মাসিক নিয়ে আর নয় লুকোচুরি

সোমবার, ৩ জুন ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ

‘প্রথম যেদিন পিরিয়ড হয়েছিল সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলাম। মাকে জড়িয়ে কান্না করেছিলাম। কিন্তু মা আমাকে বিষয়টি খুবই সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথম দিনই আমি জানতে পেরেছিলাম পিরিয়ড কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বরং আমি সুস্থ আছি সেটিরই বহিঃপ্রকাশ।’ নিজের প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতার কথা এভাবেই জানালেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের ছাত্রী শায়লা শারমিন।

কিন্তু সবাই শায়লার মতো এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী হয় না। এমনকি কাছের মানুষের সঙ্গেও না। তারা ভাবেন বিষয়টি অতীব গোপনীয়। শায়লা বলেন, পিরিয়ড, মাসিক, ঋতু¯্রাব, মিন্সস্টেশন এসব শব্দ এখন আর কারো অজানা নয়। তবুও আমাদের দেশে এ বিষয়ে রয়েছে এক ধরনের লুকোচুরি। অনেকে তো এটিকে অসুখ মনে করেন। পিরিয়ডকে অনেকে শরীর খারাপও বলে থাকে। স্বাভাবিক একটা ঘটনাকে লজ্জায় আমরা শরীর খারাপ আখ্যা দিয়ে দেই। অনেকে মাসিক শব্দটা শুনলেও মুখ টিপে হাসে। যেমন মাসিক ম্যাগাজিন, পত্রিকা এসব নিয়েও যখন কথা হয় তখনো কিছু মজা লুটেরা মুখ টিপে হাসে এবং ইঙ্গিতপূর্ণভাবে দ্বিতীয়বার শব্দটা উচ্চারণ করেন। অনেকেই ফার্মেসি থেকে প্যাড কিনতে গিয়ে মুখে কিছু না বলে আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে দেন তিনি কোন কোম্পানির প্যাড নিতে চান। এ ছাড়া কম বয়সী ছেলে থাকলে সেই ফার্মেসিতে প্যাড কিনতে অনেকেই লজ্জায় যেতে চান না।

স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ইস্যুটি শুধু স্বাস্থ্যসেবা, ন্যাপকিন প্যাড কিংবা স্যানিটেশনের সঙ্গেই জড়িত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকজন মেয়ের জীবন, যা জাতির জীবনে চরমভাবে প্রভাব ফেলে। পিরিয়ড মেয়েলি কোনো অসুখ নয় বরং এটা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক। সাধারণত ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সে পিরিয়ড শুরু হয়। পৃথিবীর সব নারীকেই এই প্রাকৃতিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সাধারণত এটি প্রতি ২৮ দিন পরপর হয়ে থাকে, তবে এর আগে ও পরেও হতে পারে। যা ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। পিরিয়ড একজন নারীকে ভবিষ্যতে সন্তানসম্ভবা হতে শারীরিকভাবে প্রস্তুত করে। এ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় যার পিরিয়ড হচ্ছে সে লোকলজ্জার ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পিরিয়ড সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা একেবারেই নেই। আর তাই ওই নির্দিষ্ট সময় বহু মেয়ে স্কুলে বা কাজে যেতে পারে না।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৪ ভাগ স্কুলে মাসিক নিয়ে কোনো শিক্ষা দেয়া হয় না। তবে ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ৬ ভাগ স্কুলে মাসিক নিয়ে শিক্ষা দেয়া হতো সেখানে ২০১৮ সালে ৩৬ ভাগ স্কুলে মাসিক নিয়ে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ পিরিয়ড নিশ্চিত না হওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। এর মধ্যে একটা কারণ হচ্ছে অনেক মেয়েকেই পিরিয়ডের ব্যাপারে সঠিক তথ্য দেয়া হয় না। তাই প্রথম পিরিয়ডের সময় মেয়েরা পিরিয়ডকে কোনো অসুখ মনে করে ভয় পেয়ে যায়। নিজেদের একা আর অসহায় মনে করে।

স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী বলেন, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে’। মাসিকের সময়টা প্রতিটি মেয়েদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় সে যদি তার চারপাশ থেকে সহযোগিতা পায়, তাহলে সে সুস্থতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বড় হয়ে উঠতে পারবে। পিরিয়ডের সময় নারীকে সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করতে হবে। শর্করা সংবলিত শস্য, ডাল, শাকসবজি, দই, আলু খেতে হবে। আমিষ জাতীয় খাদ্য যেমন- দুধ, ডিম, বাদাম, মাছ ও মাংস খেতে হবে। আয়রণ বা লৌহ জাতীয় খাদ্য যেমন- ডিম, সিম, পালংশাক, আলু, কলা, আপেল, গুড়, খেজুর, কালোজাম ইত্যাদি খেতে হবে। ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন- বাদাম, সয়াবিন, গাঢ় সবুজ শাকসবজি খেতে হবে। ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার-দুগ্ধজাত খাবার, দুধ, ডিম, বাদাম এবং সয়াবিন খেতে হবে। কম লবণযুক্ত খাবার খেতে হবে। তাজা ফলের রস পান করতে হবে এবং অতিরিক্ত চা-কফি পান থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিদিন ৮-১০ গøাস পানি পান করতে হবে। সব ধরনের কাজ করতে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সমাজের কোনো কুসংস্কার না মেনে তাকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করতে হবে।

স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিরিয়ডের আগে ও সময় হতে পারে কিছু সমস্যাও। এ সময় নারীদের মাথা ব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, খিদে না পাওয়া, বমি বমি ভাব, স্তন ফুলে যাওয়া, অল্পতেই অবসাদ অনুভব করা, ঘুমের সমস্যা, কোনো কোনো মহিলার ক্ষেত্রে মেজাজের পরিবর্তন হওয়া ও খিটখিটে হয়ে যাওয়া মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন হতে পারে। তবে এসব লক্ষণের সবগুলো সবার মধ্যে নাও দেখা যেতে পারে। পিরিয়ডের সমস্যা হলে সেটিও গোপন করা উচিত নয়। অতি সত্বর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। সুস্থ ও নিরাপদ পিরিয়ড নিশ্চিত করতে পারলে সুস্থ ও নিরাপদ থাকবে দেশের নারীরা, সেইসঙ্গে আগামী প্রজন্মও।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj