মায়ের বাজেট

সোমবার, ২০ মে ২০১৯

এ এইচ এম নোমান

শতবর্ষ পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের আনা জারভিস মায়েদের অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য সচেতন করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ১৯০৫ সালে আনা জারভিস মারা গেলে তার মেয়ে আনা মারিয়া রিভস জারভিস মায়ের কাজকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তার সান ডে স্কুলে প্রথম এ দিনটি মাতৃ-দিবস হিসেবে পালন করেন। ১৯০৭ সালের এক রবিবার আনা মারিয়া স্কুলের বক্তব্যে মায়ের জন্য একটি দিবসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। ১৯১৪ সালের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেস মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এভাবেই শুরু হয় বিশ্ব মা দিবসের যাত্রা।

শুধু স্বাস্থ্য সচেতনতা নয় বরং সার্বিক উন্নয়ন ও সামগ্রিক কল্যাণে পরিকল্পিত কাঠামোর মাধ্যমে মাতৃত্বকে কেন্দ্র করে দেশজ ধারণায় বাংলাদেশে মা দিবসের এ বছর ১৪ বছর। ২০০৫ সালের বিশ্ব মা দিবসে বেসরকারি সংগঠন ‘র্ডপ’ এর উদ্যোগে মাত্র একশ জন দরিদ্র মাকে চিহ্নিত করে মাতৃত্বকালীন ভাতা দেয়া শুরু করে। পরে বিভিন্ন দেন দরবার ও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২০০৭-০৮ অর্থবছরে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কার্যক্রম চালু করে। প্রথমে দেশের ৩ হাজার ইউনিয়নে ৪৫ হাজার মাকে তিনশ টাকা হারে এই ভাতা দেয়া শুরু হয়। তারই সফল ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকার সারাদেশে মাসে আটশ টাকা করে দুই বছরের পরিবর্তে তিন বছর পর্যন্ত, বছরে প্রায় ছয় লাখ মাকে এই ভাতা দিচ্ছে। এতে বাল্যবিবাহ, তালাক ও যৌতুক রোধ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জন্ম নিবন্ধন, পুষ্টিকর খাদ্য, শিশুকে বুকের দুধ পান ও বিবাহ নিবন্ধনে উৎসাহিত হচ্ছে। ভাতা প্রাপ্তির ৭টি শর্ত আছে। যা হলো- প্রথম বা দ্বিতীয় গর্ভধারণকাল যে কোনো একবার, বয়স কমপক্ষে ২০ বছর বা তার বেশি, মোট মাসিক আয় ১৫শ টাকার কম, দরিদ্র পরিবারের প্রধান রোজগারি নারী, দরিদ্র প্রতিবন্ধী মা, কেবল বসতবাড়ি রয়েছে বা অন্যের জায়গায় বাস করে এবং নিজের বা পরিবারের কোনো কৃষিজমি, মৎস্য আবাদের জন্য পুকুর বা কোনো পশুসম্পদ নেই।

প্রশ্ন দাঁড়ায় তিন বছরের মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রাপ্তির পর এই মা-বাবা, শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থানসহ মৌলিক চাহিদা/অধিকার প্রাপ্তিসহ ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের উত্তর কি? এ প্রশ্ন উত্তর এর নামই হলো ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা কেন্দ্রিক ‘স্বপ্ন’ প্যাকেজ’। ‘স্বপ্ন’ মূলে ইংরেজি বাক্য যা ঝড়পরধষ অংংরংঃধহপব চৎড়মৎধস ভড়ৎ ঘড়হ-অংংবঃবৎং- ঝঅচঘঅ। স্বপ্ন প্যাকেজ বটমলাইনিং মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত মায়েদের ভিত ধরেই হয়। র্ডপ’ই প্রথম ২০ বছর এক প্রজন্ম মেয়াদে মা-জাতের স্পেনের মহামান্য রানী সোফিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় অঊঈওউ’র প্রায় সাত কোটি টাকার আর্থিক সহায়তায় ২ ধাপে ২০০৯-১২ সালে পাঁচটি উপজেলায় জেন্ডার ভিত্তিক ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ ৯৯২ হাজার মাকে নিয়ে বাস্তবায়ন করেছে।

পরবর্তী সময় সরকারের মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের আওতায় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ২০১৫-১৬ সালে মাতৃত্বকে বটম লাইন ধরে এর অভূতপূর্ব পূর্বাপর ও দৃশ্যত সফলতার ধারাবাহিকতায় ভৌগোলিক-অর্থনৈতিক প্রতিনিধিত্বকারী দেশের ১০টি উপজেলায় সাতশ মাকে নিয়ে স্বপ্ন প্যাকেজ পাইলট আকারে বাস্তবায়ন করে। স্বপ্ন প্যাকেজে আছে- স্বাস্থ্য-পুষ্টি ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ কার্ড, শিক্ষা সংস্কৃতি ও বিনোদন কার্ড, কম-বেশি ৩০ হাজার টাকা মূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত একটি ল্যাট্রিনসহ বসতঘর, ৩০ হাজার টাকার আয় রোজগারমূলক কাজের জন্য জীবিকায়ন উপকরণ/সরঞ্জাম, সঞ্চয় পরিবেশ ও প্রয়োজনে উন্নয়ন ঋণ, পাবলিক (স্থানীয় সরকার) পুয়র (মা) প্রাইভেট (এনজিও-র্ডপ) পার্টনারশিপের (পিপিপিপি) মাধ্যমে ছাপান ও লিখিত চুক্তিতে উপজেলা, ইউনিয়ন, এনজিও ও মাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি ও দস্তখতের মাধ্যমে স্বপ্ন প্যাকেজ হস্তান্তর করা হয়। টেকসই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ইউনিয়ন-উপজেলার সব ‘স্বপ্ন-মা’ মিলে ‘মা-সংসদ’ গঠন করে তার মাধ্যমে নিজেদের কর্মসূচির সার্বিক কর্মকাণ্ড, অধিকার জেনে স্থানীয় সরকার তথা কেন্দ্রীয় সরকার অংশীদারির মাধ্যমে সমস্যা সমাধান হচ্ছে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj