পাগল করা এক ব্যথার দিন

শনিবার, ২৫ মে ২০১৯

জয়দীপ দে

গত মাসে কাঠমান্ডু গিয়েছিলাম। পশুপতিনাথ মন্দিরে যখন ঢুকব, তখন দেখি ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা একটা ছেলেকে বুকসমান উঁচু দুই নারী টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে মন্দিরের ভেতরে। একটা অবোধ্য ভাষায় তারা চিৎকার করছে। পুরো এলাকা গরম হয়ে উঠেছে। আমি বালকসুলভ ঔৎসুক্য নিয়ে তাদের অনুসরণ করলাম। নারীদ্বয় যুবকটিকে পুলিশের ক্যাম্পে দিয়ে এল। এবার যুবকটিকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম। মলিন পোশাক। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। বাম কপালে তাজা একটা কাটার দাগ। নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। যেন নিজের মধ্যে ডুবে আছে। মাঝে মাঝে মুখ তুলে তাকাচ্ছে। দেখলাম চোখে লেগে আছে রাজ্যের নেশা। সে নির্বিকার। যেন পেয়ে গেছে এক অজানা আনন্দের জগতের দেখা। জগতের ছোটখাটো শোক দুঃখ সন্তাপ তাকে স্পর্শ করার নয়। সামনে একটা অনিশ্চিত সময়। মোবাইল চুরির দায়ে জেলে যাবে। কিংবা খাবে কড়া মার। কিন্তু নেশায় বুঁদ ছেলেটার মাথায় এসব নেই। সে উপভোগ করছে তাকে আচ্ছন্ন করে রাখা ঘুমঘুম আবেশ। হয়তো তার চোখে ঝিলমিল করছে কোনো এক স্বপ্নিল জগতের হাতছানি। যার মোহে দুই মহিলার চিৎকার, পুলিশের শাসানি, উৎসুক জনতার দৃষ্টি- কিছুই তার চেতনায় আসছে না।

এরই মধ্যে বারংবার বোরহানের ফোন। একটা লেখা দিতেই হবে। তখনই সেদিনের গল্পটা মনে পড়ল। সেই নেশাগ্রস্ত যুবকটার জায়গায় আমাকে প্রতিস্থাপিত করা যায়। যদি সময়টা হয় ১৯৯৮ সাল। কি এক নেশায় পেয়েছিল আমাকে! পত্রিকার পাতায় লেখা ছাপাবার নেশা। অন্যের লেখা পড়ার নেশা। সেই মানুষটাকে দেখার নেশা। বন্ধু হওয়ার নেশা। নেশার পর নেশা। নেশায় জীবনের সবচেয়ে প্রাণোচ্ছল সময়গুলো কাটিয়েছি। বুঁদ হয়েছিলাম। চারপাশে তাকানোর সময় ছিল না। ক্যারিয়ারের গাড়ি চুপচাপ চলে গেছে পাশ দিয়ে। কোনো বান্ধবী চেয়ে চেয়েও পায়নি আমাকে। হাজার হাজার বন্ধুর মধ্যে হারিয়ে গেছে নিজের সত্তাটা। মহাসমুদ্রের অফুরান জলধারার মতো ধেয়ে আসা ভালোবাসার ঊর্মিমালা ভাসিয়ে রেখেছিল আমাকে।

২.

সপ্তাহের দুটো দিন ছিল রঙ ছড়ানোর। সোম আর মঙ্গল। এ দুদিন বেরুতো ফিচার পাতা। সোমবার মেলা আর মঙ্গলে পাঠক ফোরাম ও ইষ্টিকুটুম। মেলা পুরো চারপৃষ্ঠায় ছাপা হতো। এত রংয়ে ভরপুর কাগজের পাতা এর আগে কখনো দেখিনি। সব কিছুই যেন অন্যরকম। এখন ভেবে হাসি পায়। উপরের দুই পৃষ্ঠা কেবল থাকত দুই রংয়ের। এই দুই রংয়ের একটা সাপ্লিমেন্টারিতে কী এমন রংয়ের বাহাদুরি ছিল- আমার যুবক চোখ দুটোকে অবাক করে দিত! প্রতিটি সংখ্যায় বিচিত্র বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে এখানে কাভার স্টোরি হতো। একবার এক ভদ্রলোক তার মুফতে বিয়ে আকিকা খেয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা লিখলেন। একবার জাফর ইকবাল স্যারের লেখা এল তার কৈশোরের স্মৃতি নিয়ে ‘রঙিন চশমা’। এ ছাড়াও রাসেল ও ’নীল, আবু সুফিয়ান, আব্দুর নুর তুষারদের লেখা গোগ্রাসে পড়তাম। অকালপ্রয়াত সাংবাদিক ওবায়েদুল গণি চন্দনের একটা ধারাবাহিক লেখা আসত। বিভিন্ন রোমহর্ষক অভিযান নিয়ে।

পরের দিন আসত পাঠক ফোরাম। পত্রিকার গল্প পড়ার অভ্যাস তখনো হয়ে ওঠেনি। পাঠকদের দুই তিনশ শব্দের অণুগল্প বা ফিচার ছাপা হতো সে পাতায়। মাসে একবার নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের ওপর পাঠকরা লেখা পাঠাতেন। তাদের মধ্য থেকে দুজনকে পুরস্কৃত করা হতো। সুস্বাদু নাস্তার মতো ছোট ছোট লেখাগুলো দারুণ টানত আমাকে। কত বিচিত্র বিষয় কত বিচিত্র দেখার চোখ। লেখা পড়ে পড়ে কিছু মানুষকে অজান্তে বন্ধু ভাবতে শুরু করলাম। তাদের মনোজগত আমার কাছে স্বচ্ছ সরোবরের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল। মনে হতো এমন মনের মানুষই তো বন্ধু হিসেবে চাই। রানা মেহের, সুমন সুপান্থ, বদরুল, আরিফ জেবতিক, পাপড়ি রহমান, আফরিন, বিন্তি, সুমিমা, জয়নুল টিটু, পার্থ সঞ্জয়, আসমা বীথি… সোনার মোহরের মতো জ্বলজ্বলে একেকটা নাম!

একবার মা সংখ্যায় রানা মেহেরের একটা গল্প ছাপা হয়েছিল। সেটা পড়ার পর খুব ইচ্ছে হয়েছিল ছেলেটাকে একবার দেখে আসি। সুযোগ দিলে বুকে জড়িয়ে ধরি। পরে দেখলাম রানা মেয়ে। কিন্তু সেই গল্পের মুগ্ধতা আজো কাটেনি। সেই জড়িয়ে ধরার বাসনা। সুমন সুপান্ত কিংবা সুমন্ত আসলাম- দুই সুমনের লেখা পড়লে মনটা হু হু করে উঠত। আরিফ জেবতিকের লেখা ছিল শুরুতে কৌতুকরসে ভরপুর, শেষে এসে এমন একটা মোচড় দিত সারা শরীর অবশ হয়ে আসত। সুমিমা কিংবা সিরাজী এরা ছিলেন আমার স্বপ্নজগতের মানুষ।

আমাকে যেন কালো জাদুতে পেয়ে বসল। অন্যের লেখা পড়তে পড়তে অজান্তেই নিজের হাতে কলম উঠে এল। ততদিনে চলতিপত্র নামে একটা সাপ্তাহিক এল বাজারে। সম্ভবত বিভুরঞ্জন সরকারের সম্পাদনায়। সেখানে সুমন্ত আসলাম পাঠকদের জন্য একটা পাতা করতেন। সেখানেও ভোকা পাঠক ফোরামের বন্ধুরা লিখতেন। এই পাতায় প্রতি সপ্তাহে বিষয়ভিত্তিক লেখা ছাপা হতো। পরের সপ্তাহে আগের সপ্তাহে প্রকাশিত লেখার ওপর পাঠকের মন্তব্য মিলত। মনে হলো এই পাতায় ভোকার মতো ভিড় হবে না। এখানে লেখা ছাপার সম্ভাবনা আছে। তাই একটু সাহস নিয়ে একটা লেখা পাঠালাম। বিষয় ছিল আমি বিজয় দেখিনি। আমি আরেক কলম বাড়িয়ে লিখলাম, আমি বিজয় দেখিনি, বিজয়ের ধ্বংসস্ত‚প দেখেছি। লেখা পাঠানোর এক সপ্তাহের মধ্যে লেখাটি ছাপা হলো। নিজের নামটা যে এত সুন্দর এর আগে জানা ছিল না। সুতন্বী এমজে তে ছাপানো ১০ ফন্টের নামটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইলাম। আর পরিতৃপ্তির নিশ্বাস ছাড়লাম। ভাবলাম, সারা দেশ বুঝি আমার মতো অবাক বিস্ময়ে নামটা দেখছে। আমার ক্ষুদ্র চিন্তাটি আর ক্ষুদ্র নেই। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

সেই চলতিপত্রের জোশ নিয়ে পাঠক ফোরামে লেখা পাঠালাম। সেবারের বিষয় ছিল বানভাসী মানুষ। এক লেখায় মাইল পার। প্রথম লেখাই হয়ে গেল সেই সংখ্যার সেরা ফিচার। লেখাটির শিরোনাম ছিল- আমি জাতিস্মর বলছি। যেন স্বর্গের উদ্যান অবারিত হলো এক অন্ত্যজের জন্য। তারপরের কাহিনী আমার মাথায় নেই। কারণ সময়গুলো কেটে গেছে মিগ টুয়েন্টি নাইনের গতিতে। দুই হাতে লিখে গেছি দুটি বছর। কী লিখেছি সে আমার ঈশ্বর জানে।

লেখা ছাপানোর নেশায় পেয়ে বসল। তখন সকাল ১০টা নাগাদ পত্রিকা আসত বাসায়। কিন্তু মঙ্গলবার ভোর হতেই কেন জানি ঘুম টুটে যেত। একটা অস্থিরতা কাজ করত ভেতরে। কখন পত্রিকা আসবে। সে সময় কেন জানি পত্রিকা আসতে খুব অনিয়ম হতো। একবার মনে আছে বিকেল ৪টায় সেদিনের পেপার এসেছিল। আমি জানালার ধারে কাঠ হয়ে বসেছিলাম। এলেই ছো মারব। কাঁপা হাতে পত্রিকাটা নিয়ে এক ঝটকায় ভেতরের পৃষ্ঠায় চলে যেতাম। নিজের কোনো লেখা ছাপা হলে পরমতৃপ্তিতে চেয়ে থাকতাম লেখাটির দিকে। পথে ঘাটে বেরুলেই পরিচিতজনরা প্রশংসা করত। বাহ্বা দিত। ফলে লিখতাম আরো দ্বিগুণ উৎসাহে।

নিজের মধ্যে লেখক লেখক একটা ভাব এসে গেল। পথেঘাটে প্রায়ই মজার ঘটনা ঘটে। বলতে পারেন খ্যাতির বিড়ম্বনা।

কয়েকটা মজার কাহিনী বলি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নাজিরহাটের বাসে করে যাচ্ছি। কাগজপত্র যেন না হারায় সে জন্য খামের ওপর বড় করে নাম আর ঠিকানা লিখে রেখেছিলাম। আমার পাশে এক বড়ভাই বসেছিলেন। তিনি কেন জানি উসখুস করছিলেন। এক সময় হুট করে বলে উঠলেন, আপনি কি জয়দীপ দে শাপলু? একটা প্রশ্ন থেকে জন্ম নিয়েছিল প্রগাঢ় এক সম্পর্কের। এখনো পাভেল ভাইয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। ভাই ওসমানিয়া গøাসে আছেন।

৩.

আমাদের তখনো বেনিয়ার হিসাব বোঝার বয়স হয়ে ওঠেনি। প্রাণের পত্রিকাটি ডুবতে বসেছে। রঙচঙে পত্রিকার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মায়ার কাগজটি। ৮ লিংক রোডে এসে আমাদের ক্ষোভ ঝারতাম। পত্রিকা কেন রঙিন হয় না। বাড়ছে না কেন পাতা। সবাই পারলে আমরা কেন পারি না। কাজী তাপস, রহমান মুস্তাফিজরা মুখ কালো করে বসে থাকেন। কলি আপু মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে সব লুকোতে চাইতেন। এ অবস্থায় ফিচার বিভাগের প্রাণ সঞ্জীব চৌধুরী একদিন ভোরের কাগজ ছেড়ে যান।

এরপর সেই মাস্তুল ভাঙা জাহাজে একজন মাত্র ধীমান নাবিক ছিলেন। আমাদের প্রিয় বেনজির ভাই। আমরা যতই তুচ্ছ হই না কেন, আমাদের অবদান হিসাবের খাতায় নাই বা উঠুক- উনি পরম মমতায় আমাদের কথা শুনতেন। অকৃতদার সেই মানুষটিও একদিন ভোরের কাগজ ছেড়ে চলে যান। আমরা মুখ ফেরাই অভিমানে। সেনাপতির প্রতি অভিমান। যে কিনা কিছু না বলেই ময়দান ছেড়ে চলে গেছে যুদ্ধ নিশান গুটিয়ে। তখন বুঝলাম, স্বপ্ন মূলত ভঙ্গুর। বোকাদের হাতে তাই এটা থাকা ঠিক নয়। শোকেসে স্বপ্ন রেখে ফিরে এলাম জীবনের প্যাভিলিয়নে।

৪.

পকেটে পয়সা ছিল না, হেঁটে চেরাগী পাহাড় গিয়েছি পাহাড়তলী থেকে, পাঠক ফোরামের কোনো এক অনুষ্ঠানের জোগাড় যন্ত্র করতে; টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কুরিয়ার করেছি ৮ লিংক রোড, বাংলামোটর, ঢাকার ঠিকানায়; চার তলায় এক চক্কর ঘুরবার লোভে শাহনেওয়াজ হলের আড়াই ফুট খাটে ঘুমিয়েছি দুজন; বিনা টিকেটে বাবার নাম বেচে চলে গেছি সীতাকুণ্ড; ধার-দেনায় কেনা কেক কেটে করেছি ভোকার জন্মদিন। কুড়ি বছরের সেই ‘আমি’-কে নিয়ে ভাবলে বড় মায়া হয়। ইচ্ছে হয় টাইম মেশিনে চেপে গিয়ে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে আসি ওই উ™£ান্ত যুবকের হাতে। আচ্ছা করে বকে দেই তার বাবা-মাকে। এভাবে কেউ কারো সন্তানকে ছেড়ে দেয় পৃথিবীর পথে? একটু জীবনযুদ্ধের হিসাব নিকাশ বুঝিয়ে দিলে, ছেলেটার ভবিষ্যৎ কতই না উজ্জ্বল হতো!

আমার সেই ছন্নছাড়া সময়টাকে বোধহয় সুনীল বুঝতে পেরেছিলেন।

প্রথম ডেকেছিল মধ্য কৈশোরে

পাগল করা এক ব্যথার দিন

শরীরে বেজেছিল সমর বিউগল

প্রথম স্বপ্নেরা হলো স্বাধীন।

আসলেই বড় পাগল করা এক ব্যথার দিন। এই ব্যথার মধ্যে একটা আনন্দ ছিল। এখন বেদনাবিহীন জীবনে সেই ব্যথাটাও নেই, নেই সে আনন্দ। আনন্দের জঠর ব্যথায় টনটন না করলে বোধহয় আনন্দের জন্ম হয় না। সেই ব্যথারাঙা দিনগুলোকে বড় মিস করি। মিস করি প্রিয় মুখগুলোকে।

:: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj