অনুভব

শুক্রবার, ৩১ মে ২০১৯

রেজাউল করিম খোকন

অনেকদিন পর নিজের দুই সন্তান অপু-দীপুকে দেখার পর ওদের কাছে পেতে নাজিয়ার মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। এত কাছে রয়েছে ওরা। কিন্তু মা হয়েও তাদের কাছে যেতে পারছে না, ওরাও মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে তৃষ্ণার্ত চোখে। মাকে কাছে পেতে উন্মুখ হয়ে থাকলেও অপু ও দীপু আদালতের এজলাসের সামনের বেঞ্চে আরেক পাশে ওদের মুনমুন ফুপুর সঙ্গে বসে আছে। মুনমুন তার দুই কিশোর বয়সী ভাইয়ের ছেলেকে দুই হাতে দুপাশে শক্ত করে ধরে বসে আছে। ছেলে দুটি আদালতে এসে অনেক দিন পর মাকে দেখে অস্থির হয়েছে। মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য বারবার বায়না ধরছে ফুপুর কাছে। মুনমুনও নাছোড়বান্দা। কোনোভাবেই বড় ভাইয়ের ছেলে দুটিকে তাদের মায়ের কাছে যেতে দেবে না।

নাজিয়ার বুক ফেটে কান্না আসছে। নিজের আদরের ধন সন্তান দুটিকে এত কাছে দেখতে পেলেও ওদের বুকে টেনে নিয়ে আদর করতে পারছে না। কোলে নিয়ে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিতে পারছে না। আদালতের এক সিদ্ধান্তে অপু ও দীপুকে এখন ওদের বাবার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। এক বছর আগে রাকিবের সঙ্গে নাজিয়ার ডিভোর্স হয়েছে। বউকে ডিভোর্স দেয়ার এক সপ্তাহ আগে দুই ছেলেকে বরিশাল শহরে নিজেদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল রাকিব। সন্তানদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে বিন্দুমাত্র দাম দেয়নি সে। নিজের জেদটাই এ ক্ষেত্রে তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। পুরুষ মানুষ হিসেবে ক্ষমতা এবং দাপট দেখানোটা মুখ্য ব্যাপার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এক বছর আগে ছেলে দুটি ঢাকার শহরের ভালো একটি স্কুলে পড়তো। কিন্ত বরিশাল দাদা বাড়িতে যাওয়ার পর সেখানকার স্কুলেও তাদের ভর্তি করানো হয়নি।

প্রিয় সন্তান দুটিকে হারিয়ে একদম ভেঙে পড়েছিল নাজিয়া। এই সমাজে স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর সাধারণত তালাক পাওয়া মেয়েদের অনেকটা বেকায়দায় থাকতে হয়। নিজের পরিবারের লোকজনদের নানা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়, অনেক ধরনের খোটা শুনতে হয়। আপন সন্তান দুটিকে নিজের কাছে রাখার অধিকার তারও থাকতে পারে- এটা জোর গলায় বলার মতো অনুক‚ল পরিবেশ থাকে না। বিয়ে বিচ্ছেদের জন্য যেন সেই দায়ী এককভাবে- এমন ভাব দেখায় সবাই।

কতভাবে যে নাজিয়া চেষ্টা করেছে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু পারেনি। নানাজনের শরণাপন্ন হয়েছে। পরিবারের মুরব্বিদের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে আকুতি জানিয়েছে। যে কোনোভাবে যদি অপু-দীপুর সঙ্গে দেখা করতে পারতো, কিছুটা সময় ধরে ছেলে দুটিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রাখতে পারতো, তাহলে মনটা জুড়িয়ে যেত। চাকরি-বাকরি করেও ফাঁকে ফাঁকে সন্তানদের কাছে পেতে চেষ্টা চালিয়ে গেছে নাজিয়া। সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আদালতের শরণাপন্ন হয় সে। দুই কিশোর সন্তানকে নিজের হেফাজতে দেয়ার নির্দেশনা চেয়ে আদালতে আবেদন করে। সন্তানদের নিজের হেফাজতে নেয়ার জন্য নাজিয়ার তৎপরতা রাকিবকে আরো ক্ষেপিয়ে তুলেছে। নিজের জেদ বজায় রাখতে বড় উকিল লাগিয়ে আদালতের রায় নিজের পক্ষে আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সে। নাজিয়া একদিন গভীরভাবে ভালোবেসে যে মানুষটি একান্ত আপন করে নিয়েছিল, পরম বিশ্বাসে যাকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, আজীবন একসঙ্গে থাকার শপথ করেছিল সেই মানুষটি এভাবে তার প্রতিপক্ষ হয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াবে, ভাবেনি নাজিয়া।

মফস্বল থেকে ঢাকায় পড়তে আসা নাজিয়া ক্লাসের ফাঁকে একটি কোচিং সেন্টারে ইংরেজি পড়াতো। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রীটির সঙ্গে একই কোচিং সেন্টারের অঙ্কের শিক্ষক রাকিবের কথাবার্তা হতো। রাকিব পড়তো ঢাকা ভার্সিটিতে। আর নাজিয়া ছিল ইডেন কলেজের ছাত্রী। কোচিং সেন্টারে কোনো কোনো দিন পর পর তাদের ক্লাস নিতে হতো। দেখা হলে টুকটাক কথাবার্তা হতো দুজনের। এভাবে পরস্পরকে ভালো লেগে যায় তাদের। সেই ভালোলাগা এক সময় ভালোবাসায় রূপ নেয়।

রাকিব ভার্সিটি থেকে পাস করে বেরোতেই ব্যাংকে চাকরি পেয়ে যায়। তাদের ভালোবাসার ব্যাপারটা দুপক্ষেরই পরিবারের অজানা থাকে না। উভয় পক্ষই মেনে নেয় রাকিব-নাজিয়ার পরস্পরকে ভালোবাসার বিষয়টি। মাস্টার্স পাসের আগেই দুই পরিবারের সম্মতিতে নাজিয়াকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। বিয়ের পর মোহাম্মদপুরে দুই রুমের ফ্ল্যাটে নতুন জীবন শুরু করে রাকিব-নাজিয়া দম্পতি।

দাম্পত্য জীবনের শুরুটা বেশ ভালোভাবে কাটলেও পাঁচ-ছয় বছর সময় পেরোতেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কে নানা টানাপড়েন শুরু হয়। নাজিয়া রাকিবের বেশ কিছু ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। বিশেষ করে তার নিজের পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতা নাজিয়া সহজভাবে মেনে নিতে পারছিল না। রাকিব তার গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের জন্য টাকা-পয়সা পাঠাতে গেলে নাজিয়া আকার ইঙ্গিতে বাধা দিতে শুরু করে। এ নিয়ে শুরু হয় মতবিরোধ, ঝগড়াঝাটি। রাকিবের যে কোনো বিষয় নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলাটা নাজিয়ার বাতিক হয়ে দাঁড়ায় এক সময়। রাকিবও কম যায় না। নাজিয়ার নতুন স্কুলের চাকরি নেয়ার পর সেখানকার পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে তার সহজ-সরল নিষ্পাপ অন্তরঙ্গ সম্পর্কটা ভিন্ন চোখে দেখতে থাকে রাকিব। এ নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতেও ছাড়ে না সে। নাজিয়া তার চরিত্র নিয়ে স্বামীর কুৎসা রটানোর ব্যাপারটাতে অসুস্থ বিকৃত চিন্তার প্রকাশ হিসেবে তাকে ‘ছোটলোক,’ ‘থার্ডক্লাস পার্সোনালিটি’ ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করতে থাকে। দিনে দিনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্ব›দ্ব শুধুই বাড়তে থাকে। দুজনের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল সৃষ্টি হয়। একই ছাদের নিচে বসবাস করলেও দুই ভুবনের দুই বাসিন্দায় পরিণত হয় রাকিব ও নাজিয়া।

তাদের মধ্যকার বিভেদ, দ্ব›দ্ব, সন্দেহ, সংশয় ঘুচাতে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে কেউ চেষ্টা করলেও আরেকটি পক্ষ উঠেপড়ে লাগে বিভেদ, দ্ব›দ্ব আর সন্দেহটাকে উস্কে দিতে। রাকিবের কাছে নাজিয়া সম্পর্কে উল্টাপাল্টা নানা কথা লাগিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলে। যে নাজিয়াকে কয়েক বছর ঘনিষ্ঠভাবে জানার পর তার সঙ্গে কয়েক বছর প্রেমের সফল পরিণতি হিসেবে বিয়ে করে জীবনসঙ্গী করেছিল তাকেই এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ একজন নারী হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে রাকিব। নাজিয়ার প্রতি রাকিবের মনে ঘৃণার পাহাড় জমতে থাকে।

নাজিয়াও রাকিবের আচরণে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হতে এক সময় তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অনেকটা জেদের বশে রাকিব যে বিষয়গুলো নিয়ে মিথ্যে সন্দেহ করতো, উল্টাপাল্টা আজেবাজে ইঙ্গিত করে মন্তব্য করতো সেগুলো আরো বেশি করতে শুরু করলো। রাকিবকে দেখিয়ে তাকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে একসঙ্গে পাশাপাশি রিকশায় বসে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। বাবা-মায়ের নিত্য ঝগড়াঝাটির কারণে তাদের দুই সন্তান অপু-দীপু তাদের আদর-যতœ স্নেহ ভালোবাসা বঞ্চিত হতে থাকলো। বাবা-মায়ের খিটমিটে আচরণের কারণে ছেলে দুটি তাদের কাছে যেতে ভয় পেতে লাগলো। সুখের সংসারে অশান্তি, অস্বস্তির দাবানল ছড়িয়ে পড়তে থাকে ক্রমেই। সেই দাবানলের আগুলে জ¦লে পড়ে অঙ্গার হতে থাকে কয়েকটি হৃদয়।

সব মিলিয়ে অবস্থা চরমে পৌঁছে যায় এক সময়। বিভেদ, দ্ব›দ্ব, সন্দেহ, সংশয়, বিরোধ জিইয়ে রেখে এক ছাদের নিচে একসঙ্গে থাকাটা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাকিব ও নাজিয়া দুজন পরস্পরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছেদ ঘটে যায়।

নাজিয়ার আবেদনের পর প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রাকিবকে তাই দুই সন্তান নিয়ে হাইকোর্টে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে দুই সন্তানকে কেন তাদের মায়ের হেফাজতে দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে।

আদালতের নির্দেশ মেনে রাকিব তার দুই ছেলে অপু-দীপুকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছে আজ। শুধুমাত্র তারাই নয় উভয় পক্ষের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের কয়েকজনও এসেছেন আদালতে। সবার উপস্থিতি পরিবেশটাকে আরো নাটকীয় এবং আবেগময় করে তুলেছে। সবার চেহারায় উদ্বেগ এবং বিষণœতার ছায়া পড়েছে। সবাইকে দেখে বোঝা যায়, তারা কেউই আজকের এই নাটকীয় অবস্থা মনেপ্রাণে চাইছেন না। নাজিয়ার পক্ষের উকিল সাইফুর রহমান শহরের নামকরা আইনজীবী। হাইকোর্টের মামলা লড়ার ক্ষেত্রে তার বেশ নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে। বয়স খুব বেশি না হলেও একজন মেধাবী ডাকসাইটে আইনজীবী হিসেবে এডভোকেট সাইফুরের বেশ চাহিদা। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নাজিয়া তাকে তার পক্ষে আইনি লড়াইয়ে নামতে রাজি করিয়েছে।

শুনানির শুরুতে বক্তৃতার ভঙ্গিতে সাইফুর বলতে থাকেন, ‘মাই লর্ড, বিবাহ বিচ্ছেদ এখন আমাদের সমাজে মহামারির পর্যায়ে চলে গেছে, ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। বিবাহবিচ্ছেদ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে আগে দেখা যেত দাম্পত্য জীবনে পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক চাপে অনেকেই মেনে নিতেন অনেক কিছু। সেই সময় পাল্টেছে। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, প্রেমের সম্পর্ক থেকে হোক কিংবা সম্বন্ধ করে বিয়ে হওয়ার অল্প কিছুদিন পরই বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন স্বামী-স্ত্রী দুজনে। কেন এই প্রবণতা জানার চেষ্টা করতে হবে আমাদের সবাইকে….।

তার বক্তব্য শেষ হতেই রাকিবের পক্ষের আইনজীবী রনেন চৌধুরী এজলাসের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করেন, ‘আমার বন্ধু প্রতিপক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে আমি এ বিষয়ে একমত হয়ে বলতে চাই, তালাকের ক্ষেত্রে বর্তমানে চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন এসেছে। আগে একটা সময়ে ‘পাছে লোকে কিছু বলে’র ভয়ে দম্পতিরা একজন আরেকজনকে না চাইলেও বা নানা যাতনা সহ্য করেও দীর্ঘদিন এক ছাদের নিচে বসবাস করতেন। মেয়ের পক্ষও চাইতো না স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি ফিরে আসুক তাদের মেয়েটি। এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। যে কারণে বিয়ের পর কিছুদিন না পেরোতেই অনেক স্বামী-স্ত্রী তালাকের চূড়ান্ত ডিসিশান নিচ্ছেন। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে বিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। সেই মূল্যবোধ ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয়টি এখন অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেকে নির্যাতন বা দ্ব›দ্বকে টিকিয়ে রাখতে চাইছে না বলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এতে সন্তান থাকলে তাদের জন্য এবং ওই পুরুষ ও নারী দুজনের জন্যও ভালো হচ্ছে। কারণ জীবন তো একটাই। এটা নিয়ে তো ছিনিমিনি খেলা যায় না। আমরা প্রত্যেকেই নিজের জীবনকে অনেক ভালোবাসি। এটাকে সুন্দর এবং স্বস্তিকর রাখতে চাই। কেউ অশান্তি, অস্বস্তি পুষে রাখতে চাই না। এসব জীবনটাকে নারকীয় করে তোলে। আমরা মুক্তি চাই এসব থেকে।

দুপক্ষের আইনজীবীর যুক্তি-পাল্টা যুক্তি চলার এক পর্যায়ে নাজিয়ার উকিল সাইফুর বলেন, ‘আমার মক্কেল নাজিয়া সুলতানা শহরের একটি নামি-দামি স্কুলের শিক্ষক। সমাজে তার একটি সম্মানজনক অবস্থানও রয়েছে। সে একজন মাও বটে। তিনি তার দুই সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন আছেন আজ প্রায় এক বছর ধরে। একজন মা হিসেবে তিনিও তার আদরের দুই সন্তানকে কাছে পেতে চান, বুকে জড়িয়ে আদর করতে চান। আজ অনেকদিন পর দুই সন্তানকে সামনাসামনি দেখে মায়ের মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। তাদের নিজের কাছে কিছু সময়ের জন্য পেতে আকুল হয়ে উঠেছেন তিনি। আমার মক্কেল নাজিয়া সুলতানা তার দুই সন্তানের সঙ্গে অন্তত ১০ মিনিটের জন্য কথা বলার সুযোগ চান। মাই লর্ড, যদি আপনি এ ব্যাপারে একটু অনুমতি দেন। বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার জন্য আবেদন করছি।’

বিচারক অনুমতি দিতেই নাজিয়ার কাছে ছুটে আসে তার দুই সন্তান অপু ও দীপু। নিজের দুই ছেলেকে অনেকদিন পর একান্তে নিজের কাছে ফিরে পেতেই আবেগের বাঁধ ভেঙে যায়। প্রিয় দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয় স্নেহময়ী এক মা। অপু ও দীপু প্রায় এক বছর পর মাকে কাছে পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।

অপু মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘মা তুমি আমাদের কীভাবে ভুলে গেছো, আমাদের কাছে একবারও ফোন করোনি কেন? ঈদের সময় আমরা দুভাই তোমার ফোনের জন্য কত অপেক্ষা করেছি। তোমার ফোন না পেয়ে আমরা ঈদের দিন কেঁদেছি অনেকক্ষণ ধরে।’

সন্তানের অভিযোগ শুনে নাজিয়া কাঁদতে কাঁদতে জবাব দেয়, ‘লক্ষী সোনা বাবা আমার, আমি তোমাদের ফোন করেছিলাম। তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমাদের মুনমুন ফুপি কথা বলতে দেয়নি। আমাকে ধমক দিয়ে ফোন রেখে দিয়েছে। তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে না পেরে আমিও অনেক কেঁদেছি সেদিন- ’ বলতে বলতে তার গলাটা ধরে আসে।

সিনেমা-নাটকে আদালতে বিভিন্ন নাটকীয় দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত সবাই। তবে আজ বাস্তবে চোখের সামনে আদালতে তেমন দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। প্রত্যেকের হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়। যুক্তি-পাল্টা যুক্তির পালা চলে যে আদালতে, সেখানে তৈরি হয় আবেগঘন এক পরিবেশ। এ ধরনের আবেগময় পরিস্থিতি এখানে সৃষ্টি হবে কেউ কল্পনা করতে পারেনি।

অপু-দীপু দুভাই দুদিক থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে তাদের বাবা রাকিবকে কাছে আসার জন্য ডাকতে থাকে। এমন ঘটনা উপস্থিত দুপক্ষের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের বিচলিত করে তোলে। এ অবস্থায় রাকিব কী করবে, ভেবে ক‚ল পায় না। ওদিকে তার ছোটবোন মুনমুন অবাক বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সিদ্ধান্তহীনতার দোলচালে দুলতে থাকা রাকিব পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এটা দেখে এজলাসে নিজের আসনে বসা বিচারক তাকে সন্তানদের কাছে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়ে বলেন, মিস্টার রাকিব ‘আপনাকে বলছি, আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না, ওদের কাছে যান। নিজের নিষ্পাপ সন্তানদের আর কষ্ট দেবেন না।’

রাকিব তাদের কাছে যাওয়ার পর অপু-দীপু বলতে থাকে, ‘আব্বু, তুমি আম্মুকে সরি বলো, প্লিজ, স্যরি বলো।’ ওরা নাজিয়াকেও বলে, ‘আম্মু তুমিও আব্বুকে স্যরি বলো। আমরা এখন থেকে আর আলাদা থাকতে চাই না। আমরা সবাই একসঙ্গে থাকতে চাই। আব্বু-আম্মু তোমরা আর রাগ করে দূরে সরে থেকো না। আমরা অনেক কষ্ট পাচ্ছি। প্লিজ, আমাদের আর কষ্ট দিও না।’

বিচারক অপু-দীপু দুভাইকে এজলাসের কাছে ডেকে আনেন। তারপর তিনি বলেন, ‘তোমরা কী চাও, এখন আমাকে বলো তো বাবা’।

বড় ভাই অপু কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমরা আব্বু ও আম্মুকে একসঙ্গে দেখতে চাই। একজনকে বাদ দিয়ে নয়, আমরা একসঙ্গে দুজনকেই চাই। একই বাসায় থাকতে চাই সবাই মিলে।’

তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ছোট ভাই দীপুও বলতে থাকে, ‘আমরা আম্মুকে ছাড়া আর থাকতে পারছি না, আমাদের মতো বয়সে আপনারা কি পারতেন আপনাদের আম্মুকে ছেড়ে দূরে থাকতে?

দুই কিশোরের আকুতি বিচারকের হৃদয়েও ঝড় তোলে। নিজেকে আর শক্ত পেশাগত অবস্থানে ধরে রাখতে পারেন না। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে মানবিকরূপে আবির্ভূত হন। তিনি অপু-দীপুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের কথা আরো জোরে জোরে বলো। তোমরা তোমাদের আব্বু-আম্মুকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে থাকতে চাও- এটা সবাইকে জানাও, যা দেখে তোমাদের আব্বু-আম্মুর শিক্ষা হোক, তোমাদের কান্না কি তাদের মনে একটুও দোলা দিচ্ছে না- আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি তাদের কঠিন মনের প্রকাশ দেখে। বিচারক নাজিয়া এবং রাকিবকেও ডাকেন তার কাছে। বাবা-মাকে একসঙ্গে আবার কাছে পেয়ে অপু-দীপু বলতে থাকে, ‘আব্বু-আম্মু তোমরা একজন আরেকজনের হাত ধরো, প্লিজ ধরো।’ বলতে বলতে তারা তাদের বাবা-মায়ের হাত টেনে এনে ধরিয়ে দেয়।

‘তোমরা কেন আলাদা হয়ে গেলে? সব ছেলে-মেয়ে তাদের আব্বু-আম্মুকে সাথে নিয়ে এক সাথে থাকে। ওরা কত আনন্দ করে, আমরা কেন ওদের মতো থাকতে পারি না? বলো না আব্বু, বলোনা আম্মু-’ ছোট্ট দীপু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে।

আদালত জুড়ে তখন অদ্ভুুত নীরবতা নেমে এসেছে। কেউ কিছু বলতে পারছে না। বাবা-মাকে একসঙ্গে থাকার আকুতি জানিয়ে দুই কিশোর সন্তানের আর্তনাদ, কান্না উপস্থিত সবার হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

আদালতের নীরবতা ভেঙে বিচারক সামনে দাঁড়ানো রাকিব ও নাজিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনাদের দুই সন্তানের আকুতিভরা আর্তনাদ শুনেও কি আপনাদের নিজেদের মন গলে না? পাথরের মতো কঠিন হয়ে থাকে? সন্তানের জন্য কী নিজেদের জেদ, একগুঁয়েমিভাব, স্বার্থপরতা এসব ত্যাগ করতে পারেন না? আপন সন্তানের চেয়ে আপনাদের কাছে ইগোটাই বড় হয়ে গেল? দেখুন, এই আদালতে যারা এসেছেন, এখানে উপস্থিত আছেন যারা তাদের সবার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। এই দুই শিশুর কান্না এখানকার সবার হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। এখন আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কী করবেন?’

এভাবে আরো বেশ কিছুটা সময় নিঃশব্দে কেটে যায়।

এক সময় নীরবতা ভেঙে রাকিব বলে, ‘মহামান্য আদালত, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি, অনেক অন্যায় করে ফেলেছি আমরা। আমাদের সন্তান দুটি একটি বছর ধরে অনেক কষ্ট ভোগ করছে ওদের মাকে ছাড়া। আমি আর কষ্ট দেবো না ওদের। নিজের জেদ এবং ইগো বজায় রাখতে গিয়ে আমরা দুজনই অনেক ভুল করে ফেলেছি। আমরা আসলে নিজের জেদ বজায় রাখতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এখন আমরা সেই ভুল সংশোধন করতে চাই। আমি আমার স্ত্রী নাজিয়া এবং দুই সন্তান অপু ও দীপুকে নিয়ে আবার নতুন করে আগের মতো জীবন শুরু করতে চাই।’

বলতে বলতে রাকিব নাজিয়ার দুহাত ধরে আবেগময় গলায় বলতে থাকে, ‘প্লিজ নাজিয়া, তুমি আর না বলো না। অনেক হয়েছে। আর না। এবার আমরা অতীতের সব কিছু ভুলে জীবনটাকে সুন্দরভাবে সাজাবো। বলো, তুমি থাকবে তো আমার সাথে? তুমি কিন্তু না বলতে পারবে না। আমাদের দুজনেরই কিছু ভুল, দোষত্রুটি ছিল। আমরা সেগুলো দূর না করে একজন আরেকজনকে দূরে ঠেলে দিয়েছি। যার খেসারত দিচ্ছে আমাদের দুই সন্তান। আমরা আসলে ভুল করে ফেলেছি। চলো, আমরা আবার আগের জীবনে ফিরে যাই।’

রাকিবের আকুতি নাজিয়ার হৃদয়ে মুহূর্তে তোলপাড় সৃষ্টি করে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না সে। ঝর ঝর করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মুখে কিছু বলতে পারে না। রাকিবের হাত দুটি না ছেড়ে নিজের হাতের মধ্যে শক্তভাবে ধরে রাখে। অভূতপূর্ব এক দৃশ্যের অবতারণা হয় আদালতের মধ্যে। উপস্থিত সবাই মুগ্ধ আবিষ্ট হয়ে সেই দৃশ্য দেখতে থাকে।

অপু-দীপু দুভাই তাদের বাবা-মাকে আবার একসঙ্গে ফিরে পাওয়ার আনন্দে তখন আত্মহারা। তাদের দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। বাবা-মা তাদের নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে, নিজেদের ভুল স্বীকার করে আবার একসঙ্গে থাকার অঙ্গীকার করেছে এই আদালতে উপস্থিত সবার সামনে। পৃথিবীতে এমন চমৎকার মুহূর্ত সব সময় আসে না, যখন আসে স্বর্গীয় আবেশ ছড়িয়ে পড়ে সেখানে। এখনও তেমন আবেশ যেন ছড়িয়ে পড়েছে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj