নারীকে তুচ্ছজ্ঞান করা বন্ধ হোক

সোমবার, ৩ জুন ২০১৯

লীনা পারভীন

প্রায় প্রতিদিনের সংবাদের আইটেমে নারী নির্যাতন, নারী ধর্ষণের মতো ঘটনা থাকেই। নারীর প্রতি এই সহিংসতা বা নির্যাতন কোনো বয়সের মাত্রা দেখে ঘটছে না। এর শিকার হচ্ছে শিশু থেকে বৃদ্ধা সবাই। একের পর এক ধর্ষণ নির্যাতনের ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করে চলেছি। এখানে আমরা কেবলই দর্শকের ভূমিকায় আছি। খুব বেশি হলে রাস্তায় নেমে ব্যানার হাতে দুই চারটা প্রতিবাদ হচ্ছে, মিছিল হচ্ছে, পত্রিকায় লেখা হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নারী নির্যাতনের একটি ঘটনারও আমরা বিচার দেখিনি।

‘নারী অধিকার’ ‘নারী স্বাধীনতা’ এই প্রচলিত শব্দগুলো এখন অনেকটাই আভিধানিক বলে মনে হয়। যদিও আমাদের দেশের নারীরা অনেক এগিয়েছে কিন্তু তার কতটা চেতনার দিক দিয়ে আর কতটা পারিপাশির্^ক চাপে তৈরি হয়েছে সেটাও বিবেচনার বিষয়। একদিকে যেমন নারীরা নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে, লড়াইয়ের মানসিকতা বাড়ছে। নিজেকে সাহসী করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসছে আবার অন্যদিকে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে।

কোনো সমাজে যখন নারীরা বেশি বেশি করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে তখন সমাজের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয় এর মূল কারণ হচ্ছে সমাজ নারীদের বহির্মুখী হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়নি। এই যে প্রতিদিনের সহিংসতার চিত্র এটা কী নতুন? না হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে? না, নতুন নয় কিছুই। নারীর প্রতি সহিংসতা, গৃহ নির্যাতন সবই ছিল কিন্তু আগে নারীরা মুখ খুলতো না বলে অনেক ঘটনা চাপা পড়ে যেতো। এখানে অবশ্য মিডিয়া জগতের একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা এখন অনেক বেশি আধুনিক। মগজে মননে আধুনিক না হলেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়েছি অনেক। এই প্রযুক্তি কল্যাণে এখন গ্রাম থেকে শহর সব জায়গাতেই মুহূর্তের মধ্যেই যে কোনো ঘটনা ছড়িয়ে পড়ছে। নির্যাতিত নারীরাও এগিয়ে আসছে নিজেদের কথা বলতে, প্রতিবাদ করতে।

আর এটাই আমাদের সাহায্য করছে নির্যাতনের ঘটনাকে দ্রুত জেনে নিতে। খেয়াল করলে বুঝতে পারব বেগম রোকেয়ার সময় থেকে আজকে পর্যন্ত নারী বিষয়ে সামাজিক বাস্তবতা কতটা পরিবর্তন হয়েছে? খুব বেশি কী এগিয়েছি? এখনো আমাদের সমাজে কন্যা সন্তান হলে পরিবারে আফসোস করা হয়। এখনো আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা কন্যা সন্তানকে তাদের সম্পত্তিতে সমান অধিকারের যোগ্য বলে মনে করে না। ঘরের কন্যাদের উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশেও পাঠাচ্ছে কিন্তু চূড়ান্ত অর্থে মানসিকতার কোনো আমূল পরিবর্তন কী হয়েছে? একটা মেয়ে যখন মাস্টার্স পাস করে তখন প্রথমেই কথা উঠে মেয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে এখনো বিয়ে কেন দেয়া হচ্ছে না? নিজের ভাইটি এখনো তার বোনকে একজন মেয়ে হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত হয়।

এখনো আমাদের নাটক সিনেমাতে মেয়েদের দেখানো হয় ছিচকাঁদুনে হিসেবে। নারীর হৃদয় কোমল না হলে সে আবার নারী নাকি? নারীরা কখনো কঠোর হতে পারে না। নারীর কোনো নিজস্ব ঘর থাকতে নেই। নারীর কোনো নিজস্ব মত থাকতে নেই, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ততটুকুই পায় যতটুকু তার পরিবার তাকে অনুমোদন দেয়।

মোবাইল গেইম থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটা ক্ষেত্রেই নারীদের দেখানো হচ্ছে ছোট করে। বিজ্ঞাপনে নারীকে স্বাবলম্বী দেখনোর পাশাপাশি দেখানো হয় সে কেমন করে একজন ভালো গৃহিণী যে একই সঙ্গে বাইরে চাকরি করে, শ্বশুর-শাশুড়ি ননদ দেবরের জন্য এমনকি দেবরের বন্ধুদের জন্যও সে দক্ষতার সঙ্গে খাবার বানিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ নারী তুমি যতই বাইরে কাজ করো না কেন, তোমার গৃহ দায়িত্বকেও সমানভাবেই চালাতে হবে। তোমার বিশ্রামের অধিকার নেই, কাজ না করে ইচ্ছা পূরণের অধিকার নেই। আমাদের দেশে আমরা গর্ব করে বলি নারীরা এখন অনেক ক্ষমতাশালী। প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশ পরিচালনায় আছে নারীদের অংশগ্রহণ। ভালো কথা। আনন্দিত হই আমরা। কিন্তু এর সবই তুচ্ছ হয়ে যায় যখন দেখি পাঁচ বছরের পূজাকে বেøড দিয়ে তার যোনি কেটে ধর্ষণ করা হচ্ছে, গাজীপুরের সেই হতভাগা বাবা-কন্যাশিশুর নিগৃহীত হওয়ার ঘটনার বিচার না পেয়ে ট্রেনের নিচে আদরের কন্যাকে নিয়ে আত্মহত্যা করে। আমরা লজ্জিত হই এসব দেখে। একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে কিন্তু একটারও কোনো বিচার হয় না।

সরকারের লক্ষ্য অর্জিত হয় কিন্তু সমাজ থেকে নারীর প্রতি কুরুচিপূর্ণ দৃষ্টির পরিবর্তন হয় না বরং দিনে দিনে আরো মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বিচারহীনতার এই অবস্থাই আজকে নারীর প্রতি সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। নারী হলেই পুরুষরা ধরে নেয় তাকে নিয়ে যা ইচ্ছা তা করা যায়। ঘরে ঘরে নারী নির্যাতন চলে শহর থেকে গ্রামে সব জায়গায়। কী শিক্ষিত কী অশিক্ষিত কেউই এখানে আলাদা নয়। শিক্ষিত সমাজে নারী নির্যাতন চলে ঘরের কোনে। নারীর কান্না সেখানে চার দেয়ালে চাপা পড়ে যায়। পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাছে ক্ষমতাহীন নারী বড় অসহায় হয়ে যায়। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একদিকে দরকার কঠোর আইনের শাসন নিশ্চিত করা আরেকদিকে দরকার সমাজে নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার মতো ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম। সেই কাজ কেবল সরকার নয়, ব্যক্তি থেকে শুরু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে নারীরাও এই সমাজের অংশীদার। সমাজ গঠনে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদানকে তুলে ধরতে হবে নানাভাবে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj