অভিবাদন অন্তরবাদ্যি

শনিবার, ১৮ মে ২০১৯

মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

ভোরের কাগজ পাঠক ফোরামের অন্তরবাদ্যি একটি অনবদ্য প্লাটফরম। যেখানে একজন পাঠক তার কোকুনের খোলস ছেড়ে কীভাবে যেন লেখকের শুককীট হিসেবে পৃথিবীর আলো দেখতে শুরু করে। তারপর পঁচিশটা বছরের উড়ে চলা প্রজাপতি।

প্রচ্ছদকার পীযূষ দস্তিদারের প্রখর চিন্তাশৈলী আর রংয়ের কারিশমা। প্রচ্ছদে রজতজয়ন্তীর লোগো এবং সালটা উল্লেখ থাকলে ভালো হতো। কারণ এটি একটি ডকুমেন্ট। আগামী প্রজন্মান্তর হয়তো এর ইতিহাসকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে নেবে।

ধারাবাহিক বিধৃত সিঁড়িগুলো ধরে এগোলেই সূচিপত্রের অভিনবত্ব চোখে পড়ে। সম্পাদকীয়, যোগসূত্র, স্মরণালেখ্য, আলোকমালার ঝলক, গল্পের উঠোন, রসরচনা, কাব্যশৈলী, জীবনগদ্য, ছন্দবাদ্যি, দেশভাবনা, স্মৃতিঘর, স্বপ্নমঙ্গল- এভাবেই নামগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা লিখিয়েদের মেধাবী লেখার আলোর স্ফুরণ দেখা যাবে অন্তরবাদ্যিতে। পাঠক নিশ্চয়ই খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যাবেন যা তিনি অনুসন্ধান করে চলেছেন।

ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্তের মূল্যবান কথাটি লেখকের জীবনে পাথেয় হতে পারে- পাঠক কতখানি নিচ্ছে, তার চাইতেও বেশি জরুরি এই বিশ্লেষণ করা যে; আমি কতখানি পাঠকের হাতে পৌঁছতে পারছি।

জীবনের অমোঘ নিয়মে পাঠক ফোরামের স্বপ্নদ্রষ্টা সঞ্জীব দা এখন কেবলি ছবি। পাফোসের অন্তরবাদ্যি তার জন্য। সিলেট পরিবারের সি এম মারুফ ভাইয়ের উদ্দেশে স্মৃতিতর্পণে সজল ঘোষের শোকাবহ লেখনির প্রতি সহানুভূতিশীল হতেই হয়। এই শোক সব পাঠকের, সব পাফোসের।

ভোলানাথ পোদ্দারের বক্তব্যধর্মী প্রতীত বিষয়টি নাড়া দিল- আমার এখন বন্দিজীবন চলছে।

আমরা আসলেই কোনো না কোনো বলয়ে বন্দিত্ব বরণ করছি। লেখক সুমন্ত আসলামের চিন্তা আরো ধারালো- যদিও আমরা গোলাকার পৃথিবীর মধ্যেই বাস করছি, কিন্তু আমাদের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। এই ব্যবধানকে পাফো দূর করতে পারবে কী? প্রশ্নটা থেকেই যায়।

মনে নাড়া দিলেন দন্ত্যস সফিক, তানভীর আহমেদ হৃদয়, ইয়াকুব রানা, পাপন বড়ুয়া, রেজাউর রহমান সবুজ, হারুন আল রশিদ ফয়সাল, জয়দীপ দে, মাইনুল এইচ সিরাজী, মরিযাদ হারুণ ও মো. বোরহান উদ্দিন।

দারুণ কিছু গল্পের স্বকীয় গাঁথুনি আর সৌকুমার্য নির্মাণকাজ মুগ্ধকর। হিমু আকরাম, উজ্জ্বল ধর, শ্যামল কুমার

সরকার, ওমর ফারুক দোলা, মোর্জিনা মতিন কবিতা- যাদের বিস্মকর শব্দচয়ন, উপমার কাছে আমি হেরে যাই। বারবার পড়ার জন্য মোহময় আহ্বান লেখায় লেখায়।

রেজা য়ারিফের রসমঞ্জরীতে হাবডুবুই খেলাম মনে হয়। শেষ পর্যন্ত হতাশ, যারা গায়ানা সুরিনাম যাবো ভাবছি, তারাও সন্ত্রস্ত।

কবিতার সংখ্যা হতাশ করেছে। মুহাম্মদ দিদারুল আলমের বাসন্তিকার জলদগম্ভীর ভেজা কাব্যপাঠক হয়তো কিছুটা তৃপ্তিকর নিঃশ্বাস নেবেন। তিলোত্তমা পালের সদৃপ্ত উচ্চারণকে স্যালুট। ভালো লিখেছেন শেখ আহমেদ ফরহাদ।

স্মৃতিঘরের আয়তনে বন্ধুদের স্মৃতি রোমন্থন, আর্তিভরা রোদেলা আহ্বান একটাই- বন্ধুত্বের যোজন যোজন বন্ধন অক্ষুণœ রাখা।

উষ্ণ আলিঙ্গনপাশ ছিন্ন করে যে কেউ হয়তো দূরে চলে যায় কিন্তু জীবনের কোরক উপচানো আবেগ তার জ্যোতি হারায় না। কেবলি লেখালেখি নয়, পাঠকবন্ধুদের রাজনীতিসচেতন আঙ্গিকে নবতর প্রয়াসের সামনে সব সামাজিক, প্রশাসনিক, রাষ্ট্রিক বাধাও হয়ে যায় তুচ্ছ। নরম গরম কর্মসূচিতে আধুনিকতার নানান আবহ পাফোর ক্ষেত্রে সমুন্নত।

এই আঙ্গিনায় বসতকারী আরিফ জেবতিক, অজন্তা ইলোরা চাকমা- ভ্রাম্যমাণ কথকের মতো সারাদেশের পাফোসদের লেখা, সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে বেশ সাবলীল উচ্চারণে ঋদ্ধ করে গেছেন। নষ্টালজিয়ায় ভুগছেন অরুণাভ চৌধুরী শিমুল, রশীদা আফরোজের দায়িক পরিকল্পনা আর চিন্তন সত্তা অমোঘ, বিনায়ক শুভ, তিলোত্তমা পালের শিল্পী সংগ্রামী ডামাডোলে বেড়ে ওঠা লেখনীতে সমাজবাস্তবতা থরে থরে সাজানো, যা এখনো গায়ের রোমগুলোতে প্রচণ্ড ঝাঁকি দেয়। এস এম আজাদ হোসেনের আত্মচয়ন স্মৃতির পরিলিখিত শাব্দিক অলিগলিতে সূর্যালোক সমাপতিত। জালালউদ্দিন সাগরের গল্পের পুনর্মুদ্রণ দিয়ে সত্যিকারের অন্তরবাদ্যি যেন জাগিয়ে যায় আমাদের অলস ঘুমক মননের আবদ্ধ বাতাসটা।

ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, জাহান পন্না কিমি, খায়রুন্নেসা রিমি, দেবাঞ্জন শিপলুর ঝলসে ওঠা লেখনির সামনে আমার নিষ্প্রভ পাঠক মন সবসময়ই শঙ্কিত থাকে। আসলে তাদের লেখাগুলোর সমালোচক হওয়ার মতো আমার দুঃসাহস, মেধা কোনোটাই নেই। কারণ আমি এখনো লেখার চেষ্টা করে চলেছি। কিন্তু কোথায় যেন একটা সীমাবদ্ধতা। পারছি না তা ডিঙ্গাতে।

ছন্দে ছন্দে আনন্দঘন ছড়াকবিতায় নুরুল আমিন হৃদয় বেশ রস জুগিয়েছেন। সিক্ত হলাম।

দেশভাবনায় ইখতিয়ার উদ্দিন, বিনয় ভূষণ তালুকদার ছাড়াও অল্প কথায় সাদাফ জালালের লেখায় চোখ আটকে গেল।

সম্মানিত সংগঠকদের লেখায় সমৃদ্ধ নিজ নিজ অধিবৃত্তে রোপিত চমকপ্রদ কিছু গোলাপ ফুটিয়ে গেছেন তারা। নামগুলো আলাদা করে লেখার প্রয়োজন বোধ করছি না। কেবল মনে করি এই লেখাগুলো তরুণদের বেশি বেশি পড়া ও আত্মস্থ করা দরকার। আর এখানে সম্পাদকীয় ডেস্কের জবানবন্দি বিষয়টিতে অভিভূত হতেই হয়। আর শেষে মুকুল শাহরিয়ারের স্বপ্নমঙ্গল আমাদের সামনে বাতিঘর হিসেবে কাজ করবে নিশ্চয়ই।

অন্তরবাদ্যিতে গ্রাফিকসগুলো বরাবরের মতোই দুর্লভ, বহুমাত্রিক, শৈল্পিক ভাবনায় উত্তীর্ণ, প্রাঞ্জল। বুঝতে গেলে ঝানু দর্শক হতে হয় বৈকি।

আমরা পাঠক এখনো। মিডিয়া আর ভার্চুয়াল জগতের হাতছানির সামনে হলুদ খামে জিহ্বা দিয়ে আঠার বিকল্প করা, লেখা খামে পুরার অভিজ্ঞতার ডাকবাক্সটা হয়তো একদিন উধাও হবে (ইতোমধ্যে মৃত অনেকের কাছে), সেখানে ছাপানো সংকলনের লেখাটা পড়ার অদম্য পিপাসা মেটাতে পারবে অন্তরবাদ্যি। তবে প্রশ্নটা আমিও করি, সংকলনটি কেউ কি অন্ততপক্ষে একবার খতম দিয়েছেন? আমি অন্তত বলতে পারি সংকলনে আমার লেখাটি পড়েছেন এমন একজন পাঠকও এখন পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া দেখাননি। অবশ্য আমারটাই যে পড়তে হবে এমন তো কথা নেই।

সবকিছু নিয়ে কথা থাকতে নেই…

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj