আমার মা, আমাদের মা

সোমবার, ২০ মে ২০১৯

অমরেশ রায়

গত ১২ মে রবিবার ছিল বিশ্ব মা দিবস। এবারের মা দিবস আমার ও আমার অন্য পাঁচ ভাইয়ের জন্য ছিল বিশেষ আনন্দের, আমৃত্যু স্মরণ রাখার মতো একটি দিন। এই দিনটিতেই আমার অসুস্থ মা নির্মলা রানী রায় (৭১) ‘রতœগর্ভা মা-২০১৮’ দিবস হিসেবে সম্মাননা পেলেন। এবার মোট ৩৫ জন মা ‘রতœগর্ভা মা’- এর এই বিরল সম্মাননা পেয়েছেন। ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এই চৌধুরী সেন্টারে আড়ম্বরপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ৩৫ জন মায়ের হাতে তুলে দেয়া হয় আজাদ প্রোডাক্টস প্রবর্তিত এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা। এই অনুভূতি, এই গৌরবগাঁথা- লিখে প্রকাশ করার মতো নয়। এমন একটি মায়ের জন্য গর্বের কথার প্রকাশ কেবল অন্তরের ভেতর থেকে উপলব্ধিই করা যায়, ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করা যায় না।

মা এতটাই অসুস্থ যে গত চার বছর ধরে তার চলাফেরা হুইল চেয়ারেই সীমিত হয়ে পড়েছে। ডায়াবেটিসের প্রতিক্রিয়ায় চোখেও ঠিকমতো দেখতে পান না। এমন একটা অসুস্থ মানুষকে ঠিকঠাক মতো অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে এসে তার প্রাপ্য সম্মানটা বুঝিয়ে দেয়াটাও ছিল আমাদের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের, অনেক কষ্টের। মায়ের অসুস্থতার কারণে তার আবাসস্থল সেই সুদূর ফরিদপুর থেকে ঢাকা পর্যন্ত পুরোটা পথই তাকে আসতে হয়েছে অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে শুয়ে।

১৬ বছর বয়সে আমার মায়ের বিয়ে হয়। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তার শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয়। ১৭ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের মা হন তিনি। এরপর একে একে আরো পাঁচটি ছেলের (যমজ ছেলেও আছে) মা যখন হন, তখন এই মায়ের বয়স ২৫ বছরও পেরোয়নি। পিঠাপিঠি ছয়টি ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে, উচ্চশিক্ষিত করাতে গিয়ে, কর্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করাতে গিয়ে কী পরিমাণ কষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করেছেন- সেটা আরেক ইতিহাস।

আমার বাবা প্রয়াত অর্দ্ধেন্দু শেখর রায় ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীনের আগে থেকে সরকারি চাকরিজীবী বাবা তার অল্পবয়সী স্ত্রীর হাতে সংসারভার সঁপে দিয়ে নিজের কর্মক্ষেত্র নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। আর নিজের সুখ-শান্তি অনেকটাই বিসর্জন দিয়ে মাও হাসিমুখে সংসার সামলে গিয়েছেন। ২০০০ সালে বাবা মারা গেলেন। বাবার অবর্তমানে গত ১৯ বছর আমাদের প্রতিষ্ঠার পথের বাকি কাজটুকু করে গেছেন আমার মা-ই।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মায়ের অন্যরকম এক ত্যাগ স্বীকারের কথাটাও একটু বলি। ১৯৭১ সালে আমার বাবা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের আওতাধীন সমবায় বিভাগের পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তিনি অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন এবং তার তৎকালীন কর্মস্থল কুষ্টিয়ার স্থানীয় সংসদ সদস্য মরহুম গোলাম কিবরিয়ার নির্দেশে পাকিস্তাানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এর মাত্র কিছুদিন আগেই বাবা বরিশাল থেকে কুষ্টিয়ার কর্মস্থলে যোগ দেয়ার কারণে মা তখনো তার একটি নবজাতকসহ তিনটি ছোট ছোট ছেলে (বাকি তিনজনের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পর) এবং দুই কিশোরী ননদকে নিয়ে বাবার আগের কর্মস্থল বরিশাল শহরের ভাড়াবাসায় অবস্থান করছিলেন। পাকবাহিনীর নৃশংসতায় বরিশালের বাসার আশপাশের বেশিরভাগ মানুষই তখন পালিয়ে ভারতে চলে গেছেন। মে মাসের মধ্যভাগে বাবার এক সহকর্মীর সহযোগিতায় আমার মা অনেকটা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নিজের বাবার বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার হাসামদিয়া গ্রামে পৌঁছান অনেকটা বিধ্বস্ত অবস্থায়। এদিকে ২৫ মার্চের গণহত্যার পর বাবা ২৬ মার্চ থেকে কুষ্টিয়ায় পাক বাহিনীকে বিতারণ ও নিশ্চিহ্ন করার করার কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পরে পাক বাহিনীর অমানুষিক অত্যাচারের কারণে ২৩ মে জন্মভূমি ছেড়ে ভারতে যান। ২৭ মে মুজিবনগর সরকারে যোগদান এবং লিখিতভাবে আনুগত্য স্বীকার করেন। বাবা ওই সময় থেকে সরকারের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন ও তাদের ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশে প্রবেশের কাজে লিপ্ত থাকেন এবং সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। একই সঙ্গে ভারতের নদীয়ায় শরণার্থী শিবিরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। অন্যদিকে আমার মা পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারে অন্যদের নিয়ে আমার দাদু বাড়ি হাসামদিয়া গ্রাম থেকে পালিয়ে দাদুর আদিনিবাস বাড়ি প্রত্যন্ত গ্রাম চণ্ডিদাসদীতে গিয়ে বেঁচে থাকার অন্যরকম সংগ্রাম শুরু করেন। আরো পরে বাবা আমার বড় জ্যাঠা মশাইকে মায়ের বাবার বাড়ি পাঠান মা আর তিন শিশুসন্তানকে সেখান থেকে ভারতে নিয়ে যেতে। বাবা ততদিনে ভারতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বাঙালি শরণার্থী ক্যাম্পের দায়িত্ব নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিন শিশু সন্তান আর পরিবারের অন্যদের নিয়ে মা আমার কখনো নৌকা, কখনো বাসে, কখনো দীর্ঘপথে হেঁটে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে ভারতের মাটিতে পা দেন। এরপরের টানা কয়েকটা মাস ভারতে অবস্থান শেষে স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে মায়ের নতুন জীবনসংগ্রাম শুরু হয়। যুদ্ধের পর জন্ম নেয়া আরো তিনটি ছেলেসহ মোট ছয়টি ছেলেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে তার সেই সংগ্রামের অবসান হলেও আজো তিনি সন্তানদের মাথার ওপরের ছাতা হিসেবেই আছেন।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj