একজন জহিরন বেওয়া

সোমবার, ২০ মে ২০১৯

অন্যপক্ষ প্রতিবেদক : জহিরন বেওয়া। লালমনিরহাটের তালুক দুলালী কিংবা আশপাশের গ্রামে এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার যে ৯৫ বছর বয়সী এই নারীকে চেনেন না। সবাই জহিরনকে ‘নানি’ বলে সম্বোধন করেন। এই বয়সেও সাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন ছুটে বেড়ান গ্রামের পর গ্রাম মাইলের পর মাইল। তবে এ কাজটি যে তিনি এমনি এমনি করেন এমনটি নয়। কারো অসুস্থতার সংবাদ পেলে নাওয়া-খাওয়া ভুলে বাইসাইকেলে চড়ে ছুটে যান সেই রোগীর বাড়িতে। চিকিৎসাসেবা দিতে। দীর্ঘ ৪৪/৪৫ বছর ধরে গ্রামের অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন এই নারী। এই বয়সে এসে একটুও কমেনি তার উদ্যম, সাহস কিংবা কর্মদক্ষতা।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ভারত সীমান্ত ঘেঁষা তালুক দুলালী গ্রামের বাসিন্দা জহিরন। স্বামী সায়েদ আলী মারা যান ১৯৬৮ সালে। সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে কী করবেন, কোথায় যাবেন এই ভাবনায় শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন জহিরন। কিন্তু দমে যাননি। সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ভেঙে ১৯৭৩ সালে জহিরন পরিবার পরিকল্পনার অধীনে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নেন। পরে চুক্তিভিত্তিক মাসিক মজুরিতে কাজে যোগ দেন। নিজ গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে সাইকেল চালিয়ে গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া শুরু করেন। দুইশ থেকে তিনশ অবশেষে পাঁচশ টাকা মাসিক মজুরি পেয়ে ১০ বছর চাকরি করে অবসরে যান জহিরন। চাকরি বাদ দিলেও মানুষের প্রয়োজনে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই চলছেন তিনি। তাই বাড়িতে বসে না থেকে গ্রামবাসীর স্বাস্থ্যসেবায় মনোযোগী হয়ে উঠেন জহিরন। এখনো কাজ করছেন হাসি মুখে। আদিতমারী উপজেলার ৩০টি গ্রামে দুই হাজারের বেশি পরিবারের সঙ্গে জহিরনের রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে কমপক্ষে ৭টি গ্রামে ৭০টি বাড়িতে যান তিনি। তাদের খোঁজখবর নেন। গ্রামের লোকজনের কাছে তার বেশ সুনাম রয়েছে।

জহিরন জানান, সাধারণ রোগ যেমন- জ্বর, মাথাব্যথা, বমি শারীরিক দুর্বলতাসহ রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন তিনি। এর জন্য তিনি কোনো টাকা নেন না। তবে বাজারমূল্যে তাদের কাছে ওষুধ বিক্রি করে প্রতিদিন তার গড়ে দেড়শ’ টাকা আয় হয়। জহিরন বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে স্বামী মারা গেছে। এরপর আমি একটি হাসপাতালে নার্সের চাকরি করি। ওখানে কোনো কাজের কি ওষুধ, তা আমাকে বুজিয়ে দিয়েছিল। আমি নিজেও ট্রেনিং নিছি। ১০ বছর পরে আমার চাকরিটা চলে গেল। পরে আমি একটা বাইসাইকেল কিনি। সাইকেল চালিয়ে এলাকার মানুষকে সেবা দিতে শুরু করি। মানুষ আমাকে বাসায় যেতে বলে, আমি তাদের বাসায় গিয়ে সেবা দিয়ে আসি। এতে মানুষের উপকার হয়। এলাকাবাসী আমার সাইকেল চালানোকে ভালোভাবে নেয়নি। আমি যখন সাইকেল চালানো শিখি, তখল গ্রামের কোনো মেয়ে সাইকেল চালাতে পারত না। তা নিয়ে আমি অনেক কথা শুনেছি। মানুষ আমাকে নিয়ে অনেক হাসি হাট্টা করত। তারপরও আমি আমার কাজ করে গেছি।

মানুষের দোরগোড়ায় শুধু স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়াই নয়, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি নারীর প্রতি অবিচার রোধ, শিক্ষা আর পছন্দানুযায়ী পেশা নির্বাচনের সুযোগ নিয়েও কাজ করছেন জহিরন। এই সংগ্রামী নারীর একটাই ইচ্ছা, জীবনের বাকি দিনগুলোও তিনি মানুষের সেবা করে যেতে চান। কাজ করে যেতে চান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj