লাঠি খেলা

মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০১৯

লাঠি খেলা একটি ঐতিহ্যগত মার্শাল আর্ট যেটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কিছু জায়গায় চর্চা করা হয়। এক সময় লাঠি খেলা ছিল গ্রামবাংলার অন্যতম বিনোদনের খোরাক। লাঠি খেলা হয়ে উঠেছিল বাংলার ঐতিহ্যের অংশ। এখন কালেভদ্রে লাঠি খেলার আয়োজন হয়ে থাকে। লাঠি খেলা লাঠি দিয়ে আত্মরক্ষা শেখায়। ব্রিটিশ শাসনামলে অবিভক্ত বাংলার জমিদাররা নিজেদের নিরাপত্তার তাগিদে লাঠিয়ালদের নিযুক্ত করত। চরাঞ্চলে জমি দখলের জন্য মানুষ এখনো লাঠি দিয়ে মারামারি করে। মহরম ও পূজাসহ বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানে এই খেলাটি তাদের পরাক্রম ও সাহস প্রদর্শনের জন্য খেলা হয়ে থাকে। এই খেলার জন্য ব্যবহৃত লাঠি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা এবং প্রায়ই তৈলাক্ত হয়। অত্যাশ্চর্য কৌশলের সঙ্গে প্রত্যেক খেলোয়াড় তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে রণকৌশল প্রদর্শন করে। শুধুমাত্র বলিষ্ঠ যুবকরাই এই খেলায় অংশ নিয়ে থাকে। কিন্তু হাল আমলে শিশু থেকে শুরু করে যুবক, বৃদ্ধ সব বয়সের পুরুষরাই লাঠি খেলায় অংশ নিয়ে থাকেন।

লাঠি খেলার আসরে লাঠিয়ালদের নৃত্যাংশ শেষ হলে তারা পরস্পর কিছু সংক্ষিপ্ত ও কৌতুককর সংলাপে অংশ নিয়ে থাকেন। এরপর শুরু হয় লাঠি খেলার মূল পর্ব, যাকে আক্রমণাত্মক লাঠি খেলা বলা হয়ে থাকে। এ পর্বের শুরুতেই লাঠিয়ালরা সমান সদস্যে দুই দলে বিভক্ত হয়ে খেলায় মেতে ওঠেন। এ ক্ষেত্রে বাদ্যের তালে তালে একদল আরেক দলকে লাঠির মাধ্যমে আক্রমণ করতে গিয়ে মুখে বলতে থাকেন- ‘খবরদার’, প্রতিপক্ষের লাঠিয়ালরা একইভাবে সে দলকে প্রতি আক্রমণ করতে গিয়েও বলেন- ‘খবরদার’। এ ধরনের লাঠি খেলার একটি প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে খেলার মাঝে কোনো লাঠিয়ালের গায়ে লাঠির আঘাত লাগলে খেলা তাৎক্ষণিকভাবে থেমে যায়, থেমে যায় বাদ্য বাদন। আসলে, লাঠি খেলায় একপক্ষ তার প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে চাইবে ঠিকই কিন্তু অন্যপক্ষকে তা লাঠি দিয়েই ঠেকাতে হবে। না ঠেকাতে পারলে সে খেলার নিয়ম অনুযায়ী আপনাতেই পরাস্ত হয়ে যাবে। আসলে লাঠি খেলার সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, লাঠি খেলায় দুদল লাঠিয়াল পরস্পরকে কৃত্রিমভাবে আক্রমণ করে থাকেন। প্রতি আক্রমণে নতুন কৌশল প্রয়োগের আগে লাঠিয়ালরা স্বচ্ছন্দে নৃত্য প্রদর্শন করে পুনরায় খেলায় লিপ্ত হন। এ সময় লাঠিয়ালদের আক্রমণ নৃত্যের সঙ্গে নাট্যরস ঘনীভূত করতে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ঢাকঢোল, মৃদঙ্গ-করতাল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। লাঠি খেলার অসাধারণ ইতিহাস আছে কিন্তু এর জনপ্রিয়তা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ঈদ উপলক্ষে সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, নড়াইল প্রভৃতি জেলায় লাঠি খেলার আয়োজন দেখা যায়। লাঠি খেলা নিয়ে বর্তমানে নতুন দল তৈরি হচ্ছে না। তবে যারা লাঠি খেলেন তারা এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে আগ্রহী। যে কারণে তারা প্রশিক্ষণ দেন তাদের সন্তানদের। লাঠি খেলা আমাদের মাঝ থেকে যেন হারিয়ে না যায় সে জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।

:: খেলা প্রতিবেদক

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj