প্রিয় মুনতাসীর মামুন

শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯

চৌধুরী শহীদ কাদের

মুনতাসীর মামুন। যিনি ইতিহাসকে একাডেমিক ডিসিপ্লিনের পর্যায় থেকে নিয়ে এসে আমাদের জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। রস-কষহীন গুরুগম্ভীর ভাষায় দীর্ঘ বাক্যে প্রাতিষ্ঠানিক ছকে লেখা দুর্বোধ্য ইতিহাসচর্চাকে তিনি সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এই কাজটি মুনতাসীর মামুন করেছেন তাঁর তীব্র সমাজবোধ থেকে। সমাজবোধ ছাড়া ইতিহাস হয় না। আর ইতিহাসের অর্থ মানুষের জীবনযাপনের জটিলতা উন্মোচন করা। এই বিশ্বাস তাঁর কাজের ভিত্তিমূল। এই বিশ্বাস থেকে তিনি ইতিহাসের অভিজ্ঞতাকে গণতন্ত্রের পক্ষে ও স্বৈরতন্ত্রের বিপক্ষে একটি মূল্যবান উপাদান বলে মনে করেন। এই পক্ষ ও বিপক্ষের অবস্থান নির্মিত হয়েছে মতাদর্শিক ঐতিহ্য থেকে, পাকিস্তান আমলের কলোনিয়াল লড়াইয়ের সামষ্টিক স্মৃতি থেকে। ইতিহাস সেজন্য তাঁর দিক থেকে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এককেন্দ্রিক অবস্থান। সমাজের সঙ্গে ইতিহাসকে যুক্ত ও অতীতের ঘটনাবলীর সঙ্গে বর্তমানকার ঘটনাবলীর সম্পর্ক তৈরি করা, ইতিহাসবিদ হিসেবে তিনি তাঁর দায়িত্ব বলে মনে করেন। এইভাবেই তিনি হয়ে উঠলেন গণমানুষের ইতিহাসবিদ। কেবল তা-ই নয়; তিনি জনমুখী করতে সচেষ্ট বাঙালির অহমের ইতিহাস, বাঙালির বীরত্বের ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। প্রাঞ্জল ভাষা, স্বচ্ছ বিচার-বিশ্লেষণ আর সূ² পর্যবেক্ষণশক্তি লেখাকে কী পরিমাণে শানিত করে তোলে অধ্যাপক মামুনের অসংখ্য লেখাই তার প্রমাণ। আর একহাতে স্বল্প সময়ে এত কাজ করার যোগ্যতা কজনেরই বা থাকে! ফলে অজস্র বাধা পেরিয়ে এই কাজ করতে করতে মুনতাসীর মামুন যেন ব্যক্তি নন, একটি সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করেছেন।

না। উল্লিখিত কথাগুলো কেবল তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিচয় বহন করে না। কারণ তিনি একাধারে ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ, সৃজনশীল সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক, অনুবাদক, দেশপ্রেমিক এবং প্রগতিশীল সমাজকর্মী ও প্রতিবাদী লেখক। দেশ ও সমাজের নানা প্রেক্ষাপটে তার বহুমাত্রিক ভূমিকা জনসমাজে তাঁকে দিয়েছে বিশিষ্টতার আসন। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে জনরাষ্ট্রে পরিণত করতে সামাজিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক অবদানের মাধ্যমে তিনি পরিণত হয়েছেন পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে।

সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ভাষ্যকার হিসেবে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। যারা শুধুমাত্র পত্রিকা পড়ে মুনতাসীর মামুনকে চিনেন। তাদের ধারণা মুনতাসীর মামুন রাজনৈতিক ভাষ্যকার। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর পরিচয় পূর্ববঙ্গবিষয়ক গবেষক হিসেবে। ঢাকার নাগরিকদের কাছে তিনি নগর ঢাকার একমাত্র গবেষক। যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করেন তাদের কাছে তিনি মুক্তিযুদ্ধ গবেষণার পথিকৃৎ। ছাত্রদের কাছে মুনতাসীর মামুন একনিষ্ঠ শিক্ষক। রাজপথে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে চার দশকের অবস্থান দেশে ও দেশের বাইরে তাকে পরিচিতি দিয়েছে মানবতাবিরোধী বিচার আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে। সারা দেশের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শিক্ষকের কাছে তিনি ইতিহাসের অভিভাবক। আর আমরা যারা মুনতাসীর মামুনের হাতে মানুষ হয়েছি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়াচ্ছি, সংগঠন করছি, তাদের কাছে তিনি এক অনন্য উচ্চতার ব্যক্তিত্ব।

মুনতাসীর মামুন প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে যাচ্ছেন। বহুমাত্রিক এই লেখকের প্রথম বইটি ১৯৬৮ সালে বের হয় সত্যেন সেনের উদ্যোগে। এরপর কখনো তাকে পেছনে ফিরে থাকতে হয়নি। লিখেছেন, একের পর এক পাঠকনন্দিত বই। বর্তমানে তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় ৩০৪। (এর মধ্যে অবশ্যই প্রকাশিত কিছু গ্রন্থের সংকলনও আছে) শিক্ষকতার আগে ছিলেন খুবই পরিচিত সাংবাদিক। বিচিত্রায় কর্মরত অবস্থায় লিখেছেন বেশ কিছু ছোট গল্প। করেছেন অনুবাদ। বিশেষ করে শিশু সাহিত্য দিয়েই শুরুতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। ষাটের দশকে মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির, আলী ইমাম শিশু সাহিত্যিকত্রয় মোটামুটি ঝড় তুলেছিলেন শিশু সাহিত্য ভুবনে।

লেখালেখির উৎসাহটা মূলত পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত। আরও স্পষ্ট করে বললে, মুনতাসীর মামুন প্রভাবিত ছিলেন বাংলা সাহিত্যের আরেক খ্যাতিমান লেখক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর দ্বারা। সম্পর্কে তাঁর চাচা। পারিবারিক আবহ তাঁর মুনতাসীর মামুন হয়ে ওঠার পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এই আবহে তিনি পেয়েছেন বহু মূল্যবান গ্রন্থ পাঠের, চিন্তা ও মানসিক পরিপক্কতার উপযুক্ত সুযোগ। এরপর পেয়েছেন সমসাময়িক সমাজের বিদ্বৎজনের সান্নিধ্য। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্য তাঁকে পরিশ্রমী হতে শিখিয়েছে, বিনয় ঘোষের সাহচর্য তাঁকে দিয়েছে নিরন্তর কাজ করার প্রেরণা। আর নিতান্ত অল্প বয়সে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করার কারণে তিনি স্নেহ পেয়েছেন অনেক বিদ্বৎজনের। সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, আহসান হাবীব, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, আহমদ ছফা এমন প্রতিভাবান ব্যক্তিরা তাঁর মনন গঠনে সহায়ক হয়েছেন। ১৯৭৬ সালে কলকতায় বিনয় ঘোষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিনয় ঘোষের কাছে তিনি পূর্ববাংলায় সাময়িকপত্র সংক্রান্ত পাণ্ডুলিপি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন এগুলো তিনি কলকাতায় ছাপাতে চান। কিন্তু মুনতাসীর মামুন বললেন, এগুলো তিনি ঢাকায় ছাপাতে চান। কিন্তু বিনয় ঘোষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অক্ষুণœ ছিল।

মুনতাসীর মামুনের যাত্রা শুরু হয়েছিল শিশু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হিসেবে। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রতিষ্ঠা পেলেন লেখক হিসেবে। লেখার বিষয় হিসেবে বেছে নিলেন সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়কে। লিখলেনও সাধারণ মানুষদের উপযোগী অতি সাধারণ ভাষায়। খুব সাধারণ সহজবোধ্য ভাষায় ইতিহাস রচনা করলেন। পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছেন দ্রুত। শুরুতে বিষয় হিসেবে বেছে নেন পূর্ববঙ্গ। এরপর পূর্ববঙ্গের কেন্দ্র নগর ঢাকার ইতিহাস রচনায় মন দিলেন। নগর ঢাকার অলি গলি খাল-পোল, নদী, মানুষ জীবন্ত হলেন পাঠকের চোখে। মুনতাসীর মামুন নগর ঢাকার লোকের কাছে পরিচিতি পেলেন ঢাকার রহস্য উদ্ধারকারী হিসেবে। শুধু লিখেই ক্ষান্ত হননি, নগর ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে এলেন নানাভাবে। প্রতিষ্ঠা করলেন ঢাকা নগর জাদুঘর। সেন্টার ফর ঢাকা স্টাডিজ করে উদ্যোগ নিলেন দুর্লভ গ্রন্থ প্রকাশের। বহুমাত্রিকতায় নগর ঢাকার ইতিহাস বিনির্মাণে দাঁড়ালেন বুড়িগঙ্গা রক্ষার আন্দোলনে। কবি শামসুর রাহমানের মতো লোক দ্বিধাহীনভাবে বললেন, ‘আমি তাঁর লেখার অনুরক্ত পাঠক। শুধু ঢাকার ইতিহাস মুনতাসীর মামুনকে বাঁচিয়ে রাখবে যতদিন ঢাকা নগরীর অস্তিত্ব থাকবে।’ একজন লেখকের এরচেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে।

পাঁচ দশক ধরে ক্রমাগত লেখনী, রাজপথের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তাকে এই সাধারণের মনে স্থান দিয়েছেন। জনমানসের মানসজগতের এই স্থানে তাকে কেউ বসিয়ে দেননি। সেটি তিনি অর্জন করেছেন নিজের কর্মে। সেই স্বৈরাচারী এরশাদ শাসন থেকে বর্তমান ধারাবাহিকভাবে লিখে গিয়েছেন পত্র-পত্রিকায়। মূলত দীর্ঘদিন ধরে সাম্য ও ন্যায়ের পথে তাঁর এই লেখনী তাকে সাধারণে পরিচিতি দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধ বিচার আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকা তাঁর পরিচিতির আরেকটি বড় কারণ। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধবিচার আন্দোলন ও শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন প্রায় সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। নানা প্লাটফর্মে নানামুখী ভূমিকা, একইসাথে কলমে ও রাজপথে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত করেছেন। তিনি পরিচিতি পেয়েছেন আমাদের লোক হিসেবে।

শুভ জন্মদিন, আমাদের বাতিঘর, প্রিয় শিক্ষক, অভিভাবক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj