের মামলা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত মনিটরিং এবং বিচার দ্রুত নিষ্পন্ন হবে। আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে অর্থের প্রভাবমুক্ত করতে হবে। ধর্ষককে সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে থাকা মানুষরূপী লম্পট, পিশাচ ধর্ষকদের ধরিয়ে আইনের কাছে সোপর্দ করতে হবে। একটি শিশুও আগামীতে ধর্ষণের শিকার হলে সে দায় দেশের প্রতিটি সমাজসচেতন মানুষ এবং রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
লেখক : মালিবাগ, ঢাকা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj