স্বপ্নের শাড়ি : মোনোয়ার হোসেন

শনিবার, ১ জুন ২০১৯

জ্ঞান ফিরতেই অনুভব করি শরীরটা ব্যথায় টনটন করছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন হাতুড়িপেটা করে শরীরের সবগুলো হাড় ভেঙে গুঁড়ো করে দিয়েছে। আস্তে আস্তে চোখ দুটো খোলার চেষ্টা করি। খুলতে পারি না। তবুও চেষ্টা করি। বারবার চেষ্টা করি এবং এক সময় সফল হই। চোখ খুলে তাকাই। দেখি আমি হাসপাতালের ধবধবে সাদা বেডে শুয়ে আছি। এ কী! আমি হাসপাতালে কেন? চারপাশে ভালো করে তাকাই। দেখি হাসপাতালে শুয়ে থাকা সব মুখগুলোই যেন পরিচিত। সবার সঙ্গে কোথায় যেন দেখা হয়েছে আমার। কোথায় দেখা হয়েছে? এই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছি না। দেখি কারো হাত, কারো পা, কারো সারা শরীরই ব্যান্ডেজ করা। আমি ভয় পেয়ে যাই। চোখ ঘুরিয়ে নিজের শরীরের দিকে তাকাই। এরপরই আঁৎকে উঠি। আমারও শরীরজুড়ে সাদা ব্যান্ডেজ! কী হয়েছে আমার? কেন আমি হাসপাতালে? কেন আমার শরীরজুড়ে ব্যান্ডেজ করা?

মাথা ঝিম ধরে। মনে করার চেষ্টা করি। আস্তে আস্তে সবকিছু আবছা আবছা মনে পড়ে।

গতকাল চৌধুরীর বাড়ি থেকে মাইকিং করা হয়েছিল, আগামীকাল সকাল দশটায় চৌধুরী বাড়িতে জাকাতের কাপড় দেয়া হবে।

জাকাতের কাপড়!

জাকাতের কাপড়ের কথা শুনে আনন্দে চোখ দুটো আমার চকচক করে উঠে। রাশেদার মাকে কতদিন একটা নতুন শাড়ি কিনে দিতে পারিনি। কী একটা মরণঘাতী অসুখ নিয়ে বিছানায় পড়ে আছে দুই বছর ধরে। হাতে টাকা নেই। ভালো চিকিৎসা করাতে পারি না। চিকিৎসার অভাবে রোগটা দিন দিন আরো বেড়ে যাচ্ছে। রাশেদার মা আরো খারাপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কখন কী হয় কে জানে। ঈদে যদি এই অসুস্থ বউকে একটা নতুন শাড়ি কিনে দিতে পারতাম! ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। যেটুকু সম্পত্তি আর পুঁজি ছিল রাক্ষুসী অসুখটা তো সব শেষ করে দিয়েছে। পেটের তাগিদে এখন আমি রিকশা চালাই। যা আয় তা দিয়ে সংসার চালানো আর বউয়ের ওষুধ কিনতেই হিমশিম খেতে হয়। নতুন কাপড়চোপড় কেনার কথা ভাবা তো রীতিমতো মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার মতো দুঃস্বপ্ন! চৌধুরীর বাড়িতে জাকাতের কাপড় দেবে শুনেই মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। ফজরের নামাজ পড়েই রওনা হই চৌধুরীর বাড়িতে। সেখানে পৌঁছে দেখি এলাহি কাণ্ড! হাজার হাজার লোক। যেন চৈত্রমাসের বান! ভিড় ঠেলে সামনে যাই। লাইনে দাঁড়াই।

কাপড় দেয়া শুরু হলো। লাইনে দাঁড়িয়ে আমিও পেলাম একটা শাড়ি। আমার স্বপ্নের শাড়ি! শাড়িটা পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলাম গভীর মমতায়। ভালোবাসায়। আলতো করে ছুঁয়ে দিলাম গালে। হঠাৎ পিছনে কী হলো কে জানে। শুরু হলো চিৎকার, হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি। ঠেলাঠেলিতে অনেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আমিও আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে। তারপর আর কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফিরেই দেখি শুয়ে আছি হাসপাতালের ধবধবে সাদা বেডে।

একজন নার্স এসে হাসিমুখে বলল, চাচা, আপনি বুঝি চাচিকে খুব ভালোবাসেন?

-কেন মা?

অজ্ঞান অবস্থায়ও আপনি যেভাবে শাড়িটাকে বুকে চেপে ধরে রেখেছিলেন।

নার্স শাড়ির কথা বলতেই চোখে পড়ল শাড়িটা। শাড়িটা পড়ে আছে মাথার দিকে। বালিশের কাছে। শাড়িটা দেখেই চোখ দুটো আবার আনন্দে চকচক করে উঠল। মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠল রাশেদার মায়ের হাসিমুখ। নতুন শাড়ি পেয়ে খলখলিয়ে হাসছে সে।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj