আকস্মিক ঘূর্ণিঝড় তিন জেলায় ৪০০ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত

শনিবার, ১৮ মে ২০১৯

কাগজ ডেস্ক : আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে নোয়াখালী, ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে প্রায় ৪০০ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ও গতকাল শুক্রবার ভোরের স্বল্পকাল স্থায়ী এ ঝড়ে বহু পরিবার গৃহহীন হয়, অসংখ্য গাছপালা উপড়ে এবং বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ে। ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ সম্পর্কে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট-

নোয়াখালী : জেলার কবিরহাট উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল মন্নান মুনাফ বলেন, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ বজ্রপাতসহ প্রবল ঝড় শুরু হলে ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডে ৫০টিরও বেশি কাঁচা ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়। এতে গৃহহীন হয়ে পড়ে ৩০টির মতো পরিবার। সরেজমিনে উত্তর জগাদানন্দ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রবল ঝড়ে জেসমিন আক্তার, নুরুজ্জামান, জিয়াউল হক, জসিম উদ্দিন, আবদুল মুনাফ, আবুল হাসেম, আক্কাছ মিয়া ও মমিন উল্যাসহ প্রায় ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরো ২০টির মতো পরিবার। ক্ষতিগ্রস্তরা খোলা আকাশের নিচে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরীফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা প্রস্তুতের জন্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তালিকা প্রস্তুতের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় আকস্মিক ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে একটি গ্রাম। এতে ওই গ্রামের ১৮টি পরিবারের প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। সকালে উপজেলার শুকানপুকুরী ইউনিয়নের বাংরোড গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বাংরোড গ্রামের ১৮টি পরিবারের প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অসংখ্য গাছপালা উপড়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সংযোগ। মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে বিভিন্ন ফসল।

স্থানীয়রা জানান, সকাল ৭টার দিকে হঠাৎ করে বাংরোড গ্রামে আকস্মিকভাবে ঝড় আঘাত হানে। ৪ থেকে ৫ মিনিট স্থায়ী ছিল ঝড়টি। এই অল্প সময়ের মধ্যে গ্রামের ১৮টি পরিবারের প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে নুর হক, খেলাফত, কান্দরু, শফিকুল ইসলাম, মোশারফ হোসেন, আব্দুল করিম, আব্দুর রহিম, অনিল চন্দ্র, সুধীর ঘোষ ও ঋষিকান্তের ঘরবাড়ি একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত শফিকুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ করেই প্রচণ্ড বেগে ঝড় আঘাত হানে। ঝড়টি মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। কিন্তু এতেই সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। আহত হয়েছে অন্তত ১০ জন। ঋষিকান্ত রায় বলেন, হঠাৎ ঝড়ের আঘাতে আমার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। শুধু আমার নয় গ্রামের ১৮টি পরিবারের পাকা, আধা পাকা, কাঁচা বাড়িঘর লণ্ডভণ্ড করে ফেলে এবং সহ¯্রাধিক গাছপালা উপড়ে ফেলে ঝড়।

অনিল চন্দ্র বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। হঠাৎ ঝড়ের কারণে বাংরোড গ্রামে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে তার ধারণা।

শুকানপুকুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান বলেন, হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়ে বাংরোড গ্রামে ১৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে ১০টি পরিবার একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের আপাতত চাল দেয়া হবে, পরে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে সর্বাত্মক সহায়তা দেয়া হবে।

পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি : রংপুরের পীরগাছায় গতকাল শুক্রবার ভোরে টর্নেডো ও শিলাবৃষ্টির আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ২০টি গ্রামের ২ শতাধিক ঘরবাড়িসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছপালা, বিনষ্ট হয়েছে শাক-সবজি, কলা, ভুট্টার ক্ষেত। এ ছাড়াও বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে ও অর্ধশত স্থানে তার ছিঁড়ে সারাদিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও দুর্বল হয়ে পড়ে। সকাল থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ মাহবুবার রহমান, নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন প্রধান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ দিনভর ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো পরিদর্শন করেন। সরকারিভাবে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

গতকাল শুক্রবার ভোরে উপজেলার পীরগাছা, কৈকুড়ী, পারুল, কান্দিসহ বেশ কটি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে টর্নেডো ও শিলাঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। ঝড়ে পীরগাছার অনন্তরাম বড়বাড়ি, উচাপাড়া, বড় পানসিয়া দোলাপাড়া, তালুক ইসাদ, কুমারপাড়া, চণ্ডিপুর, পারুলের মনুরছড়া, মহিষমুড়ি, ত্রিপুর, সুন্দর, সেচাকান্দি, কৈকুড়ীর রামচন্দ্রপাড়া, চালুনিয়া, দিলালপাড়া, আলাদিপাড়া, কান্দির চাপড়া, হরিদেবসহ ২০ গ্রামের ২ শতাধিক ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, অসংখ্য গাছপালা ভেঙে পড়ে ব্যাপক ক্ষতি, ১০ হেক্টর জমির পাকা ধান, ২ হেক্টর ভুট্টাক্ষেত, ২ হেক্টর কলাক্ষেত, ৫ হেক্টর জমির শাকসবজির ক্ষেতসহ কান্দিরহাট স্কুল এন্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অপরদিকে প্রায় ২০টি স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে ও অর্ধশত স্থানে তার ছিঁড়ে দিনভর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে।

পীরগাছা ইউনিয়নের অনন্তরাম বড়বাড়ি গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে রবিউল ইসলাম জানান, গতকাল শুক্রবার ভোরে হঠাৎ টর্নেডো আঘাত হানলে তার নিজের ঘরসহ ওই গ্রামের অনেকের ঘরবাড়ির চালা উড়ে গেছে। বড় পানসিয়া গ্রামের ময়নুল ইসলাম জানান, তার ঘরের ওপর একটি বড় গাছ পড়ে গেছে। এতে তার দুটি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। তিনি নিজেও পরিবারসহ অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।

কান্দিরহাট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানের একটি বড় গাছ পড়ে গিয়ে একটি দালান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ পীরগাছা জোনাল অফিসের এজিএম (কম) মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, টর্নেডোর আঘাতে পীরগাছা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে গেছে। এ ছাড়া ৪০/৫০টি স্পটে তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার চেষ্টা চলছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, টর্নেডো ও শিলাবৃষ্টির আঘাতে পাকা ধানসহ পাট, ভুট্টা, কলাসহ রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ জানান, ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ শুরু করা হয়েছে।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj