সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে

শুক্রবার, ৩১ মে ২০১৯

মাকিদ হায়দার

সেপ্টেম্বর ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা, যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন [সিএসপি] উক্ত সংস্থায় যোগ দিয়েছিলেন চেয়ারম্যান পদে। পাকিস্তান আমলে মুষ্টিমেয় জনাকয়েক ভালো ছাত্র হিসেবেই তিনি ইতিহাসে অনার্স এবং মাস্টার্সের প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে যোগ দিয়েছিলেন সেকালের জগন্নাথ কলেজে, প্রভাষক পদে। তাকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে প্রভাষকের পদে নেয়া হয়নি। কেননা, তখনকার দিনের অধিকাংশ কৃতী ছাত্রছাত্রীরা, সোভিয়েত ইউনিয়নের সপক্ষে ছিলেন, ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা, শিল্প সাহিত্যে এবং নন্দন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে অনেকেই তাদের ভেতরে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন। অথচ মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে চাকরি দিতে সম্মত হননি সেকালের বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যেহেতু জনাব সিরাজ ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য। কেননা, না-পাক সরকার সমর্থক ছিল আমেরিকা সরকারের। অপরদিকে জনাব সিরাজ, তার ছাত্রজীবন থেকেই দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক সংবাদে খণ্ডকালীন চাকরি করে যে অর্থ পেতেন তাই দিয়ে চালিয়ে গিয়েছিলেন বিশ^বিদ্যালয়ের পড়ালেখার জীবন। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি গ্রামে, পিতার একমাত্র ছেলে। তবে পিতার আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় স্কুল-কলেজ জীবন থেকে বৃত্তি এবং প্রথম শ্রেণি পেয়ে তার পড়ালেখার জীবন চালিয়েছিলেন এবং সম্ভবত তিনি মাত্র ৫ টাকা বৃত্তি পেতেন প্রতি মাসে। কালী নারায়ণ স্কলারশিপ বা বৃত্তি।

তার সঙ্গে আমাদের অগ্রজ জিয়া হায়দারের সখ্য হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। জনাব সিরাজ বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হওয়ার সুবাদে তার কাছে কবিতা দিতে গিয়েছিলেন আমাদের অগ্রজ জিয়া ভাই। জিয়া ভাই তখনো পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র। সেই বছরে কলেজের ছাত্র সংসদের ভোটাভুটিতে সাহিত্য সম্পাদক হয়েছিলেন। কামাল লোহানীদের ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়ে হয়েছিলেন সাহিত্য সম্পাদক। তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের সমর্থক। সেই ১৯৫০-৫১ সাল থেকে তার কবিতা ছাপা হতো দৈনিক আজাদ, ইত্তেফাক, সংবাদ ও মিল্লাতে এবং একই সঙ্গে ছিলেন পাবনা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘পাক হিতৈষীর’ সাহিত্য সম্পাদক, পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের নিয়মিত কলাম লেখক সৈয়দ আজিজুল হক বিএসসি, ক্যাল। সম্পাদক জনাব হক আমাদের অগ্রজকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন কবিতা নিতে, কবি জসীমউদ্দীন এবং তালিম হোসেন, গোলাম মোস্তফার কাছ থেকে। কবি জসীমউদ্দীন পরের দিনই পদ্য দিয়েছিলেন, অপর দুজন পরে ইু ঢ়ড়ংঃ পাঠিয়েছিলেন পাক হিতৈষী সম্পাদকের জন্য।

ঢাকা আসা উপলক্ষে একদিন কবিতা দিতে গিয়েছিলেন সেই তখন থেকেই মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনের অগ্রজের গড়ে উঠেছিল সুসম্পর্ক। ইতোমধ্যে সিরাজ সাহেব কয়েকটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বে। এবং একই সঙ্গে জগন্নাথ কলেজের প্রভাষক থাকাকালীন তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ শেষে প্রথম পোস্টিং পেয়েছিলেন এসডিও হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। পরবর্তী সময়ে মেহেরপুরে এবং ১৯৬৬ সালে এডিসি জেনারেল হয়ে এসেছিলেন পাবনাতে।

জিয়া ভাই ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে এমএ পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। তিনিও সাপ্তাহিক ‘পল্লীবার্তা’ এবং সপ্তাহিক ‘চিত্রালী’তে ছাত্র জীবন থেকে চাকরি করতেন। মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনের মতোই। জিয়া ভাই ১৯৬১ সালেই নারায়ণগঞ্জের তুলারাম কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমির কালচারাল অফিসার থাকাকালীন একবার সম্ভবত ১৯৬৬ সালে পাবনায় গিয়েছিলেন এবং সিরাজুদ্দীন সাহেবকে নিয়ে আমাদের দোহার পাড়ার বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেই সময় আমি দোহার পাড়ায় ছিলাম, তখনি তাকে প্রথম দেখেছিলেম, পাবনার এডিসি থাকাকালীন তাকে বদলি করা হয়েছিল ঢাকায় সম্ভবত উপসচিব পদে। পরবর্তীতে তাকে সিলেটের মৌলভীবাজারে। সেখান থেকেই সম্ভবত সরকার তাকে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর দুয়েক পরে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় এসে শ্যামলীর ইছামতি হাউসের প্রকৌশলী আবুল মুনসুরের বাসায় কিছুকাল অবস্থানের পরে তাকে বাংলাদেশ সরকার পোস্টিং দিয়েছিল তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ে। পরে হয়তো অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে। সেই মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেই তাকে যুগ্ম সচিব বানিয়ে সরকার পোস্টিং দিয়েছিল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা বা বিসিকে ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

তিনি বিসিকে যোগ দিয়ে লক্ষ্য করেছিলেন সংস্থায় কোনো জনসংযোগ বিভাগ প্রায় নেই বললেই চলে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গণসংযোগ বিভাগ দেখভাল করতেন জনৈক মোবায়দুর রহমান, বাড়ি বগুড়া জেলায়। মোবায়দুর রহমান ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর না-পাকদের সোর্স। দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরতে এসেছিল মুক্তিবাহিনীরা। তাকে ধরতে পারেনি। তারই সহকর্মী জনাব সিদ্দিকুর রহমান, তাকে দ্রুত খবর দিয়েছিল, মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে তৎকালের ইপসিক বা ইস্ট পাকিস্তান স্মল এন্ড কটেজ ইন্ডাসট্রির চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা (সিএসপি)।

সিদ্দিক মোবায়দুর রহমানকে জানিয়েছিল এবার আপনাকে ধরতে আসছে। শিগগির জানালার ফাঁক দিয়ে বের হয়ে পশ্চিম দিকের সানশেডে গিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়–ন। জনাব মোবায়দুর রহমান সেদিন সানশেডের ওপর শুয়ে জীবনটাকে রক্ষা করে সেই রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তার অনুজ মাহমুদুর রহমান মান্না। তখন তিনি ছিলেন পাকিস্তানের সপক্ষের সমর্থক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর অনেকের মতোই জনাব মোবায়দুর রহমান জনসমক্ষে আসতে শুরু করলেন। এবং এরশাদ সরকারের সময় মৌলানা মান্নানের দৈনিক ‘ইনকিলাবে’ যোগ দিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে বিস্তর লেখা শুরু করেছিলেন। অপরদিকে আট বছর বিসিকের অফিসার রেজাউল হক এবং সিদ্দিকুর রহমান জোড়াতালি দিয়ে জনসংযোগ বিভাগ চালিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত বলা যায়, ১৯৫৭ সালে যখন শেখ মুজিবুর রহমান বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন তখনই তিনি অনুভব করেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার প্রয়োজন আছে- বিধায় সেই সালেই এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইপসিক। তবে ইপসিকের মূল ভবনটি ৫০ দশকের শেষের দিকে নকশা কেন্দ্রের নামে প্রায় ১০-১২ কাঠা জমির ওপর নির্মিত হয়েছিল প্রথম দিকে, নকশা কেন্দ্রের জন্যই।

নকশা কেন্দ্রের প্রাণপুরুষ ছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান। তারই উদ্যোগে নকশা কেন্দ্রে ৮টি বিভাগসহ ফটোগ্রাফি সেকশন খোলা হয়েছিল। শিল্পী কামরুল হাসান ১৯৭৮-১৯৭৯ সালে অবসরে যাওয়ার পরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রধান নকশাবিদ জনাব এমদাদ হোসেন, কামরুল হাসানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। তবে ভবনটিতে অনেকগুলো তলা নির্মাণ করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে, যুক্ত করা হয়েছিল ভবনটিকে। এবং দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসারের লক্ষ্যে সিএসপি মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনকে চেয়ারম্যান পদে পাঠিয়েছিলেন বিসিকে। তিনি যোগ দেয়ার বেশ কিছুদিন পরেই আমার সঙ্গে এক সন্ধ্যায় ঢাকা ক্লাবে দেখা। দেখলাম জনাকয়েক আমলাসহ এসে বসলেন আমাদের পাশের টেবিলে। যদিও আমি ঢাকা ক্লাবের মেম্বার নই, আমাকে প্রায়শই নিয়ে যেতেন দিনাজপুরের বালুবাড়ির জনাব সাঈদ মেহমুদ বুলু। তার ব্যবসা ছিল আমদানি-রপ্তানির এবং ম্যানপাওয়ারের। অফিস মতিঝিলের রেডক্রস বিল্ডিংয়ে, উপরন্তু তিনি ছিলেন পাবনার বিখ্যাত ব্যবসায়ী মোকারম হোসেনের তৃতীয় কন্যার স্বামী। আমার সঙ্গে পাবনার জামাই হিসেবেই পাবনাতে প্রথম পরিচয়। পরে সখ্য। সেই বুলু ভাই আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকা ক্লাবে। আর সেই দিন আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টির ভেতরে দেখলাম, জনাকয়েক সঙ্গী নিয়ে, ক্লাবে পা রাখলেন একজন ভদ্রলোক।

আমি, বুলু ভাই এবং টেবিলের আরো দুজন গল্পে যখন মেতে উঠেছি, ঠিক তখনি বুলু ভাই বললেন, কবি মাকিদ হায়দার কোন পানীয় তোমাকে দেবে? কথাটি শ্রবণে নিয়েছিলেন সেই ভদ্রলোক। বেশ অনেকখানি সময় পেরিয়ে যাবার পরে ভদ্রলোক তিনি আমাকে তার টেবিলে ডেকে নিয়ে বললেন- তুমি কি জিয়া হায়দারের ভাই? জি¦ বলায় জানতে চাইলেন কোথায় কি করি। বললাম আমি একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করি। তখন তিনি জানতে চাইলেন তোমার কোনো গল্প কিংবা কবিতা গ্রন্থ আছে কিনা। হ্যাঁ বলায় শেষে জানতে চাইলেন লেখাপড়া কতদূর। বললাম, এবার জানতে চাইলেন কোনোদিন সাংবাদিকতা করেছি কিনা?

তার প্রশ্নের উত্তরে জানলাম, জনাব সানাউল্লাহ নুরীর অধীনে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরপরই একটি বাংলা দৈনিক বেরিয়েছিল নাম ছিল ‘নূতন বাংলা’, পত্রিকাটির মালিক ছিলেন ব্যবসায়ী আবিদুর রহমান। সঙ্গে একটি ইংরেজি পত্রিকাও তিনি বের করেছিলেন।

সেদিনের সেই মাদকতাময় সন্ধ্যায় ভদ্রলোক একটি ভিজিটিং কার্ড হাতে দিয়ে বললেন, আগামীকাল মতিঝিলের বিসিক ভবনের ৪ তলায় এসে আমার সাথে দেখা করবে। পরেরদিন বিসিক ভবনের চেয়ারম্যান মহোদয়ের ৪ তলায় উঠবার আগেই দেখা হলো মুহম্মদ খসরু ভাইয়ের সাথে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি বিসিকে কেন? বললাম, চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে দেখা করতে বলেছেন। তিনি হেঁটে আমার সঙ্গে বিসিক ভবনের দোতলায় উঠলেন। এবার আমি তাকে উল্টো জিজ্ঞাসা করলাম, খসরু ভাই আপনি এখানে কেন? তিনি হেসে আমার হাত ধরে তার রুমের ভেতরে নিয়ে গিয়ে রনজু নামের একটি ছেলেকে দুকাপ চা এবং বিস্কুট দিতে বললেন। শেষে জানালেন, আমি নকশা কেন্দ্রের সহকারী ফটোগ্রাফার।

খসরু ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিলে। আমাদের অগ্রজ জিয়া হায়দার প্রতিষ্ঠিত নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজিত বাদল সরকারের ‘বাকী ইতিহাস’ নাটক দিয়েই নাগরিকের মঞ্চ নাটকের যাত্রা শুরু। নাট্যজন আতাউর রহমান- ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফোন করে জিয়া ভাইকে উদ্বোধনীর দিনে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। আমি তখন জিয়া ভাইয়ের লালখান বাজারের ইস্পাহানী বিল্ডিংয়ের ৪ তলায় অবস্থান করছিলাম। অগ্রজ চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় থেকে বিকেলের দিকে বাসায় ফিরে তিনি আমাকে জানালেন, আগামীকালকে আমরা ঢাকায় যাবো ইঞ্জিনিয়ার রুমীর গাড়িতে। তখনকার দিনে রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ সবকিছুই ছিল ভাঙা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। রুমী ভাই ছিলেন অগ্রজের বন্ধু। সেই বন্ধুকেও তিনি আমন্ত্রণ জানালেন আগামীকাল সকাল ১০টায় যেন ব্রিটিশ কাউন্সিলে তিনি আসেন। অবশ্য তার আগে আমি আর রোকন ওখানেই থাকবো। [রোকন আমার ডাক নাম]

‘বাকী ইতিহাস’ নাটকের দর্শকদের টিকেটের মূল্য ছিল তিন টাকা, দ্বাররক্ষী ছিলাম আমি। ওই নাটকে অভিনয় করেছিলেন সুলতানা কামাল, আতাউর রহমান, আজকের সারা যাকের। সম্ভবত বাদল রহমান, রশীদ হায়দার, গোলাম রব্বানীসহ আরও অনেকেই।

নাটক শুরু হবার বেশ কিছুক্ষণ আগেই একজন ক্যামেরাম্যান কাঁধে রোলি ফ্ল্যাকস ক্যামেরা ঝুলিয়ে ঢুকে পড়লেন তিনি। বিনা টিকেটে। কিছু বলতেও পারলাম না। যেহেতু তখনকার দিনে মাত্র দৈনিক ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ, দৈনিক বাংলা এবং বাংলাদেশ টাইমস ও বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকা ছিল। ছিল একমাত্র বাংলাদেশ টেলিভিশন। আমার ধারণা হয়েছিল ক্যামেরাম্যান, নিশ্চয়ই কোনো পত্রিকা থেকে এসেছেন। তাই আমি তখন টিকেট প্রসঙ্গ তুলিনি। নাটক শেষ হওয়ার আগে, মঞ্চে যারা অভিনয় করছিলেন তাদের অনেকগুলো ছবি তুললেন এবং নাটক শেষ হবার পরে অভিনেতা, অভিনেত্রী এবং আমি ও অগ্রজসহ যিনি নাটকের মঞ্চে পর্দা টেনেছিলেন মেকআপম্যান, আলো প্রেক্ষণকারী খোকা ভাই এবং আরো অনেকেই। ক্যামেরাম্যান, আমাদের মাটিতে বসিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের এবং নাগরিকের সভাপতিকে দাঁড় করিয়ে অনেকগুলো ছবি যিনি তুললেন তার নাম তখনি জানলাম। তিনি মুহম্মদ খসরু।

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের বিভিন্ন নাটক কখনো বেইলী রোডের মহিলা সমিতিতে অথবা সমিতির উত্তর দিকের আরেকটি ভবনে মঞ্চায়ন হলে খসরু ভাইকে দেখতাম। বেশ অনেক পরে জেনেছিলেম, তিনি সুস্থধারার চলচ্চিত্রের একজন নিবেদিত মানুষ। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি ছিলেন নিবেদিত সংগঠক এবং বাংলাদেশের অন্যতম চলচ্চিত্র পত্রিকার সম্পাদক। মুহম্মদ খসরু ৬০ দশকের উত্তাল দিনেই শুরু করেছিলেন সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রের আন্দোলন। সেই সময়ে যারা ফ্লিল্ম সোসাইটি আন্দোলন শুরু করেছিলেন কিংবা উদ্যোগী ছিলেন, আমার অভিধায় প্রায় সকলেই কমবেশি যুক্ত ছিলেন অন্যান্য কর্মে। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৩ এই সময়কালের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে- নাম দেয়া হয়েছিল ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ’।

খসরু ভাইয়ের কাছ থেকে পরে জেনেছিলেম, তিনি যখন বিসিক নকশাকেন্দ্রের ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন তখন তার কাছ থেকে জেনেছিলেম ২৫ অক্টোবর ১৯৬৩ সালে চলচ্চিত্র সংসদটি গঠিত হয়। যারা সেই সময়ে চলচ্চিত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। তাদের ভেতরে খসরু ভাই-ই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। জন্ম ৪০ দশকের শেষের দিকে। সেই বিবেচনায় তিনিই ছিলেন আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ সভ্য।

১৯৬৮ সালে মুহম্মদ খসরুর একান্ত প্রচেষ্টায় চলচ্চিত্র পত্রিকা- ‘ধ্রæপদী’ প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। যদিও পরবর্তীতে অনেকেই যুক্ত হয়েছিলেন, যেমন সিনেমা পরিচালক আলমগীর কবির এবং সাপ্তাহিক চিত্রালীর সাংবাদিক লায়লা সামাদ। পরে অভিনেতা হাসান ইমাম এবং আরেকজন- [খসরু ভাই নাম মনে করতে পারলেন না]

১৯৮০ সালের নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখে আমি সিরাজুদ্দীন সাহেবের কথানুসারে বিসিকের গণসংযোগ বিভাগে নির্বাহী পদে যোগ দিয়েছিলেম। বিসিকে যোগ দেয়ার পরে, নকশাকেন্দ্র প্রধান জনাব এমদাদ হোসেন এবং অন্যান্য নকশাকেন্দ্রে কর্মরত ৮টি বিভাগের শিল্পী-শিক্ষকদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা, ঘনিষ্ঠ হতেই, তার মাঝে পেলাম নকশাকেন্দ্রের প্রধান ফটোগ্রাফার বগুড়ার মুস্তাফিজুর রহমান ও ঢাকার কেরানীগঞ্জের রুহিতপুর গ্রামের মুহম্মদ খসরুকে। যার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল ১৯৭৩ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলে, নাগরিকের ‘বাকী ইতিহাস’ নাটকের শেষে। নকশাকেন্দ্রের প্রধান ফটোগ্রাফার ছিলেন তোতা মিয়া, বগুড়া নিবাসী। হঠাৎ মৃত্যুর পরে তারই সহকর্মী মুস্তাফিজ হয়েছিলেন প্রধান ক্যামেরাম্যান। আর মুহম্মদ খসরু ছিলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি ফটোগ্রাফি সেকশনের।

১৯৮১ সালের শ্রাবণের এক অকাল বর্ষণে তিনি আমার রুমে এসে জানালেন একটি ফোন করবো। ফোনালাপ শেষে তিনি চলে যাওয়ার আগে তার সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে জানিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্রের আদ্যোপান্ত। তবে তিনি যে ধ্রæপদী পত্রিকার পাশাপাশি আরো একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন, নাম বোধহয় ‘চালচিত্র’।

মুহম্মদ খসরু নিঃসঙ্গতার ভেতরেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। বোধকরি তার সৃজনের ভেতরে সৃজিত হয়েছিল শিল্প, শিল্পবোধ। সেই শিল্প আর শিল্পবোধকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন হবার অনেক বছর আগে। বিশেষত তৎকালের পাকিস্তানের ৬০ দশকের গোড়ার দিকে ১৯৬৩ সালে গোটা কয়েক/জনাকয়েক সংস্কৃতি সচেতন ব্যক্তিত্বের সাথে যুক্ত হয়েছিল চলচ্চিত্র আন্দোলনের সুস্থধারা। যে ধারায় ছিলেন আরও অনেকেই, খসরু ছিলেন পুরোধায়।

১৯৭৩-৭৪ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী নতুন ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে মুহম্মদ খসরুর অন্তরঙ্গে ছিল ইংরেজি এবং বাংলার চলচ্চিত্র বিষয়ক গ্রন্থটি যেটি আমি একাধিকবার দেখেছি নকশাকেন্দ্রের ফটোগ্রাফি সেকশনে। তিনি কারো সাথে বিশেষত তার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বাক্যালাপ শুরু করতেন খিস্তি দিয়ে। যেটি অনেকের কাছেই ছিল কষ্টের। তবু তার বন্ধুদের ভেতরে তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন নির্বাহী কবি ফারুক আলমগীর যখন আমার অফিস কক্ষে আসতেন, তিনি এসেই ডাকতেন খসরু ভাইকে। খসরু ভাই এলে প্রথমেই শুরু হতো খিস্তি খেউড়। পরে সুস্থধারার চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনা। পুরো অফিস সময়টাতে দেখতাম তার রুমে গেলে আন্তর্জাতিকমানের শিল্প সাহিত্যের ছায়াছবি সম্পর্কিত বই- এমনকি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সিনে পত্রিকার দুই-একটির বিশেষ সংখ্যা।

বিসিকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন নকশা বিভাগের প্রধান, শিল্পী এমদাদ হোসেন, তাকে ¯েœহজালেই আবদ্ধ করেছিলেন। এমনকি আরো অনেকেই। খসরু ভাইয়ের নিঃসঙ্গতার কথা জেনেছিলেন বেশ কয়েক মাস পরে। তিনি অবসরে গিয়েছিলেন আমার অবসরে যাবার বেশ কয়েক বছর আগেই। তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল শাহবাগের আজিজ মার্কেটের একটি বইয়ের দোকানে। হাতে দেখলাম ইংরেজি এবং বাংলার চলচ্চিত্র বিষয়ক গ্রন্থসমূহ।

গত ১৯/২/১৯ তিনি পৃথিবীর সমস্ত মায়া পেছনে ফেলে রেখে গিয়েছেন এক সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj