রোজায় হৃদরোগের

শুক্রবার, ৩১ মে ২০১৯

চিকিৎসা

ডা. লিয়াকত হোসেন তপন

এক অলস দুপুরে অফিসে বসে আছি। বয়স্ক এক আত্মীয়া ফোনে বললেন, ‘তোমার সহায়তায় হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে রেখে ভালোই আছি। রোজায় কীভাবে ওষুধ খাব জানতে চাই।’ আমি তাকে ফোনেই প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলাম। রোজা ইসলামের ৫টি মৌলিক স্তম্ভের একটি যা পালন করা সহজ, অর্থ সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর। ধর্ম এবং বিজ্ঞান একে অপরের বন্ধু। ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই। আজ যা অন্ধ ধর্ম বিশ্বাস, বিজ্ঞান যখন আগামীকাল তা সঠিক বলে প্রমাণ করবে তখন মনে হতে পারে, ‘জীবনের অনেকটা সময় চলে গেল অবিশ্বাসে!’

চিকিৎসাকালীন রোজা রাখা নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা চলছে তবে প্রায় দুই দশক আগে রোজায় চিকিৎসা এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোজা রাখা নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে বিভিন্ন ইসলামী প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক আলোচনার পর ১৯৯৭ সালে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল তা আজো পালনীয়। ওই সম্মেলনের আলোকে নির্ধারিত হয়েছে রোজায় কি কি ওষুধ গ্রহণ করা যাবে/যাবে না এবং কি কি পরীক্ষা করা হলে রোজার পবিত্রতা ক্ষুণœ হবে না।

যেসব ওষুধ বা প্রক্রিয়া রোজার ক্ষতি করে না-

১. হার্টের ব্যথার জন্য জিহ্বার নিচে নাইট্রোগিøসারিন স্প্রে অথবা ট্যাবলেট।

২. ইসিজি, ইকো, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও এক্সরে করা।

৩. হার্টের রোগ নির্ণয়ের জন্য এনজিওগ্রাম করা, রিং স্থাপন এবং চলমান চিত্র গ্রহণ করা।

৪. দরকারি পরীক্ষার জন্য রক্ত দেয়া।

৫. কাউকে রক্ত দান এবং প্রয়োজনে রক্ত গ্রহণ।

৬. অক্সিজেন এবং চেতনানাশক গ্যাস ব্যবহার।

৭. নাক, কান এবং চোখের ড্রপ এবং ¯েপ্র।

৮. চিকিৎসার জন্য ব্যবহার্য ক্রিম, অয়েন্টমেন্ট, প্লাস্টার বা ব্যান্ডেজ।

৯. দাঁত তোলা ও ফিলিং করা।

১০. শরীরের কলা বা টিসু সংগ্রহ করে বায়োপসি করা।

১১. এন্ডোস্কপি করা।

১২. পায়ু ও যৌন পথে টেবলেট বা সাপোজিটরি ব্যবহার।

১৩. যৌন বা পায়ুপথে আঙুল চালিয়ে পরীক্ষা করা।

রোজা রাখা অবস্থায় যা করা যাবে না-

১. শিরাপথে বা অন্য যেকোনো পথে খাদ্য উপাদান গ্রহণ করা যাবে না।

২. শিরা বা যে কোনো পথে গøুকোজ, এমাইনো এসিড বা ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করা যাবে না।

৩. শক্তি প্রদানকারী উপাদান কোনোভাবেই গ্রহণ করা যাবে না।

রোজায় হৃদরোগ :

দৈহিক ও মানসিক সুস্থতায় হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় রোজা রাখা যায়। রোজা রাখা অবস্থায় হৃদরোগ সাধারণত চরম (অপঁঃব) আকার ধারণ করে না। দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকায় রক্তে ভালো কোলেস্টেরল (ঐউখ)-এর পরিমাণ ৩০% থেকে ৪০% বৃদ্ধি পায়, খারাপ কোলেস্টেরল (খউখ) কমে যায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ওজন কমে যায়।

রোজায় উচ্চ রক্তচাপ ও অন্য হৃদরোগীদের ওষুধের মাত্রা ও সময় নির্ধারণ যথাযথ হতে হয়। তাই রমজানের আগেই নির্ধারিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। তবে অতি উচ্চ রক্তচাপ, মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (অগও) কিংবা অসহনীয় এনজাইনা (টহংঃধনষব অহমরহধ) থাকলে রোজা রাখার ব্যাপারে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

রোজায় ডায়াবেটিস :

রোজা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। রোজায় ইনসুলিন ও মুখে খাবার ওষুধের মাত্রা কম হয়ে থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শে এই মাত্রা নির্ণয় করতে হবে। সংযম পালন রক্তে শর্করা কমানোর পাশাপাশি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও রোগ প্রতিরোধ সহায়ক।

শেষ কথা :

এক মাস রোজা পালন দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক উন্নতির সহায়ক। স্বাস্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর জন্য সিয়াম সাধনা বাধ্যতামূলক। রোজা মানুষের দৈনিক কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলায় আনার পাশাপাশি নিষিদ্ধ কর্ম থেকে বিরত রাখে। মনে রাখতে হবে, ধর্ম পালনের জন্য দেহ ও মনের সুস্থতা প্রয়োজন। তীব্র অসুস্থ অবস্থায় রোজা পালন না করে সুস্থ হওয়ার পর তা পালন করা যাবে। প্রয়োজনবোধে চিকিৎসক এবং ইমাম/আলেম সাহেবদের পরামর্শ নিতে হবে।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ

অধ্যক্ষ

শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ

গোপালগঞ্জ।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj