ফাগুনের নীল রং

শনিবার, ২৫ মে ২০১৯

রমজান মাহমুদ

ফওজুল করিম তারা চত্বরে বসে আছি। মধ্যদুপুরের একটা সময় বেশ কিছুদিন ধরে আমার এখানে কাটছে। এ চত্বরে পাসচডি, রঙ্গন, ইউফরগিয়া, কামিনী, অগ্নিনশ্বর, ইস্টেবিয়া ও বেতপাম গাছে বেষ্টিত। এখানে কবি জসীমউদ্দীন ও বিজয় চত্বর নামে আরো দুটি চত্বর রয়েছে। এসব চত্বর ২০-২৫ প্রজাতির বৃক্ষে পরিপূর্ণ। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই দুপুরের শেষভাগটা আমার এখানে কাটে। গত দুদিন পর আবার এ স্থানটিতে এসেছি।

আজ আমার মন খারাপ, ইদানীং কেন জানি সময় অসময়ে মন খারাপ হয়ে যায়! অনেকক্ষণ ধরে পায়ের দিকে তাকিয়ে আছি, কাটা স্থানটি কিছুটা শুকিয়েছে। এখন আর ফওজুল করিম তারা চত্বরে বসতে ইচ্ছে করছে না। কবি জসীমউদ্দীন চত্বরে কিছুক্ষণ পায়চারি করে রেলিং ধরে মোহিনী মোহন দাস লেনের ব্যস্ত গলিটিতে তাকালাম, ব্যস্ত এ শহরের মানুষগুলো নিজেদের মতো করে ছুটে চলছে। নর্থব্রুক হল রোড থেকে ফরাশগঞ্জ রোডের উৎপত্তি। আর ফরাশগঞ্জ রোডের ছোট্ট একটি গলি মোহিনী মোহন দাস লেন। সকাল থেকে সন্ধ্যারাত পর্যন্ত এ পথগুলো ভীষণ ব্যস্ত। আচ্ছা, এ রোড বা গলি দিয়ে যারা পথচারী থাকেন, তারা সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকেন কেন? আমার এসব ভালো লাগে না। আমার ভাবনায় এসে জমা হয়, নানা স্বপ্ন, নানা কল্পনা! কিন্তু ইদানীং স্বপ্ন দেখতেও ইচ্ছে করে না। আমাদের সমাজব্যবস্থায় সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয় অর্থ দ্বারা, সবাই অর্থের পেছনে ছুটে চলে। এ সমাজব্যবস্থায় মধ্যবিত্তের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়া বা আনন্দের কোনো মূল্য নেই।

২.

আমি খুব সাধারণ চাপা স্বভাবের একজন মানুষ, গায়ে পড়ে কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। এজন্য অনেকেই আমাকে নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু একবার কারো সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হলে, তাদের সে ধারণা পাল্টে যায়। মেঘের সঙ্গে যখন পরিচয় হয়, তখন মেঘও একই ধারণা করেছিল। আর মনে মনে ভেবে ছিল- এ বোরিং টাইপ মানুষটাকে নিয়ে একটা দিন কীভাবে পার করব! আমি চুপচাপ থাকা একজন মানুষ, যে খুব সহজে কারো কাছে নিজের অব্যক্ত কথা প্রকাশ করতে পারে না। শত দুঃখে থাকার মাঝেও যে একগাল হেসে বলবে, বেশ আছি। আর এ কথা বলার মাঝ দিয়ে নিজের অজান্তেই বের হয়ে যায় এক দীর্ঘশ্বাস!

৩.

ফাগুন আমার খুব প্রিয়। এ মাসটির জন্য একটি বছর অপেক্ষায় থাকি। ফাগুনের প্রথম দিনটি মেঘের সঙ্গে কাটানোর ইচ্ছে। মেঘ আমার জীবনে আকাশের মেঘের মতো-ই হঠাৎ করে এসেছে। খুব সাদামিটে একজন নারী, প্রথম দেখাতে যে কারোর ভালো লাগবে। বিশেষ করে তার গালে হাসার অভ্যেস। মেঘের সঙ্গে আমার কিছু জায়গায় বেশ মিল। আমি একজন স্বপ্নবাজ মানুষ, খুব সহজেই সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন বুনন করতে পারি। কখনো সে স্বপ্ন পূর্ণতা পায়, আবার তা খুব সহজে হারিয়েও যায়।

মেঘকে একদিন হঠাৎ করে জানালাম, ‘পহেলা ফাগুন একসঙ্গে কাটাতে চাই। আপনার কি সময় হবে?’

মেঘ প্রতিত্তুরে জানালো, ‘একটু ভেবে কাল জানাচ্ছি।’

আমি কালকের জন্য অপেক্ষায় থাকলাম। এক সময় মেঘ জানালো, ‘সে পারবে না, অন্য একজনকে কথা দিয়েছে।’

আমি ব্যথিত হলাম, পরক্ষণে ভাবলাম আমার কথা রাখার মতো সম্পর্ক মেঘের সঙ্গে তৈরি হয়নি। শুধু শুধু মেয়েটিকে এ কথা বলে বিব্রতকর একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন করা হয়েছে। মুখের ওপর না বলে দেয়নি তাই বা কম কিসের!

৪.

আমি খুব অভিমানী একজন মানুষ, সামান্যতেই প্রচণ্ড অভিমান কাজ করে। কিন্তু কারো সঙ্গে রাগতে পারি না। মেঘের ওপরও নানা কারণে মাঝে মাঝে অভিমান জমা হয়, কিন্তু তার স্থায়িত্ব থাকে কম। ৮ ফাগুন মেঘ জানালো সে দেখা করবে, বিআরটিসি কাউন্টারের সামনে ৬টায় অপেক্ষায় থাকবে।

মনে মনে ভাবলাম, মেঘের পৌঁছানোর আগে আমি পৌঁছে ওকে সারপ্রাইজ দেব। কিন্তু পরপর চারটি রিকশা পরিবর্তন করেও আমি পারিনি, রায়সাহেব বাজার মোড় কিংবা তাঁতীবাজার মোড়ের জ্যাম আমাকে সে সুযোগ দেয়নি। মেঘই আমাকে সারপ্রাইজড করেছে!

আমি লাজুক ভঙ্গিতে বললাম, ‘সরি দেরি হয়ে গেল।’

মেঘ একগাল হেসে জবাব দিল, ‘উড়ে আসতে পারলেন না!’

এক পলক মেঘের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম। ওকে খুব ক্লান্ত লাগছিল, তবুও আমরা হেঁটে শহীদুল্লাহ হল পর্যন্ত গেলাম। আমার প্রিয় জায়গা পুকুর পাড়ে কিছু সময় অবস্থান করলাম। পুরোটা সময়ই দুজনের ভেতর নীরবতা- কারো মুখে কোনো কথা নেই!

আমি আগ বাড়িয়ে বললাম, ‘চলুন ফিরে যাই।’

মেঘ মাথা নিচু করে বলল, ‘আচ্ছা, আমরা কি হই!’

গত কয়েক দিন ধরে মেঘ এই একটি প্রশ্ন বারবার করছে। আজ আমি মোটেও এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমার বুকে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করলাম। যখন ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু গোপন করি, তখন এ সমস্যায় পড়তে হয়।

আমি আকাশের ভরা পূর্ণিমার চাঁদ দেখিয়ে বললাম, ‘আজকের চাঁদটা খুব সুন্দর না!’

মেঘ বিরক্ত হলো, কিন্তু তা প্রকাশ করল না। রাত বাড়ছে আমি আর মেঘ দোয়েল চত্বর থেকে শিক্ষা অধিকার চত্বরের দিকে হাঁটছি।

শিশু একাডেমির সামনে এসে মেঘ বলল, ‘আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু পেলাম না।’

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম আর মনে মনে বললাম, ‘মেঘ কিছু প্রশ্নের উত্তর ইচ্ছে করলেও দেয়া যায় না। আমাদের সমাজব্যবস্থা তা দিতে দেয় না!’

মেঘ দীর্ঘশ্বাসের কারণ বুঝতে পারল কিনা জানি না। তবে শিক্ষা ভবনের কাছে এসে দ্রুত রিকশায় উঠে পড়ল।

আমি সে রিকশার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম, ইচ্ছে করছে চিৎকার করে বলতে, ‘মেঘ তুমি যা জানতে চাও আমি তার উত্তর দেব, তোমার শূন্যতা অনুভব করা যদি ভালোবাসা হয়, তাহলে প্রতিটা মুহূর্তেই তোমায় ভালোবাসি।’ কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তা আর বলা হলো না।

৫.

গত দু’রাত ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না। তবুও দিনের স্বাভাবিক কাজগুলো নির্বিঘ্নে করে যাচ্ছি। আমার কাছে ক্লান্তি বলতে কোনো কথা নেই। একজন মানুষ ইচ্ছে করলে সব পারে, শুধু পারে না মন ভালো রাখতে! ফাগুনের ১০ দিন অতিবাহিত হচ্ছে, আজকে সকালটায় চারপাশে বেশ কুয়াশা পড়েছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে এখন ডিসেম্বরের শেষ দিনগুলোর একটি। অনেকদিন পর সকালে হাঁটতে বের হলাম। ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে ধরে দক্ষিণাঞ্চলগামী বাসগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে পথে বের হয়েছে। আমার দৃষ্টি সেদিকে। ছোট বাসস্ট্যান্ড মসজিদ থেকে উত্তরের দিকে হাঁটছি।

কেউ একজন পিকআপ ভ্যান থেকে চেঁচিয়ে বলছে, ‘ভাই শুনছেন, হাঁসাড়া পুলিশ ফাঁড়িটি কোথায়?’

আমার ইচ্ছে করছে না তার জবাব দিতে। তবুও ইঙ্গিতে স্থানটি শনাক্তকরণ করলাম। হাইওয়ে থেকে পূর্বদিকে স্কুল রোডে নেমে আসলাম। সায়েন্স বিল্ডিংয়ের পথ ধরে হাঁটছি। রুমে ঢুকে পশ্চিমের জানালা খুলে দেব। সেনের বাড়ির শিরীষ গাছগুলো দেখতে ইচ্ছে করছে, কুয়াশার কারণে কি দেখা যাবে? তবুও তাকিয়ে থাকব খানিকটা সময়!

মুন্সিগঞ্জ।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj