শাহীন রেজা : মেদহীন উচ্চারণ তাঁর কবিতায়

শুক্রবার, ৩১ মে ২০১৯

তারেক মাহমুদ

আমি ব্যক্তিগত ভাবে যে ধরণের কবিতা পাঠ করে আরাম ও স্বস্তি পাই, আশির দশকের আধুনিক কবি শাহীন রেজার কবিতার প্রকাশ তেমনি। মেদহীন উচ্চারণ। অনেকেই কবিতাকে জটিল করে পাঠককে বিড়ম্বনায় ফেলে দেয়ার মধ্যে এক ধরনের অতিপান্ডিত্যের নিস্ফল ব্যর্থ আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে পাঠকের আনুকল্য হারায়। কবিতার সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক অতি প্রেমময়। কিন্তু সেটা যখন দুর্গম হয়ে ওঠে পাঠক তখন সে ধরণের কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। শাহীন রেজার কবিতা পাঠে তার বক্তব্যের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ হয়েই যায়।

‘যে নামেই ডাকি’ কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করে অন্তঃত আমার সেরকম বোধই হয়েছে যে শাহীন রেজা পাঠকের জন্য লেখেন। তার কবিতা বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে স্পর্শ করে যায়। কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘যে নামেই ডাকি’ পাঠকালে মনে হয়েছে এটা ¯্রষ্টা বন্দনার কবিতা ।

‘যে নামেই ডাকি জানি তুমি সাড়া দেবে

হোক তা সে পক্ষির আথবা পুষ্পের

হোক তা সে কোনো বৃক্ষ কিংবা প্রাণীর’

শুরুটা এভাবেই। কিন্তু শেষের দিকে এসে আমরা অন্যরকম স্বাদ পাই। যে স্বাদ প্রেমের। অবশ্যই জাগতিক ব্যক্তিপ্রেমের। এটা আমার ব্যক্তিগত পাঠ উপলব্ধি।

‘যে নামেই ডাকিনা কেন

শালিক তোতা টিয়া মল্লিকা অথবা মালতী

কিংবা ডাহুক ইলিশ অথবা বাঘিনী

জানি তুমি সাড়া দেবে’

ফলে কবিতাটি আবার নতুন করে শুরু থেকে পাঠের আগ্রহ তৈরী হয়।

শাহীন রেজার কবিতায় দারুণ কিছু শব্দের অনুপম গাঁথুনীর বাক্যাবলী রয়েছে। যা পাঠকালে পাঠককে বোধময় কিছু আবেগ এনে দেবে মনে।

‘মেঘেরা যদি হয় মোমের দীঘি

তবে কবিতারা অপ্রতিরোধ্য তুসোর যাদুঘরে’

(ঘুমকার্তিকে)

‘মেহগনি জানতোনা খুব বেশী বড়ো হলে আশংকা থাকে ঝড়ের’

(কোনো এক মেহগনির গল্প)

এই একটি লাইনে আমি বর্তমান সময়ের বিশেষ একটি অবক্ষয়কে দেখতে পাই। আমি মনে করি মেহগনি এক কিশোরী মেয়ে। যে বেড়ে উঠছে মনের খেয়ালে। তার বড়ো হওয়ার যে সামাজিক আশংকা রয়েছে সে ব্যাপারে সে অজ্ঞাত। এই ঝড় তো সেই লোভাতুর সমাজ। যে মেহগনির বড়ো হওয়া দেখে নিজেকে শান দিচ্ছে।

‘সকলেরই ভাষা আছে

পাখি প্রাণী মানুষ পিঁপড়া কিংবা নদী

এমন কি বৃক্ষেরও

শুধু প্রেমের নেই; অযুত সংগমে সৃষ্ট শীৎকার

সে তো কামনার ভাষা; প্রেমিকের নয়’

(দূর দূরগামী)

তাই তো! প্রেমেরতো নির্দিষ্ট কোনো ভাষা নেই। সংজ্ঞা নেই। বৈষম্য নেই। ঝট করে মনে হলো, আসলেইতো প্রেমের ভাষা নেই। তবুও প্রেম কাঙ্খিত। প্রেম আরাধ্য। প্রেমে অর্জন, বর্জন সব আছে। শুধু ভাষা নেই। নির্দিষ্ট কোনো ভাষা নেই।

‘ভালোবাসবে অথচ পতনের স্বাদ নেবেনা এতোটুকু’

(ভালোবাসার জন্য)

একই কবিতায় একবারে শেষ দুটি লাইনে কবি লিখেছেন-

‘ভালোবাসার জন্য ওড়া যতোটা জরুরী

ঠিক ততোটাই নেমে আসা’

ভালোবাসা যে কোনো বৈষম্য মানেনা এটা তারই প্রকাশ। মনে পড়ছে রাজা অষ্টম এ্যাডওয়ার্ড এর কথা। যিনি প্রেমের জন্য রাজ্য ছেড়েছিলেন।

আমার মনে হয়েছে শাহীন রেজা মূলতঃ প্রেমের কবি। তবে ‘চিল’ শব্দটি তার কবিতায় বার বার এসেছে। জীবনানন্দ দাশ এর কবিতায়ও ‘চিল’ এসেছে বার বার। এজন্য আমরা ‘চিল’কে জীবনানন্দ দাশকে দিয়ে দিলাম। আলাদাভাবে অন্য কবিকে আমরা ‘চিল’ দিতে চাইনা। তবে শাহীন রেজা চাইলে শালিক, টিয়া কিংবা তোতা তাকে দিতে চাই। আর ডাহুক যদি বলি তবে তাতো ফররুখ এর সম্পত্তি।

শাহীন রেজার কবিতা সুখপাঠ্য। পাঠে রয়েছে আরাম এবং স্বস্তি। মনে হয় এখানেই কবির স্বার্থকতা। আজ কবির জন্মদিন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj