মধুবালা নিতাই

শনিবার, ১ জুন ২০১৯

দাসের বউ ছিল : হিমু আকরাম

কোনো এক কার্তিক মাসের সন্ধ্যায় জেলে পাড়ায় শঙ্খ বাজে। দু-চারটা আতশবাজি ফোটায় দুষ্টু বালকের দল। রসগোল্লার হাঁড়ি আর জিলাপির লোভে ছুটে আসে বুড়ি-ছুড়ি সবাই।

তাদের উলুর শব্দে ডানা ঝাপটায় নদী পাড়ের সারসের দল।

ধবধবে সাদা ধুতি আর টোপর পরা নিতাই দাস সাতপাকে বাঁধে মধুবালা নামের একজন মায়াবতীকে!

সন্ধ্যা হলে এখন আর কড়ি খেলতে যায় না নিতাই। শনিবারের হাটে জুয়ার আসরে বসা হয় না ম্যালা দিন। দ্য নিউ ঝুমুর অপেরায় প্রিন্সেস বিউটির নাচ দেখে মাতাল পুরো জেলেপাড়া।

শুধু নিতাইয়ের যাওয়া হয় না সেখানে। তার দিন যায়, রাত পোহায় কেবল মধুবালাকে দেখে। নিতাই দাসের আদরের বউ মধুবালা!

২.

পৌষ মেলায় রেশমি চুড়ি ফুটে থাকে কচুরিপানা ফুলের মতো, মান্তি খুড়ির ঘোলা কাচের কাঠের বাক্সে। নিতাই দাস চুড়িগুলো হাত দিয়ে ছোঁয়। মান্তি খুড়ি ফোকলা দাঁতে হাসে।

: দুই হাত ভরতে কয় ডজন চুড়ি লাগে খুড়ি?

: তিন ডজন। হাত প্রতি ১৮টা।

: হাত নাড়াইলে ঠুং টাং শব্দ হইব তো?

: হইব!

: চুড়ি পিনতে যাইয়া আমার বউয়ের হাত কাটলে?

খুড়ি হাসে। নিতাই লজ্জা পায়।

: কী হইল? কও না ক্যান? কাচের চুড়িতে হাত কাটব না বউয়ের?

: কাটব!

নিতাই চুড়ি রেখে দেয়। বুড়ির দিকে তাকায়।

: থাক। নিমু না তাইলে। হাত কাটলে বউ দুখ পাইব।

: না নিলে আরো বেশি পাইব। লাল চকমকা কাচের চুড়ি।

নিতাই বুড়ির দিকে চেয়ে থাকে। বুড়ি হাসে।

: তরে ডর দেখাইছি ছ্যামরা। হাত কাটব না। নিয়া যা।

নিতাইয়ের মুখে হাসি ফোটে। ডালিম রঙা কাচের চুড়ির দিকে তাকিয়ে মধুবালার কথা ভাবে। দু’হাতে চুড়ি পরা মধু সুগন্ধী তেল মাখে চুলে। চুড়ির রিনঝিন শব্দ কাটা ঘুড়ির মতো গোত্তা খেতে খেতে চলে যায় ঘর দোর উঠান পেরিয়ে খেয়া ঘাট পর্যন্ত। নিতাই দাস সেই শব্দের পিছে ছুটে। মধুবালার গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে…!

৩.

নদীটা মরা। মহিষের পাল নাক ডুবিয়ে খায় বুনো ঘাস। মাঝে মাঝে দুএকটা মুখ ফিরিয়ে পাড়ের দিকে তাকায়। লেজ নাড়ে।

পাড়ে বসে আয়েশ করে জিলিপি খায় মধু। নিতাই দাস চেয়ে থাকে। মধু হাসে। নিতাই মুগ্ধ চোখে বউকে দেখে। তারপর বলে-

: জিলাপিগুলান কেমন? মিঠা লাগে?

: জ্বে না। তিতা লাগে!

: কও কী? ঘোষের দোকানের জিলাপি। তিতা হইব ক্যান?

: ঘোষ মনে হয় জাইনা গেছে আপনার বউয়ের নাম মধুবালা। তাই জিলাপিতে তিতা দিয়া দিছে!

: বোঝলাম না।

মধুবালা নিতাইয়ের দিকে তাকায়। হাসে। তার গালে টোল পড়ে। সে জিলাপিতে কামড় দেয়।

: যার নাম-ই মধু তারে কি তিতায় ধরে? হেয় তো যেইখানেই কামড় দেয় সেইখানটাই মিঠা হয়া যায়।

: তুমি ম্যালা পাগল আছ মধু।

: ক্যান? ডর করে? পলায়া যাবেন?

: কী কও এইসব? পলায়া যাব ক্যান? ক্যান ডর করব?

: ঐ যে কইলেন, আমি ম্যালা পাগল আছি। পাগলরে ঘোষের দোকানের জিলাপি খাওয়ান যায়। সারা জনম পাশে রাখন যায় না!

: রাখন যায়। তর জন্যই তো নয়া ঘর তুলছি। পনের ট্যাকা জমাইছি। মহাজনের কাছে দস্তখত দিয়া নিছি ইলিশের নৌকা।

মধু হাসে।

: জাউলার বেটার তো দেহি বেজায় সাহস।

নিতাই ধুতির কোচড় থেকে চুড়ির গোছা বের করে। মধুর হাতে দেয়। মধু খুশি হয়। কাচের চুড়ি দুই হাতে পরে। নিতাই মুগ্ধ হয়ে দেখে। মধু তার হাত ধরে পরম মমতায়-

: আপনে আমারে ভালোবাসবেন তো পুরা জীবন?

: বাসমু!

: ছাইড়া যাইবেন কুনোদিন?

: যামু!

মধুবালা চমকায়। হাত ছেড়ে দেয় নিতাইয়ের। তার চোখ ছল ছল করে।

: যেদিন আমারে চিতায় উঠাইবি। সেদিন ছাইড়া যামু!

নিতাই অন্যদিকে চেয়ে থাকেংং মধুবালার গাল বেয়ে জল গড়ায়। ওপারে মহিষের পাল লেজ নাড়ে। তাদের পিঠে খেলা করে দুষ্টু শালিক! মধু শালিক দেখে না। নিতাইকে দেখে। ঘোলা চোখে শুধু নিতাইকেই দেখে!

৪.

বর্ষায় নদীতে ইলিশ নামে। নৌকা ছেড়ে ঘরে বসে থাকে নিতাই। হাত পা ধরলে রাজি হয় মা। মধু কে সঙ্গে দেবার!

বউ, আর তিন জন জেলে নিয়ে নৌকা ভাসায় নিতাই। আনন্দে মূর্ছা যায় মধুবালা। নৌকার গলুইয়ে বসে নিতাইয়ের হাত ধরে বলে-

: পুরা জীবন এইভাবে ধইরা থাকমু আমি। গরম ভাত না, একটু মায়া দিয়েন শুধু!

পাড়ে তখন মিট মিট করে জোনাকি, আকাশে লেপ্টে থাকে তারা। নিতাই জানে না কোনটার নাম অরুন্ধতী, স্বাতি। জানে না কোনটার নাম কালপুরুষ। সে শুধু জানে তার তারাটির নাম মধুবালা। সেই তারাকে বুকে জড়িয়ে নিতাই বলে-

: শুধু মায়া না বউ- গরম ভাত, দোচালা টিনের ঘর, ধানি জমি, নৌকা আর একটা পরীর মতন মাইয়া দিমু তরে!

তারপর জোছনার বান নামে নদীতে। রুপালি ইলিশের ঝাঁক খল খল করে গুটির জালে। দূরে কোথাও নিশিপাখি ডাকে। সেই নিশিপাখির ডাক চূর্ণ করে ডাকাতের দল উঠে আসে নিতাই দাসের নৌকায়। ইলিশ বেচার টাকা নেয়ার পর নিয়ে যায় মধুবালাকেও! দোনলা বন্দুকের বাটের আঘাত খাওয়া নিতাই দাস কিছুই দেখে না আর। শুনতে পায় না মধুবালার চিৎকার!

৫.

নিতাই দাশ তাকে মধুবালা ডাকত না কোনোদিন। ডাকত, শুধুই মধু! এক কৌটা সিঁদুর, এক ডিব্বা কাজল আর এক শিশি আলতা ফুরানোর আগেই মধু হারিয়ে যায়!

দূরে তখন নিশিপক্ষী ডাকে, মহাজনী নৌকায় দোলে হলদে আলোর হারিকেন। অতল জলে ঝাঁপ দেবার পর কেউ আর মনে রাখে না মধুবালা নিতাই দাসের বউ ছিল!

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj