মুখস্থ জীবনের বাইরের খসরু ভাই

শুক্রবার, ৩১ মে ২০১৯

জোবাইদা নাসরীনজায়গাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। মুহাম্মদ খসরু শুয়ে আছেন। তাকে ঘিরে অল্প কিছু লোকের জটলা। মাইকে কথা বলছেন কেউ কেউ। জীবন জুয়াড়ি খসরু ভাইর যেন কিছুতেই কিছু যায় আসে না- যেমনটা ছিলেন জীবনকে সঙ্গে নিয়েও। কোনো কিছুরই ধার ধারতেন না। আমার দেখা তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি কোনো ধরনের ক্ষমতার তাপকে জীবনে মাখেননি। বরং উল্টো তিনি বিরমাহীনভাবে সব ক্ষমতাকে গালি দিয়ে ভেংচি কেটেছেন, জীবনকে টেনে ধরেছেন নির্দিষ্ট একটি দিকে, মাখামাখি হতে দেননি মধ্যবৃত্তীয় ‘আহামরি’ কিছু হয়ে ওঠার স্বপ্নে। জীবন খসরু ভাইয়রে প্রতি সুবিচার করেনি- এ কথা আমি বলবো না বরং আমি বলবো খসরু ভাই জীবনকে নিজের স্পর্ধা দিয়ে ঘুরিয়েছেন নানা ঢংয়ে, নানা লয়ে। সে স্পর্ধিত সাহস খুব কম মানুষেরই থাকে, কিন্তু খসরু ভাই জীবনের সেই ভঙ্গি নিজেই তৈরি করেছেন। আমরা জীবনের কাছে কৃতজ্ঞ এই জন্য যে আমাদের প্রজন্ম আহমেদ ছফা, মোহাম্মদ খসরুর মতো সোনার মানুষদের দেখেছিল, কাছে পেয়েছিল।

আমি তখন সবে কলেজে পা দিয়েছে। মফস্বল থেকে ঢাকায় পড়তে আসা আমি বেনুনি দুলিয়ে তখন কেবল সদ্য তারুণ্যে বিস্ময় খুঁজি। সেই বিস্ময়ের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া একজন হলেন মুহাম্মদ খসরু। সেই হিসেবে আমার পনেরো/ষোলো বছর বয়স থেকেই খসরু ভাইকে দেখেছি, আজিজ সুপার মার্কেট। আজিজ তখন কাপড় ব্যবসার তকমা পায়নি। কয়েকটি বইয়ের দোকান আর নানা ধরনের আড্ডাই ছিল মূলত আজিজের জোর। সেই কলেজে পড়া আমি যখন আজিজে উঁকি-ঝুঁকি দিতাম, তখন দেখতাম খানিকটা কুঁজো হয়ে থাকা একজন মানুষকে ঘিরে জটলা। সাথে সব সময় থাকতে একটা ঝোলা, আর হাতে বই কিংবা ম্যাগাজিন। সবই চলচ্চিত্র বিষয়ক। দূর থেকে দেখে মনে হতে তার ঝোলার মতো জাদু আছে। আমার দেখা তিনিই ছিলেন হ্যামিলয়নের বংশীবাদক। ঐ যারা তাকে ঘিরে থাকতো তারাও তখন অল্প বয়সী। আস্তে আস্তে আমি জটলার দিকে এগিয়ে যাই। পরিচিত হই ক্ষেপাটে, মেজাজী আর বাহ্যিক খিস্তি খেউড় সর্বস্ব এ এক সোনার মানুষের সাথে। আমি চলচ্চিত্রের মানুষ না, তবুও খসরু ভাই স্নেহ করতেন। যারা তার খিস্তি খেউড় উপড়ে ফেলে, তারা কাছাকাছি গিয়েছেন, তারা পেয়েছেন তার পরিমাপহীন স্নেহ, ভালোবাসা।

আজ খসরু ভাই নেই। খসরু ভাইয়ের ‘নেই’ হয়ে যাওয়ার খবরটি অল্প কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এর কারণ হয়তো এই প্রজন্মর অনেকেই মোহাম্মদ খসরুকে চিনে না। খসরু ভাই প্রতিদিন টিভিতে দেখা সেলব্রেটি নন। তিনি মুখস্ত কোনো অবয়ব হতে চাননি। খসরু ভাইদের মিডিয়ায় দেখে নয়, জেনে নিতে হয়, চিনে নিতে হয়। মুহাম্মদ খসরু মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দিয়ে কখনো নিজেকে চেনাতে চেষ্টা করেননি। তিনি অন্যের মুখে আলো ফেলেছেন, কিন্তু নিজের মুখের পড়া আলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন অত্যন্ত সুচিন্তিত সিদ্ধান্তেই। এই বিষয়ে তার নিজের সঙ্গে বোঝাপড়াটা করে ফেলেছেন বহু আগেই।

তিনি আলাদা। আলাদা মেজাজে, ক্ষ্যাপা স্বভাবে। তিনি সমাজের কাছে ‘অরুচিশীল’ খিস্তি-খেউর করা লোক। আমাদের ‘ম্যাড়ম্যাড়ে’ পুরাটাই ফাঁপা মধ্যবৃত্তীয় আরোপিত রুচিবোধে তিনি ‘বেমানান’। তাই অনেকেই তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইতো না কিংবা পারতো না। কিন্তু সমাজের চোখ বেমানান খিস্তি- খেউড় সর্বস্ব খসরু ভাই-ই অন্যের রুচিবোধ তৈরিতে রেখেছেন সবচেয়ে বড় অবদান। তিনি খিস্তি খেউড় করতেন, কারণ সেটি করার তার শিনা টান টান করা সাহস ছিল। কারণ তিনি কারো তিনি পদ, পদবি কিংবা খ্যাতির জন্য মাতাল হননি। অর্থ, বিত্ত, সামাজিক অবস্থানের জন্য কোনো ছড়ি ঘোরাননি। কাপড়-চোপড় বেশ-ভুষায় কখনো অভিজাত ভাব আনার চেষ্টা করেননি। তিনি জানতেন যারা সত্যিকারের চলচ্চিত্রের মানুষ তারা তাকে খুঁজে নিবেন। হ্যাঁ, মোহাম্মদ খসরু এ দেশে সেই মানুষ যার হাতেই তৈরি হয়েছেন এ দেশের আনেক খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার। তারেক মাসুদ একবার বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই খসরু ভাইয়ের পকেট থেকে বের হয়েছি।’ মনে পড়ে ২০১১ সালে তারেক মাসুদের স্মরণসভায় এক চলচ্চিত্রকার বলেছিলেন যে খসরু ভাই তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হাত ধরে নিয়ে যেতেন চলচিত্র দেখাতে। জার্মান কালচারাল সেন্টারে শুধু তাঁদের নিয়ে ক্ষান্ত হতেন না, দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁদের পাহারা দিতেন, যেন তারা সিনেমা শেষ হওয়ার আগে বের না হতে পারে। এই রকম করেই খসরু ভাই বড় করেছেন আজকের খ্যাতিমান চলচ্চত্র নির্মাতা অনেককেই।

খসরু ভাই নেই আজ। কুঁজো হয়ে, কাঁধে কাপড়ের ঝোলাটি নিয়ে আর কখনো আসবেন না আজিজ সুপার মার্কটে। তবে অনেকদিন ধরেই তিনি আজিজেও অনিয়মিত ছিলেন। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। নিজের মতো করে জীবন হাঁকিয়ে ছিলেন কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরে। একমাত্র চলচ্চিত্র ছাড়া কোনো জিনিস তাকে যে আকর্ষণ করেনি তা ২০০৮-এ তার রোহিতপুরের বাড়িতে গিয়েই বুঝেছিলাম। এক শীতের বিকেল আমরা হাজির হয়েছিলাম তার বাড়ি। আর সেখানে গিয়েই আবিষ্কার করেছিলাম খসরু ভাইয়ের যক্ষের ধনের মতো লালন করা গুপ্তধনের। এই গুপ্তধনের খবর তিনি কাউকে দিতেন না। দুদিন তার বাড়িতে থাকার সময়ে দেখেছিলাম তার সেই গুপ্তধন, হাজার হাজার বই। উনি আলমারি খুলছেন, আর আমি চোখ মেলে দেখছি, বই আর বই। এ যেন বইয়ের জাদুঘর। যেমন আছে অনেক দামি বই, তেমনি আছে বিভিন্ন সময়ের চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা। কোনটা নিউজপ্রিন্টের, কোনটি আবার অফসেট পেপারে ছাপানো। জীবনযাপনে এলোমেলো, বেহিসেবী এবং আপাদমস্তক বোহিমিয়ান খসরু ভাইকে আমি আবিষ্কার করেছিলাম বইয়ের বিষয়ে মারাত্মক হিসেবী, অত্যন্ত গোছালো এবং অতিরিক্ত যতœবান। বইগুলোকে তিনি এমনি করে আগলে রেখেছিলেন যে বইগুলো সবই ঝকঝকে, উজ্জ্বল, সেখানে কোনো ময়লা পড়তে দেননি। অনেক পরে শুনেছিলাম তিনি তার কিছু বই ফিল্ম আর্কাইভকে দান করেছেন।

সেবার খসরু ভাইয়ের বাড়ি থেকে ফেরার কিছুদিন পর তিনি অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। ফোন করেছিলেন হাসপাতাল থেকেই। ফোন পেয়ে আমরা গেলাম হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে দেখি, তিনি খুব অসুস্থই, তবু তিনি হাসছেন, স্বভাবসুলভভাবে খিস্তি খেউড় করেই যাচ্ছেন।

১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’-এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে খসরু ভাই অন্যতম। ১৯৬৮ সাল থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা ‘ধ্রæপদি’ সম্পাদনা করা শুরু করেন যার সর্বশেষ সংকলনটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। খসরু ভাই বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ ও জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়াও তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৭৫ সালে তৈরি হওয়া ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার পালঙ্ক ছবিটিতে খসরু ভারতীয় চলচ্চিত্রকার শ্রী রাজেন তরফদারের সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ শুরু করার পেছেনেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। এ ছাড়া তিনি ১৯৭০-এর দশকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তার ‘ধ্রæপদি’ পত্রিকাতে প্রকাশ করেন যা সে সময় বেশ সাড়া ফেলেছিল। পরে উপমহাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় এই সাক্ষাৎকারটির পুনর্মুদ্রণ হয়েছিল।

অনেকেই বলছেন খসরু ভাই শিল্পী ছিলেন না। কারণ তিনি কোনো ছবি নির্মাণ করেননি। খসরু ভাই আপাদমস্তক ছিলেন চলচ্চিত্র সংগঠক। উনি ছবি বানানোর জন্য দুইবার আবেদন করেছিলেন সরকারি অনুদানের, কিন্তু পাননি। যারা খসরু ভাইকে চেনেন তারা ভালোভাবেই জানেন খসরু ভাই অনুদান বা ছবি বানানোর টাকার জন্য, ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা সরকারের কাছে ধরনা দেয়া মানুষ নয়। তার নৈতিক মেরুদণ্ড অত্যন্ত শক্ত ছিল। ভালোবাসার মানুষদের ছাড়া তাই তিনি খুব একটা কাউকে পরোয়া করতেন না। তিনি চলচ্চিত্রকে ভালোবেসেছেন, বেঁচে ছিলেন এই চলচ্চিত্রের জন্যই।

মোহাম্মদ খসরু, আমার স্বপ্ন মানুষ, এক দাপুটে চরিত্র। খ্যাতি, অর্থ, বিত্ত বৈভব, জীবনের ঝলকানি, রাষ্ট্রীয় পদক, পদ, কোনো কিছুরই দ্বারস্থ তিনি হননি। অমরত্বের লোভ তাকে কখনো ছোঁয়নি। এতসব বাদ দিই, কোনোদিন প্রত্রিকায় তাকে নিয়ে কোনো ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হোক তাও তিনি চাননি। পত্রিকায় প্রকাশের জন্য কাউকে সম্ভবত সাক্ষাৎকারও দেননি। বরং অসম্ভব এক নিজস্ব জীবন দেমাগে সব চুরমার করে নিজের মতো করে জীবনকে বেছে নিয়েছেন। নিজের মতো করে জীবনকে ভালোবাসার এই তুমুল স্পর্ধার জন্য আমি বরাবরই খসরু ভাইকে যেমন ভালোবাসতাম, তেমনি ঈর্ষা করতাম খসরু ভাইকে, ভীষণভাবে। আশপাশের সব মুখস্থ জীবনের ভিড়ে খসরু ভাই ছিলেন, দেখিয়েছিলেন জীবনের বাইরেও জীবন থাকে, সে জীবনকে চিনতে হয়, জানতে হয়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj