অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ইতিহাসের মুক্তি

শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯

মামুন সিদ্দিকী

বাঙালির জাতীয় জীবনে চিন্তা ও কর্মের পরিসর ছাড়িয়ে কেউ কেউ হয়ে ওঠেন আলোকদিশারী ব্যক্তিত্ব; বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকায় উত্তরপ্রজন্ম ও সমাজের কাছে হয়ে ওঠেন শ্রদ্ধেয় ও স্মরণীয়- বিশিষ্ট ঐতিহাসিক মুনতাসীর মামুন (১৯৫১) তেমনি একজন ব্যক্তি। পাকিস্তানি আমলের অন্তিম পর্যায় থেকে অদ্যাবধি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকায় তিনি অগ্রণী ব্যক্তি। তিনি শিক্ষক, ঐতিহাসিক, শিশু সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, শিল্পসমালোচক ও সংগ্রাহক, অনুবাদক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক- এরকম নানা পরিচয়ে তিনি ভূষিত। মূলত মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শে সারস্বত ও সিভিল সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই তাঁর সমুদয় কাজের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য।

ছাত্রজীবনে দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকসুর সম্পাদক। সেখান থেকে প্রকাশিত ‘ছাত্রবার্তা’ তিনি সম্পাদনা করতেন। বাংলাদেশ লেখক শিবির ও বাংলাদেশ লেখক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। কর্মজীবন কাটিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনায়। বর্তমানে একই বিভাগে বঙ্গবন্ধু-অধ্যাপক হিসেবে নিরত। কিন্তু মুনতাসীর মামুন কখনো ঘরকুনো ঐতিহাসিক ও পণ্ডিত হয়ে বসে থাকেননি। সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও সংকটে নেমে পড়েছেন রাজপথে। আবার সেখানেও নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। উপর্যুক্ত দুই ভুবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর সাংগঠনিক সত্তা। জাদুঘর প্রতিষ্ঠা, স্বারস্বত প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন স্থাপন এবং দেশমাতৃকার বিরহ-সংকট মোচনে নানামুখী প্রয়াসে যুক্ত হয়েছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। মূলত এই কর্মপরিসরে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন গত পাঁচ দশকে তাঁর ভূমিকাকে নিশ্চিত করেছেন।

মুনতাসীর মামুনের কাজগুলো পর্যালোচনা করলে ওঠে আসে বাংলাদেশের ইতিহাস। কারণ রাষ্ট্রের উত্থান-পতন ও বিরহ-মিলনের ঢেউ স্পর্শ করেছে তাঁকে। তারই অভিঘাতে তিনি দোলায়িত হয়েছেন, সম্পন্ন করেছেন সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যে সাংস্কৃতিক পটভূমিকায় তাঁর উন্মেষ, যে রাজনৈতিক প্রতিবেশে তাঁর উদ্ভব, তা তাঁকে সব সময় নিবিড়ভাবে যুক্ত রেখেছে মাটি ও মানুষের সার্বিক মুক্তিসংগ্রামে। কিন্তু সমকালীন সংকট মোচনেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ইতিহাসের মুক্তি খুঁজেছেন অতীত ইতিহাস ও বোধ থেকে। আবার তার সঙ্গে যুক্ত করেছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ এবং সিভিল সমাজ গড়ার প্রত্যয় এবং মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এজন্য তিনি কয়েকবার জেল খেটেছেন। জেলে গিয়েও ছিলেন সৃষ্টিশীল। পূর্বসূরিদের দেখানো পথে লিখলেন স্মৃতিকথা ‘প্রিয়জন’, ‘আমার ছেলেবেলা’।

এই লড়াই শুধু পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে নয়, পূর্ববঙ্গের জাগরণের ইতিবৃত্ত রচনায় তিনি আত্মনিয়োগ করেন, তুলে ধরেন তার বিস্তৃত ও বিস্মৃত স্বরূপ। তিনি লক্ষ করেন উনিশ শতকের ইতিহাসে শুধু কলকাতার কথাই উঠে আসে। উনিশ শতকে বাংলার পশ্চাৎপদ এলাকা হিসেবে পূর্ববঙ্গ ছিল উপেক্ষিত। যে জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই তাঁকে উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গের সামাজিক ইতিহাস সংগ্রহে করে অগ্রগামী। তিনি পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন পূর্ববঙ্গের সামাজিক ইতিহাস নিয়ে। উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের সমাজ, সংবাদ-সাময়িকপত্র, ব্রাহ্ম আন্দোলন, মুদ্রণ ও প্রকাশনা, মুদ্রিত পুঁথি, বুদ্ধিজীবী সমাজ, দু®প্রাপ্য গ্রন্থ ইত্যাদি নিয়ে তিনি বিপুলাকার ও নানামুখী সব গ্রন্থ রচনা করেন। এভাবে পূর্ববঙ্গের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে ঢাকাও হয়ে ওঠে তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু। ঢাকা গবেষণায় তাঁর নাম আজ অনিবার্য। নানামুখী গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসচর্চার ধারায় নিয়ে এসেছে ভিন্ন মাত্রা।

মুক্তিযুদ্ধকে গবেষণার বিষয় হিসেবে জনপ্রিয় করতে তাঁর নাম অগ্রগণ্য। আবার সমকালীন রাষ্ট্রের অচলায়তন ও আদর্শ বিচ্যুতির ফলে ক্ষুব্ধ ঐতিহাসিক আবির্ভূত হন রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে। গেল শতকের আশি-নব্বইয়ের দশকে সামরিক সরকারের বাংলাদেশ-বিমুখ অপকর্ম তিনি মেনে নিতে পারেননি। এজন্য সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্র তাঁর মনোযোগ কেন্দ্রের বাইরে থাকেনি। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের পথে পরিচালনে তিনি নানা ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। স্বৈরাচার, সামরিকায়ন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা সর্বজন বিদিত। তিনি প্রকাশ্য প্রতিবাদে লিখেছিলেন ‘যে দেশে রাজাকার বড়।’ মূল কথা বাংলাদেশকে একটি জনরাষ্ট্রে পরিণত করে জনসমাজের কাছে দায়বদ্ধ রাখতে চেয়েছেন। শুষ্ক-রুক্ষ-নিরস পরিসর থেকে ইতিহাসকে নিয়ে গেছেন মানুষের কাছে; করেছেন জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয়। এভাবেই তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছেন ইতিহাসের মুক্তি।

এই চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি হাত দেন জাদুঘর প্রতিষ্ঠায়। বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, নগর জাদুঘর, বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় তিনি পালন করেন প্রধানতম ভূমিকা। একই চিন্তাদর্শ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করে ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনিস্টিটিউিট’। ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া যে আদর্শিক লড়াই সম্ভব নয় এই বোধ থেকেই মুনতাসীর মামুন উপর্যুক্ত সংস্থা ছাড়াও পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠা করেন অসা¤প্রদায়িক ও গণমুখী ধারার সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী’ এবং খুলনায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গণহত্যা বিষয়ক জাদুঘর হিসেবে এই প্রতিষ্ঠান গণহত্যা-নির্যাতন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্স, গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর সংক্রান্ত জেলা জরিপ (২০টি), গণহত্যা নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা (৭৪টি) প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছেন। জনসমাজের কাছে প্রতিনিয়ত তুলে ধরেছেন জনইতিহাস ও তার প্রত্যয়।

ব্যক্তিক উদ্যোগে গড়ে তোলা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ (আইসিবিএস) থেকে বের করেছেন গুরুত্বপূর্ণ সব গ্রন্থ। ‘বাংলাদেশ চর্চা’ নামক (১৪ খণ্ড) সংকলনে প্রকাশ করেছেন তাৎপর্যপূর্ণ সব রচনা। এই সব কাজে ইতিহাসচর্চা ও লেখালেখির সঙ্গে বিপুল সময় ব্যয় করছেন। গড়ে তুলেছেন সারস্বত সমাজ ও পরিমণ্ডল। এই শশব্যস্ততার মাঝে কাটছে তাঁর এইসব দিনরাত্রি।

মূলত অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেকের বিভ্রান্তি রয়েছে, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের উত্তর ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে। তাই বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর মাধ্যমে ব্যাপক প্রচেষ্টার পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ শীর্ষক কোর্স সবার বিষয়ের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও বাংলা বিষয় পড়ানোর প্রচেষ্টা চলছে। এভাবে যেমন ইতিহাসের সত্যভাষ্য ছড়িয়ে পড়ছে সমাজে, তেমনি সিভিল সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামচেতনা পাচ্ছে সমধিক বিস্তার। এসব কাজের স্বাপ্নিক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি হিসেবে নয়, দণ্ডমুণ্ডের অধিপতি হিসেবেও নয়, মুনতাসীর মামুন একান্ত ব্যক্তিপ্রয়াসে, সামাজিক দায় থেকে, প্রখর ইতিহাসচেতনা থেকে এসব কাজ করে যাচ্ছেন। একদল তরুণ গবেষক, কর্মী বাহিনী এবং ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে তিনি যেসব কাজ সম্পন্ন করছেন তার প্রভাব হয়তো এখনই দৃষ্ট হচ্ছে না, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের নতুন জাগরণে এসব কাজ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

গত পাঁচ দশকে গল্প, ভ্রমণ, অনুবাদ, শিশুসাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ে মুনতাসীর মামুন তিন শতাধিক বই রচনা করেছেন। শুধু নিজে রচনা করেই ক্ষান্ত হননি। উত্তরকালের গবেষকদের জন্যও ব্যাপক উপকরণ সংগ্রহ করে সংকলিত করেছেন। যেমন তাঁর সর্বশেষ কাজটি বেশ প্রশংসিত হয়েছে, তা হলো বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘আত্মস্মৃতিতে পূর্ববঙ্গ’। এর দুটি খণ্ড বের হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে আরো কয়েকটি খণ্ড। তা ছাড়া ‘মুক্তিযুদ্ধ কোষ’ (১২ খণ্ড), ‘গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ (২৪ খণ্ড), ‘উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ-সাময়িকপত্র’ (১৫ খণ্ড), ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ (২ খণ্ড), ‘বঙ্গবন্ধু কোষ’ ইত্যাদি কাজ উত্তরকালের গবেষকদের আকরগ্রন্থ হিসেবে কাজে দেবে।

ইতিহাস সাধনা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভূমিকা ও সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা সমানতালে পরিচালনা ও সম্পৃক্তি সাধারণত দেখা যায় না। মুনতাসীর মামুন এ ক্ষেত্রে আশ্চর্য ব্যতিক্রম। মৌমাছির মতো ব্যস্ত এই মানুষটি সব দিক দিয়েই সাফল্য পেয়েছেন। সুশৃঙ্খল, সময়ানুবর্তিতা ও অনলস কর্মসাধনায় তিনি পার করেছেন জীবনের দিনগুলো। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী হিসেবে মৌলবাদের আক্রোশের শিকার হয়েছেন কয়েকবার। ধর্মান্ধদের দ্বারা ঘোষিত হয়েছেন মুরতাদ হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও মৌলবাদী শক্তির অন্ধচোখে জ্যোতিষ্মান একজন ব্যক্তিত্বকে এমনি মনে হবে বৈকি।

বহুমুখী কাজের জন্য মুনতাসীর মামুন একুশে পদকও বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশ ও দেশের বাইরের অনেক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। কিন্তু তাঁর মূল অর্জন আদর্শিক সংগ্রামের সংসপ্তক হিসেবে জনপ্রিয়তা ও শ্রদ্ধা লাভ, ‘স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি’ যাঁর আদর্শ, দেশকালের প্রেক্ষাপটে তিনি কাজ করে গেছেন নিরলস, পরিণত হয়েছেন জনবুদ্ধিজীবীতে। আজ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের ৬৮তম জন্মদিন। এ দিনে বাঙালির এই শ্রেষ্ঠ অমৃতসন্তানের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj