কাজী নজরুলের কাণ্ডকারখানা

বুধবার, ২২ মে ২০১৯

জহিরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে জাতীয় কবি ঘোষণা করেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ- দুই বাংলাতেই তার কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। কবিতায় বিদ্রোহী বক্তব্যের কারণে তাকে বিদ্রোহী কবি নামে ডাকা হয়। বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। সেটি হলো ইসলামি সঙ্গীত তথা গজল। এর পাশাপাশি তিনি অনেক সুন্দর সুন্দর শ্যামাসঙ্গীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল তিন হাজারের বেশি গান রচনা এবং এর মধ্যে বেশিরভাগ গানেই সুরারোপ করেছেন।

ছোটবেলায় নজরুলকে দুখু মিয়া নামে ডাকা হলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন বেজায় খেয়ালি, দারুণ রসিক এবং ফুর্তিবাজ। সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন দারুণ প্রতিভাধর এক লেখক। লেখার জন্য তার আলাদা কোনো পরিবেশের দরকার হতো না। যে কোনো সময় যে কোনো পরিবেশেই তিনি লিখতে পারতেন মজার মজার সব লেখা। নিচে কিছু ঘটনার বর্ণনা দেয়া হলো, যেগুলোর মাধ্যমে নজরুলের প্রতিভা, খেয়ালিপনা এবং রসবোধের পরিচয় মিলবে।

নজরুল তখন ম্যাডন থিয়েটারের একজন গীতিকার এবং সুরকার। শিল্পী আব্বাস উদ্দীন একদিন সেখানে এলেন নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে। এসেই কবিকে বললেন, পাশের রুমে পিয়ারু কাওয়াল উর্দু কাওয়ালি গানের রিহার্সাল দিচ্ছেন। বাজারে এসব গান খুব চলছে। আপনিও বাংলায় এমন কিছু গান লেখেন না কেন?

নজরুলের পাশে বসে থাকা গ্রামোফোন কোম্পানির বাঙালি সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, না না, ওসব চলবে না বাজারে।

এভাবে চলে গেল কিছুদিন। কী ভেবে যেন সেই সাহেব এবার রাজি হলেন। আব্বাস উদ্দীন ছুটে গিয়ে কবিকে বললেন, কাজীদা, কর্তা রাজি হয়েছেন।

এ খবর শুনে নজরুল একটি রুমে গিয়ে ঢুকলেন। ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর ফিরে এসে বললেন, এই যে নাও।

শিল্পী আব্বাস উদ্দীন তো অবাক। এই ক’মিনিটেই নজরুল লিখে ফেলেছেন, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি। তোমরা তো জানোই, আজো এই গানটি ছাড়া আমাদের ঈদই যেন জমে না।

আরেক দিনের ঘটনা। নজরুল বারান্দায় বসে আছেন। হঠাৎ তার চোখ পড়ল ফুটফুটে সুন্দর একটি মেয়ের দিকে। নাম তার অঞ্জলি। নজরুল দেখলেন, একটা পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে চোখ-ঠোঁট উল্টিয়ে, হাত-পা নেড়ে অঞ্জলি কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। নজরুল ভাবলেন, নিশ্চয় কেউ পেয়ারা গাছে উঠেছে। তিনি ভাবলেন, গাছে যে আছে তার কাছে অঞ্জলির জন্য একটা পেয়ারা চাইবেন। কিন্তু কাছে গিয়ে গাছে কাউকেই দেখতে পেলেন না। তাহলে কার সঙ্গে কথা বলছিল অঞ্জলি?

অঞ্জলিকে জিজ্ঞেস করলেন নজরুল, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে?

অঞ্জলি বলল, কাকাবাবু! ওই দেখো দুষ্টু কাঠবেড়ালি। রোজ রোজ দুষ্টুটা পেয়ারা খেয়ে পালিয়ে যায়। আমাকে একটাও দেয় না।

কাঠবেড়ালির সঙ্গে অঞ্জলির এই মান-অভিমানের ঘটনাটি নজরুলের মনে এতটাই দাগ কাটল যে, তিনি লিখে ফেললেন ‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’ নামের কবিতাটি-

কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?

গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ?

বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও?…

অন্য একদিনের ঘটনা। ছোটদের জন্য পাঠ্যবই লিখতেন আলী আকবর সাহেব। একদিন তিনি নজরুল ইসলামকে একটি পাণ্ডুলিপি দেখিয়ে তার মতামত চাইলেন। পুরো পাণ্ডুলিপিটি পড়ে নজরুল বললেন, আপনার পাণ্ডুলিপির ছড়াগুলো ছোটদের উপযোগী হয়নি। যদি বলেন তো আমি একটা ছড়া লিখে দিতে পারি।

আলী আকবর সাহেব সম্মতি দিলেন। নজরুল তখন লিখলেন বিখ্যাত ‘লিচু চোর’ কবিতাটি-

বাবুদের তাল-পুকুরে

হাবুদের ডাল-কুকুরে

সে কি বাস করলে তাড়া,

বলি থাম একটু দাঁড়া…

আরেক দিনের কথা। কবি নজরুল তখন খুব ব্যস্ত। নিয়মিত গান লেখেন, সুর করেন, শিল্পীর কণ্ঠে গান তুলে দেন। বেশিরভাগ গান গাইছেন কে মল্লিক। একদিন গ্রামোফোন কোম্পানিতে এক লোক এলেন। লোকটির নাম প্রফেসর জি দাস। এসে ধরলেন কে মল্লিককে, তিনি গান গাইতে চান। গান গাইতে হলে তো পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষা নেওয়া হলো। ফলাফল, একেবারে অচল! গান গাইতে দেয়া হবে না শুনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন প্রফেসর। কান্নার শব্দ শুনে ছুটে এলেন কোম্পানির বড়বাবু। সব শুনে প্রফেসরকে বললেন, আপনার গলা এখনো ঠিক হয়নি। সুর-তাল-লয় ঠিক থাকছে না, কদিন পরে আবার আসুন।

প্রফেসর তখন বড়বাবুর কাছে কয়েকজনের নামে বিচার দিলেন, যারা তাকে ফুঁসলিয়ে মিষ্টি খেয়ে নিয়েছে। তারা নাকি বলেছে যে তোমার গলা ভালো হলেও কে মল্লিক হিংসা করে তোমাকে গান গাইতে দেবে না। বড়বাবু বুঝলেন যে বেচারা খুবই সহজ-সরল, তাকে যেভাবে বুঝানো হয়েছে সেভাবেই বুঝেছেন। এদিকে প্রফেসরের কান্না আর থামছেই না।

এমন সময় রুমে ঢুকলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কী ব্যাপার? জানতে চাইলেন তিনি। বড়বাবু আর কে মল্লিক তাকে সব খুলে বললেন। কবি বললেন, বেচারার থেকে যখন মিষ্টি খাওয়া হয়েছে, অতএব তার একটা গান রেকর্ড করতেই হবে।

কে মল্লিক বললেন, কী বলছেন আপনি? দেখছেন না লোকটা একটা পাগল।

কবি উত্তর দিলেন, আরে মল্লিক, আমরা বাঙালিরাও কিন্তু কম হুজুগে নই, দেশটাও হুজুগে।

এই বলে কবি প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে বললেন, শোনো, তুমি কাল এসো, তোমার গান রেকর্ড হবে।

পরদিন লোকটি এলে কবি গান রেকর্ডের সব ব্যবস্থা করলেন। বললেন, আচ্ছা, এবার গান ধরো-

কলা গাড়ি যায় ভষড় ভষড়

স্যাকরা গাড়ি যায় খচাং খচ

ইচিং বিচিং জামাই চিচিং

কুলকুচি দেয় করে ফচ…

পরের দিন কবি লিখে আনলেন আরেকটি গান। বাজারে ছাড়া হলো গান দুটো। দুয়েকদিন পর কে মল্লিককে ডেকে বললেন কবি, একটু দেখে আসুন তো কেমন বিক্রি হচ্ছে?

মল্লিক হাসতে হাসতে বললেন, কাজীদা, খুব বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা কিনছে আর গাইছে, কলা গাড়ি যায় ভষড় ভষড়…

কোম্পানির ম্যানেজার তো দারুণ খুশি। তিনি নজরুলকে বললেন তার কণ্ঠে আরো গান রেকর্ড করতে। কবি বললেন, হুজুগের দেশে এসব একবারই চলে। বলেই তিনি হাসিতে ফেটে পড়লেন।

কবি সুফিয়া কামাল কাজী নজরুল ইসলামকে ডাকতেন দাদু বলে। কবি প্রায়ই সুফিয়া কামালের বাড়ি যেতেন। সেখানে গানের আসর বসত। সে আসরে সাহিত্য অনুরাগী অনেকেই থাকতেন। এ সময় নজরুলের পেছনে গোয়েন্দা লাগে। সাহিত্য অনুরাগীদের সঙ্গে মিশে কয়েকজন গোয়েন্দাও সেখানে আসতেন। একদিন এক ভদ্রলোকের মুখের ওপর নজরুল কবিতা আওড়ালেন, তুমি টিকটিকি জানি ঠিকঠিকই।

কবিতার ধরন শুনে লোকটি মুখ লাল করে উঠে যেতেই কিশোরী সুফিয়া কামাল অবাক হয়ে বললেন, দাদু। তুমি একে চিনলে কী করে?

গায়ের গন্ধে। বড়কুটুম যে। নজরুলের উত্তর।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj