পথের শেষে কী?

মঙ্গলবার, ৪ জুন ২০১৯


শুরু করাটা তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনাই নয়, কোনো না কোনোভাবে শুরু হয়েই যায়। অগণন ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচনের গল্প তো আমাদের জানাই আছে। যা কখনো শুরু হয়নি তা কোনো আলোচনার অনুষঙ্গই হতে পারে না। শুভ কামনার বার্তা ছাড়াও যাত্রা শুরু হতে পারে, কিন্তু যাত্রা যদি গন্তব্যে না পৌঁছায়, তাহলে সে যাত্রা লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি যাত্রার সফল পরিসমাপ্তি চাই। যে যাত্রা শুরু হলো একা, পথে যুক্ত হলো পথের নানান অনুষঙ্গ, কোনোটি আনন্দের কোনোটি বা বিষাদের; কিন্তু যাত্রা শেষে যদি তুমি নিঃসঙ্গ হয়ে যাও, নিঃস্ব হয়ে যাও, শূন্য হয়ে যাও তাহলে সে যাত্রা ফলশূন্য হয়ে গেল। প্রতিটি যাত্রায় তাই সঞ্চয় চাই। যাত্রা শেষে তোমার অথবা তোমার পরিপার্শ্বের জন্য যেন তৃপ্তিযোগ থাকে। হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে পথ হাঁটিবার পর যখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসে তখন যেন তোমার চোখে চোখ রাখিবার জন্য থাকে ‘বনলতা সেন’। যেন তুমি উচ্চারণ করতে পারো-

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার দিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর

হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তা’রে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ জীবনের সব লেন দেন;

থাকে শুধু অন্ধাকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

(বনলতা সেন \ বনলতা সেন \ জীবনানন্দ দাশ)

জীবনের প্রতিটি যাত্রার শেষে তাই চাই একজন বনলতা সেন। বনলতা সেন কোনো সুন্দরী নারী নয়, সে এক বোধ; যে হবে পথিকের নিরাপদ আশ্রয়। সে আশ্রয় অনন্ত সুখের, তৃপ্তির, গভীর আবেশের। আমি তাই আমার প্রতিটি যাত্রা শেষে অঙ্ক মিলিয়ে নিতে চাই; মুখোমুখি চাই প্রিয় বনলতা সেনকে।

নদী যেখানেই যাত্রা শুরু করুক তার গন্তব্য হয় সমুদ্র। মরুতে পথ হারাতে চায় কোন নদী? হয়তো একা একাই পৌঁছাতে পারে না, পথে অন্য কোনো নদীর সঙ্গে একাকার হয়ে যায়, হয়তো অন্য কোনো নাম নিয়ে এগিয়ে যায় লক্ষ্যে, কিন্তু সমুদ্রে তার যাওয়া চাই। নদীকে কে কবে মাটি খুঁড়ে পথ দেখিয়েছে? নদী তো নিজেই তার পথ তৈরি করে নিয়েছে জলের তোড়ে। আমরা যদি নদীর এগিয়ে যাওয়ার ধারাটি মননে ধারণ করি, তাহলে নিজের পথ চলার আনন্দটি সহজেই খুঁজে নিতে পারি। আবার ভিন্নভাবেও ভাবতে পারি, নদী কি আসলে অন্ধ-বধির? নদীর তো চিন্তার সূত্র নেই, জলের খেয়ালে এগিয়ে যায়, জল যায় জলের দিকে, যেদিকে জলের কল্লোল নদী¯্রােত সেদিকেই ছুটে যায়। নদীর অন্ধতা আর বধির স্বভাবের কথা মনে আসতেই একটা কথা মনে পড়ে গেল। কয়েকদিন আগে ফেসবুকে কবি মুজিব মেহদীর একটা স্ট্যাটাস পড়লাম, সেটা তুলে ধরছি-

কাউকে ‘পরকালে বিশ্বাস করি না’ বলতে দিতে চাইলে কাউকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা হারাম’ও বলতে দিতে হবে- এরকম এক ফ্যালাসির জাল বিস্তার করেছেন একজন এফবি ফ্রেন্ড। বুঝে বা না বুঝে অনেকে ওই জালে ধরাও দিচ্ছেন দেখলাম।

আমার মতে, এই দুটো বিষয়ে কোনো যৌক্তিক সমীকরণ চলে না। বিষয় হিসেবে একটা ব্যক্তিক, অন্যটা সামাজিক।

যে বলে, আমি ‘পরকালে বিশ্বাস করি না’, সে কেবল তার নিজের কথাই বলে। অন্যের জন্য তা কোনোভাবেই হুমকি হয়ে ওঠে না। বিপরীতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা হারাম’ বললে তা কেবল বক্তার নিজের মত মাত্র থাকে না, বরং ১০০ ভাগ ফতোয়া হয়ে যায়। নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়সহ সব মানুষের ওপরেই তা ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি এই ফতোয়া মানুষে মানুষে বিভেদ ঘটায় ও বিদ্বেষ ছড়ায়।

আমার যুক্তি কি ঠিক আছে, ফ্রেন্ডস? এই যুক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে আপনার যুক্তি কী তা জানতে ইচ্ছে করে। আমাকে ঋদ্ধ করুন, প্লিজ।

মুজিবের স্ট্যাটাসে অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য লিখেছেন, অনেকের মধ্য জনৈক জলধি রায়-এর মন্তব্য ছিল- ‘মূল প্রশ্নটা নীতিগত অবস্থানের। নীতিগত অবস্থান যদি ভিন্ন এবং পরস্পরবিরোধী হয় তাহলে মল্লযুদ্ধ ছাড়া আর কোনো সমাধান নেই। তবে মল্লযুদ্ধ অনেক দূর এড়ানো যায় যদি উভয়পক্ষই যুক্তিকে সমাধানের উপায় মনে করে। একপক্ষ যুক্তিকে অস্বীকার করলে মল্লযুদ্ধ ছাড়া উপায় নেই।’ আমি নিজেও একটা মন্তব্য লিখেছিলাম, আমার মন্তব্যটা ছিলো নিম্নরূপ-

‘এ বিষয়ে বলবার আছে, তবে এই মুহূর্তে চুপ থাকছি; তবে তাড়াতাড়িই লিখব। যে পক্ষ বলে, ‘এটা হারাম ওটা হারাম’; তিনিসহ তার সমর্থকরা ঐ লোকপ্রবাদে বিশ্বাসী, যেখানে বলা হয়, ‘বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার!’ আমাদের সমাজের মানসিক স্থিতিও তার এবং তাদের পক্ষে। তারা বিভিন্ন সময় মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে যা খুশি বলবেন, তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না; আর দ্বিতীয় পক্ষ যিনি বা যারা বলেন, ‘আমি পরকাল মানি না!’ তার পক্ষে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। যদি কেউ তাকে সমর্থন করতে চান তবে গোপনে করবেন, না হয় লাঞ্ছিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়; দেশের সর্বোচ্চ অবস্থানের ব্যক্তি থেকে সর্বমূর্খের অবস্থান এ ক্ষেত্র অভিন্ন।

মনে হয় শূন্য হয়ে আবার শূন্য থেকে শুরুর প্রস্তুতিপর্ব চলছে, আপাত এটুকুই আশার কথা, বাকি সবটাই ধোঁয়াশা।

আপনার যুক্তি গ্রহণযোগ্যই মনে করছি মুজিব, তবে ক্রমশ ক্ষীয়মান হওয়ার শঙ্কাও অন্তরকে উদ্বেগাকুল করছে। আপনার এ বোধটিকে মান্য করে আরো প্রবল হয়ে কেউ আসবে কি, প্রশ্ন আমার সেখানে।

কথা হচ্ছে সমাজের প্রত্যেকের বিশ্বাস অভিন্ন নয়, আবার প্রত্যেকেই নিজের বিশ্বাসটিকে শেষ কথা বলে মান্য করেন; কিন্তু যুক্তি-তর্ক এমন এক অনুষঙ্গ, যেখানে পরমতসহিষ্ণুতাকে মান্য করার মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হয়। যুক্তি-তর্কে হেরে গেলে যারা মল্লযুদ্ধকেই মীমাংসা মনে করেন, তারা যেমন ‘বিচার মানি তালগাছ আমার’ গোত্রের মানুষ, তেমনি অন্যপক্ষ জানেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মন অন্ধতায় আচ্ছন্ন, তারা আবেগের আবর্তে চক্বর খায়, নিজের চিন্তা-চেতনার বিপক্ষে কোনো নতুন কথা ধারণ করার শক্তি-সাহস-মানসিকতা কোনোটাই তাদের নেই। সেদিক থেকে প্রশাসন-মিডিয়া সবাই চেয়ার আর পসারের স্বার্থে বৃহত্তর শ্রেণির সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলতে চায়। নতুন কথা বিশ্বাসে স্থান দেয়া সহজ নয়, এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি নতুন কথায় কখনো যে সত্য লুক্কায়িত থাকে, সে কথাও উড়িয়ে দিতে পারি না। মনে করুন বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর কথা। পৃথিবীকে নতুন কথা শোনাবার অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কিন্তু গ্যালিলিওর কথা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। আজো পৃথিবীর মানুষ তার কথা, ‘পৃথিবী সূর্যের চারদিকে আবর্তন করে’ কে-ই সতত সত্য বলে মান্য করে। আড়াই হাজার বছরেরও আগে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসকে অভিযুক্ত করে বিচারে হেমলক পানে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, সে দণ্ড কার্যকরও করা হয়েছিল। আড়াই হাজার বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর সে দেশের আদালত সক্রেটিসকে নির্দোষ ঘোষণা করে নতুন রায় দিয়েছে সম্প্রতি। গ্যালিলিও আর সক্রেটিস দুই মহান মানুষের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমি বলতে চাই, শিক্ষা ও জ্ঞানের বিস্তার আমাদের অন্ধজনের দৃষ্টির আলো হয়তো একদিন বদলে দিতেও পারে।

দেখুন আমি যাত্রা শুরু আর লক্ষ্যের কথা বলতে বসে কোথায় এসে দাঁড়ালাম?

যাত্রারম্ভে শুভবার্তা বলার জন্য কাউকে কাছে না পেলেও যাত্রাটি কিন্তু শুরু হয়েই যায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি বোধ হয় আমি নিঃস্ব, আমি একা, আমি শূন্য; তাহলে বলতে পারি মরুতে হারিয়েছে নদী চলার গতি। তারচেয়ে আসুন আমরা সমুদ্রমুখী হই। কোনো যাত্রার শেষ যেন শূন্য না হয়; শেষে থাকবে আশাবাদ, অপার সম্ভাবনা। ঝরেপড়া বিবর্ণ পাতাটিও পুড়ে ছাই হয়ে ফিরে আসে নতুন করে মৃত্তিকার হাত ধরে; তাই তো মৃত্তিকা আমার শেষ আশ্রয়। ক’দিন আগে ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের অপশক্তি’ প্রসঙ্গে বলেছিলাম, আমি বলছি না সেটা সর্বাংশে বাতিলযোগ্য; আমি শুধু বলতে চেয়েছি, যে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট আমাকে উন্মুল করে দিতে চায়, আমাকে উদ্বাস্তু করতে চায়, আমার ভালোবাসাকে কাঙাল করতে চায়, তাকে আমি কেন গ্রহণ করব? কেন আমি আমার পূর্ব প্রজন্মের আত্মত্যাগের শৌর্যের কথা ভুলে যাব। কেন আমি আমার স্বপ্ন হারিয়ে ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তে কেনা স্বাধীনতাকে বিপন্ন করব? তাই বলি, আসুন শেষ করার আগে সম্ভাবনার দুয়ারটি খোলা রাখি, পরম্পরাকে বাঁচিয়ে রাখি।

ফরিদ আহমদ দুলাল : কবি ও প্রাবন্ধিক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

ঈদ প্রতিবার, এবারো

ফরিদ আহমদ দুলাল

পথের শেষে কী?

Bhorerkagoj