অনুকরণীয়, অনুসরণীয় মুনতাসীর মামুন

শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯

মুনতাসীর মামুন সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিহাসবিদ, গবেষক, লেখক, ভাষ্যকার ও অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে অনন্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি অসাধারণ বিজ্ঞ এবং অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। বিজ্ঞতার জন্য তাঁর কোনো অহংকারবোধ নেই, বরং এখনো নিজেকে তিনি একজন জ্ঞান অন্বেষী হিসেবে উপস্থাপন করেন। ব্যক্তিগত যতœ বা আরাম আয়েশের বিষয়কে তিনি একেবারেই প্রাধান্য দেন না। গবেষণা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ান। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কিংবা জীবননাশের হুমকি কোনোটাই তাঁর কাজের গতিকে শ্লথ করতে পারে না। তিনি চলছেন, কাজ করছেন, গবেষণা করছেন তাঁর আপন গতিতে। ফলে সমালোচকরাও মানতে বাধ্য যে তিনি সময়ের সেরা মানুষদের একজন।

আমরা যদি সাধারণ অর্থে বলি নেতৃত্বদান হলো অন্যদের গঠনমূলকভাবে প্রভাবিত ও পরিচালিত করে লক্ষ্য অর্জনের একটি প্রক্রিয়া, তাহলে মুনতাসীর মামুন একজন বলিষ্ঠ নেতা। এ ক্ষেত্রে তিনি তাঁর লেখনীর দ্বারা গবেষক থেকে আরম্ভ করে সাধারণ মানুষের মনোজগতে একটি প্রভাব সৃষ্টি করেছেন, আবার আর্কাইভাল গবেষণা থেকে আরম্ভ করে মাঠ পর্যায়ের ওরাল হিস্ট্রির মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রমও পরিচালনা করেছেন। পূর্ববঙ্গ, ঢাকা, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ তাঁর গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। গবেষণার জগতে গবেষকগণ যেখানে একটি ক্ষেত্রেই আবদ্ধ থাকেন সেখানে মুনতাসীর মামুন বিচরণ করেছেন বহুবিধ ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রেখেছেন। তা ছাড়া ব্যক্তিগত গবেষণার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষকদের জন্য সংগ্রহ করেছেন ইতিহাসের নানা উপকরণ। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ২৬ খণ্ডে প্রকাশিত গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমগ্রের কথা। যেখানে স্থান পেয়েছে ১৯৭১ সালে ভারতের বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা খবর। একজন তরুণ গবেষক ভারতে না গিয়ে খুব সহজেই এ সমগ্র থেকে তৎকালীন ঘটনাবলির তথ্য পেতে সক্ষম। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এত বিশাল কাজ এটিই প্রথম। অবশ্য শুধু এ সমগ্রই নয় তিনিই প্রথম বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংকলন করেছেন ১২ খণ্ডে মুক্তিযুদ্ধ কোষ। মানবতাবিরোধী অপরাধ আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুজ্জীবনে তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে তিনি এ কাজ করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর কাজ একক প্রচেষ্টার অনন্য উদাহরণ। আবার শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয় পূর্ববঙ্গ, ঢাকা ও বাংলাদেশ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অনুরূপ গবেষণা কর্ম সম্পাদনা করেছেন। এতকিছুর মাঝে গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার, যেখানে স্থান পেয়েছে সংবাদ-সাময়িকপত্র থেকে আরম্ভ করে ইতিহাস, রাজনীতি, আত্মজীবনী প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অসংখ্য দুর্লভ গ্রন্থ। বাংলাদেশে যেখানে প্রকৃতপক্ষে গবেষণামূলক গ্রন্থ সমৃদ্ধ কোনো গ্রন্থাগার প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই গড়ে ওঠেনি সেখানে মুনতাসীর মামুন সংগ্রহ করেছেন অসংখ্য গ্রন্থ। এগুলো নতুন গবেষকদের উৎসুক মনের খোরাক জোগাতে অত্যন্ত কার্যকরী।

অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে তিনি প্রগতিশীলতাকে অগ্রসরমান সমাজের চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করেন। রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তাঁর স্পষ্টবাদিতা, দৃঢ়তা, সাহসী ও প্রতিবাদী মনোভাব সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। শত প্রতিক‚লতার মাঝেও তিনি নতজানু হন না। জীবননাশের হুমকি উপেক্ষা করে তিনি এগিয়ে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালনের মাধ্যমে। নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী বাংলাদেশ গঠনের সংগ্রামের। একজীবনে তিনি ধারণ করেছেন একাধিক সত্তা। স্বাভাবিকভাবেই এরূপ মনীষীর জীবন আমাদের সাধারণের জন্য অণুকরণীয়, অণুসরণীয়।

:: মুর্শিদা বিন্তে রহমান

যখন মানুষ কোনো সম্পর্ক নিয়ে গর্ববোধ করে তখন বেশি শব্দ প্রয়োগের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। আজ বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের ৬৮তম জন্মদিন। ছাত্র হিসেবে তাঁর জন্মদিনে দুটো কথা বলার সুযোগ পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। স্যারের সাথে কাজ করছি কম দিন নয়। একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সম্পর্কটি কীভবে ব্যাখ্যা করা যায়? মনে হলো ‘আমার শিক্ষক’ এ দুটি শব্দই আমার গর্বের উচ্চারণ।

শিক্ষক শব্দটি যখন ক্রমশ এ দেশে তার শাব্দিক মর্যাদা হারাচ্ছে তখনও এই একটি কারণে শব্দটি আমার মনে এর ঐতিহ্যিক দ্যুতি ছড়ায়। ছেলেবেলায় পারিবারিক বলয়ে শিখেছি শিক্ষক হলেন গুরু, ওস্তাদ। তিনি ছাত্র-সাগরেদ-শিষ্যের বিদ্যাশিক্ষা দিয়েই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেন না। ছাত্রের জীবনের সার্বিক মঙ্গল সাধনই হয় তাঁর ব্রত। ফলে সে আদর্শ শিক্ষক খুঁজেছি আশৈশব।

এর মাঝে কেন জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য একটু বাড়তি শ্রদ্ধা তোলা ছিল। আমার পরিবারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক নেই, ফলে তাঁদের দেখেছি টেলিভিশনের পর্দায়। জাতীয় রাজনীতি হোক আর সংস্কৃতি, তারা যখন কথা বলতেন, অমোঘ সত্য বলেই ধরে নিতাম। পর্দায়ই দেখেছি ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকেও। দৈবক্রমে (মেধাক্রমে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে পড়ার সুযোগ হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্যারের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে দৈনিক পত্রিকায় কাজ করছি। চেষ্টা করছি গবেষণাধর্মী কিছু করার। দৈনিক পত্রিকায় সুযোগ কম। তখন একজন বর্ষীয়ান পণ্ডিত প্রতœতত্ত্ববিদ এ কে এম যাকারিয়াকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখা হচ্ছে। অফিসে প্রস্তাব দিলাম তাঁর অনুস্মৃতি লেখার। কাজটি পেয়ে গেলাম। জনাব যাকারিয়া সংস্কৃতি সচিব ছিলেন, আমলা হলেও পণ্ডিত ব্যক্তি। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় ভবন হলো সামরিক ছাউনি, হাসপাতাল, কুঁড়েঘরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস হতো। এসব গল্প আমাকে আগ্রহী করে তোলে। আরো বেশি কাজ করতে চাই এ বিষয় নিয়ে। কিন্তু যাকারিয়া সাহেবের সাক্ষাৎকার ছাড়া কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই আমার কাছে।

তখন কেউ কেউ বললেন বাংলাদেশে একজন শিক্ষক আছেন, যার কাছে যে কোনো বিষয়ে গবেষণার দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। তিনি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন- আমার শিক্ষক। জনপ্রিয় ঐতিহাসিক হিসেবে তাঁর নামের সাথে পরিচিত ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের আগেই। শুনেছি তিনি এতটাই স্পষ্টবাদী যে তাঁর কথা অনেক সময় নিষ্ঠুরতার মতো শোনায়। ফলে কখনো মুনতাসীর মামুন স্যারের সাথে কথা বলার সাহস করে উঠতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে তিনি আমাদের ইউরোপের ইতিহাস পড়াতেন। তাঁর ক্লাসে ছাত্র উপস্থিতি থাকতো পরিপূর্ণ। অন্যদের মতোই আমিও প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এই শিক্ষককে দূর থেকে শ্রদ্ধা করতাম। কখনো স্যারের সাথে কাজ করার সুযোগ হবে দ্বিতীয় বর্ষে তা ছিল আমার স্বপ্নাতীত। তাই গবেষণা কাজে সাহায্য চাইতে যেতে সাহস সঞ্চয় করতে বেশ সময় লেগেছিল।

একদিন সাহস করে চলে গেলাম স্যারের গিয়াসউদ্দিন আবাসিক এলাকার বাসায়। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম স্যার আমাকে বেশ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেন। এতটা আমি আশা করিনি। তবে আমার উদ্দিষ্ট বিষয়কে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে তিনি আমাকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিলেন। হতাশ হয়েছিলাম সত্যি, তবে স্যারের একটি বাক্য আমাকে নাড়া দিয়েছিলো- ‘মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জীবনে প্রথম বিজয়।’ এভাবে আমাকে আগে কেউ কখনো বলেনি বা আমিও এভাবে কখনো ভাবিনি। স্বাধীন দেশে জন্মেছি তাই স্বাধীনতা আমার কাছে ছিল আলো-হাওয়ার মতোই। আমার চেতনালোকে একটি নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হয়।

বাবা-মা সন্তানকে জন্ম দেন লালন-পালন করেন। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষকের হাতে ছাত্রের নবজন্ম হয়- চেতনা ও আদর্শে। কাজ করতে গিয়ে এমন এক শিক্ষকের দেখা পেয়েছি যিনি তাঁর ছাত্রদের কাছে শিক্ষক-পিতা-মাতা-বন্ধু। শিক্ষকের মতো তিনি পথনির্দেশনা দিয়েছেন। পিতার মতো আগলে রেখেছেন। মাতার মতো মমতা দিয়েছেন। বন্ধুর মতো তাদের দুঃখ-বেদনায় পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন কাজই জীবন। কাজ করেই মানুষ বড় হয়, কাজের মাঝেই বেঁচে থাকে।

:: রেহানা পারভীন

অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন আমার শিক্ষক। অনার্স ৩য় বর্ষ ৫ম সিমেস্টারে প্রথম তিনি আমাদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন মধ্যযুগের ইউরোপের ইতিহাস পড়াবার জন্য। গরমের দিনে সাধারণত তিনি হাফ হাতা ফতুয়া বা শার্ট পরে ক্লাসে আসতেন। সাথে যথারীতি দুই সেট চশমা। বক্তৃতার সময় ঘনঘন তিনি এক সেট বদলে আর এক সেট পরতেন। এ ব্যাপারটি ক্লাসে আমাদের প্রায় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। মামুন স্যার আমাদের মধ্যযুগের ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ রেনেসাঁ পড়িয়েছিলেন। শ্রেণি বক্তৃতার একটি নিজস্ব ধরন তিনি অনুসরণ করতেন। সেই বক্তৃতায় প্রায় প্রতিদিনই বোকাচ্চিও, বত্তিচেল্লি, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি প্রমুখ ইউরোপীয় রেনেসাঁ ¯্রষ্টাদের নাম তিনি এমনভাবে বলতেন, যেন তারা স্যারের আড্ডার সঙ্গী, খুবই আপনজন। এবং সেসব বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে তিনি ভেনিস, ফ্লোরেন্স, রোম, নেপলস, ভাটিকান সিটি, প্যারিস প্রভৃতি ইউরোপীয় শহর বা দেশ ভ্রমণের প্রাসঙ্গিক গল্প বলতেন। আর একটি কথা তিনি বলেছিলেন, ‘যেসব বিষয় পড়ানো হবে, তা নিজের চোখে না দেখলে কি পড়ানো যায়!’ আর এভাবে তিনি আমাদের ভ্রমণে উৎসাহিত করতেন। কখনো কখনো তিনি অল্প টাকায় ভারত, নেপাল, ভুটান ভ্রমণের সহজ পথ/রুট বলে দিতেন। এ প্রসঙ্গে তিনি জোরের সঙ্গে বলতেন, ‘মনে রেখো, তোমরা ঘুরতে যাচ্ছ, দেখতে যাচ্ছ, আরাম করতে যাচ্ছ না। তবে যেখানে যাবে, অবশ্যই সেখানকার বিশেষ পদ চেখে দেখবে, আর দেখবে মিউজিয়াম ও বাজার।’

মামুন স্যারকে আমরা ক’জন আবার ক্লাসে পেলাম এম.ফিল ১ম পর্বে। সেবার তিনি আমাদের পড়ালেন ‘বাংলার সমাজ পরিবর্তন ও জনমত: উনিশ ও বিশ শতক’। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটারে তাঁর বসার কক্ষেই ক্লাসগুলো হয়েছিল। এই ক্লাসগুলোতে আমরা মামুন স্যারকে পেয়েছিলাম অনন্য উচ্চতায়। বাংলার বিশেষ করে পূর্ব বাংলার সমাজ কীভাবে একের পর এক রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাতে পাল্টে যাচ্ছে ও নতুন রূপ পাচ্ছে, তা চোখের সামনে জীবন্ত হাজির করলেন তিনি। এ বিষয়ে বক্তৃতা দেবার সময় তাঁর চোখে-মুখে ফুটে উঠত একটি বিশেষ আলো, বিশেষ অভিব্যক্তি। ন্যূনতম কাগজপত্র, পুস্তক ছাড়াই তিনি একের পর এক শ্রæত-অশ্রæত, স্বল্প পরিচিত ও বিখ্যাত বাঙালির নাম ও কর্ম সম্পর্কে বলে যেতেন।

স্যার উপদেশের ছলে পড়তে বলেছিলেন অসংখ্য গ্রন্থ। বিশেষ করে বলেছিলেন আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা পড়তে। তিনিও প্রায়ই ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অঘোরনাথ মুখোপাধ্যায়, বিনয় ঘোষ, সুশোভন সরকার, বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু, রমেশচন্দ্র মজুমদার, স্যার সৈয়দ আমীর আলী, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, কাজী নজরুল ইসলাম, কমরেড মোজাফফর আহমদ, কামরুদ্দীন আহমদ, নীরদ চৌধুরী, তপন রায় চৌধুরীসহ প্রমুখ লেখকের উদ্ধৃতি বা বক্তব্যসার ব্যবহার করতেন তাঁর বক্তৃতায়। এবং রবীন্দ্রনাথ যে এই তালিকায় সবচেয়ে বেশিবার, তা বলাই বাহুল্য। স্যার খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতেন, ‘দুইজন বাঙালিকে বাদ দিয়ে বাঙালির কোন ইতিহাস হবে না। একজন রবীন্দ্রনাথ, অন্যজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

ক্লাস শেষে প্রায় প্রতিদিনই আমরা স্যারের সাথে নেমে আসতাম তিনতলা থেকে নিচতলায়। স্যার বলতেন, ‘তোমরা লেখ না কেন? লেখ, আমি বই প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে দেব। লেখাটাই রয়ে যাবে।’ আমরা অনেক সিনিয়রের (তাদের কেউ কেউ আমাদের বিভাগের শিক্ষক) কাছে শুনেছি ‘মামুন স্যার আমার লেখা প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেছিলেন’, ‘মামুন স্যার আমার প্রথম লেখার ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন’ প্রভৃতি। এ ছাড়া সমসাময়িক অনেক গবেষককে বহুবার দেখেছি গ্রন্থের মুখবন্ধ অংশে ‘মুনতাসীর মামুন’-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে।

ক্লাসে থেকেই ক্লাসের বাইরের কিছু বিষয় শিখেছি স্যারের কাছে। একদিন ক্লাস চলাকালে স্যারের দরজায় কেউ একজন করা নাড়ল। স্যার ঐ ব্যক্তিকে ভেতরে আসবার অনুমতি দিলে ব্যক্তিটি আসলেন, স্যারের পা ধরে সালাম করলেন এবং স্যার যে ওনাকে দীর্ঘদিন আর্থিক সহযোগিতা করে গেছেন, সেজন্য বারবার স্যারের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। মামুন স্যার ঐ ব্যক্তিকে বললেন, ‘আরে রাখ, এসব কথা কেন বলছ?’ উত্তরে ব্যক্তিটি জানালেন যে, তিনি সম্প্রতি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। স্যার বললেন, ‘ভালো। তা তুমি এখন থেকে এক একজন করে দরিদ্র শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিও।’

আমরা জেনেছি, স্যার বহু বছর আগে থেকেই বিভাগের দুইজন শিক্ষার্থীকে প্রতি মাসে আর্থিক সহযোগিতা করেন। স্যার বলেছিলেন ‘কী আর বেশি করতে পারব বল! নির্দিষ্ট আয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের প্রতি দায় যতটুকু শোধ করা যায়!’ লেকচার থিয়েটারেই একদিন ক্লাস চলছে। হঠাৎ স্যার বললেন, ‘এই ফোন কলটা ধরতে হবে, জরুরি।’ আমরা শুনছিলাম, স্যার বললেন, ‘তোমার ওটা হল? বাহ! না না, দেখা করার দরকার নেই। তুমি আগে সংবাদটা তোমার মাকে জানাও। ওকে, থ্যাঙ্ক ইউ।’

আমি সাহস করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, স্যার, কী হলো? স্যার বললেন, ‘একজনের জন্য সুপারিশ করেছিলাম, তার চাকরিটা হয়েছে।’ আমি বললাম, স্যার তাতে আপনার লাভ কী? স্যার বললেন, ‘বোকা, একটা পরিবার তো বেঁচে গেল!’

ঐদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের মালির সাথে স্যারের দেখা। স্যার মালির কাছে জানতে চেয়েছিলেন স্যারের রোপণ করা গাছগুলোর অবস্থা। আমি স্যারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, স্যার, ইনি কি আপনার বাসার গাছগুলো দেখাশোনা করেন? এবার উত্তর পেয়েছিলাম ঐ মালির নিকট থেকে। মালি আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘স্যার কী শুধু উনার বাড়িতেই বাগান করেছেন; এই লেকচার থিয়েটার, কলাভবন, গিয়াস উদ্দিন আবাসিক এলাকা, পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে স্যার অন্তত একশটি দেশি ফুলের গাছ লাগিয়েছেন। বাগান বিষয়েও উনি ওস্তাদ।’

স্যারের সাথে যোগযোগটি আমার এখনো আছে। স্যারকে দেখি, স্যারকে শুনি, আর অবাক হই! চলায়, বলায়, যাপনে তিনি নিরন্তর আমাদের শেখান। তার চেয়ে বড় কথা, তিনি বলে ও করে উৎসাহ দেন, সাহস দেন অবিরাম। ডরষষরধস অৎঃযঁৎ ডধৎফ লিখেছেন, ঞযব সবফরড়পৎব ঃবধপযবৎ ঃবষষং. ঞযব মড়ড়ফ ঃবধপযবৎ বীঢ়ষধরহং. ঞযব ংঁঢ়বৎরড়ৎ ঃবধপযবৎ ফবসড়হংঃৎধঃবং. ঞযব মৎবধঃ ঃবধপযবৎ রহংঢ়রৎবং.

ডধৎফ-এর বক্তব্য অনুযায়ী ড. মুনতাসীর মামুন শেষোক্ত ঘরানার শিক্ষক। জন্মদিনে স্যারকে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।

:: মিঠুন সাহা

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj