মা ও মনার ঘোরাঘুরি

শনিবার, ১৮ মে ২০১৯

রহিমা আক্তার মৌ

– আচ্ছা মা তুমি আমার সঙ্গে আজ এক জায়গায় যাবে।

– কোথায়?

– বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে।

– এটা আবার কোথায়? ওখানে তোর আবার কাজ কী?

– মা এটা হলো আমাদের দেশের একটা বিখ্যাত জায়গা, অনেক অনেক বই। তুমি দেখোনি গাড়িতে করে বই নিয়ে যায় মহল্লায় মহল্লায়। অনেকে গাড়ি থেকে বই নিয়ে পড়ে, আবার ফেরত দেয়।

– না তো দেখিনি।

– আচ্ছা চলো আজ আমার সঙ্গে, সব দেখাব।

– ঠিক আছে যাব।

সঙ্গে সঙ্গে মনা (রহিমা আক্তার মৌ) ফেসবুকে স্টেটাস দেয়, ‘আমিও আসছি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে, সঙ্গে থাকবে আমার মা।’

প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই চলে আসে মনা ও মা। মাকে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের এপাশ ওপাশ ঘুরিয়ে দেখায়।

– জানো মা যিনি এই কেন্দ্রটি স্থাপন করেছেন তার নাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

– উনি কি বেঁচে আছেন।

– হ্যাঁ মা স্যার বেঁচে আছেন, দোয়া করো স্যার যেন অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকেন। জানো মা স্যার খুব মাটির মানুষ, সেদিন দেখা হয়েছিল। এমন ভালো মানুষ খুব কম হয়। সবার মাঝে জ্ঞানের আলো পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রোগ্রাম শুরু হবে এখুনি, চলো আমরা ওখানে যাই। হল রুমে অনেকে এসেছে, পাশাপাশি বসে মা ও মনা। উপস্থিত বইতে সই করে দুজনই। এরই মাঝে অনেকেই জেনে গেছে মনা আজ মাকে নিয়ে এসেছে। কেউ কেউ এসে হ্যালো বলে মনাকে, মাকে সালাম দেয় পরিচয় দেয়, সামনে স্টেজে ঘোষণা হলো অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার। সবাই নীরবতা পালন করছে।

একজন একজন করে নাম ঘোষণা হচ্ছে। তারা এক এক করে স্টেজে যাচ্ছে, কেউ ছড়া কেউ নিজের লেখা কবিতা পড়ছে, কেউ আবার বিখ্যাত কবিদের কবিতা আবৃত্তি করছে। মিনিট ৩০ পর মনার নাম ঘোষণা করা হলো, মনা মায়ের পাশ থেকে উঠে স্টেজে যায়। চোখের কোণে ভাসে মায়ের সেই কথাগুলো, ছোট বেলাটা কেমন ছিল মা ও মনার। মা সামনে বসা, মনা স্টেজে। মাকে নিয়ে বলা কথা শুনে মা মিটি মিটি হাসে, আর ভাবে…

এই কি আমার সেই মনা, যে মনার দুষ্টুমিতেও পুরো বাড়ির কেউ বকা দিতে পারত না। এটি আমার সেই মনা সে মনা পড়ায় খুব ফাঁকিবাজ ছিল। পড়া থেকে উঠে আমার হাতের কাজ করত। গরমের দিনে চুপে চুপে দাদাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করত। স্কুল থেকে ফেরার পথে পুরো গ্রামের সব খবর নিয়ে ফিরত। আমার সেই মনা আজ স্টেজে দাঁড়িয়ে আছে, আবার নিজের লেখা কবিতা পড়ছে। পাজিটা চুপে চুপে কত কী যে করে। এরই মাঝে বইও বের করেছে।

এই তো সেদিন কিছু বই নিয়ে এসে বলেছিল… মা এগুলো সব তোমার জন্য। তোমার খুশি মতো যাকে ইচ্ছে তাকে দিও।

মাঝে মাঝেই বইগুলো ছুঁয়ে দেখি। মনা আমাকে নিয়েও লিখেছে। সেই কত আগে পত্রিকায় আমার ছবি দিয়ে লিখেছিল। সবাই দেখেছে। মিতুল তো বিদেশ থেকে নেটে দেখে কল করেছিল। এত্ত কিছু করার সময় পায় কোথায় পাগলিটা!

মনার কবিতা আবৃত্তি শেষ হলো, হল রুমের সবাই হাত তালি দিচ্ছে। মনা ফিরে এসে মায়ের পাশে বসে। পুরো দুই ঘণ্টা ওখানে ছিল ওরা, সন্ধ্যার পরপর প্রোগ্রামের রুম থেকে বেরিয়ে আসে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ক্যান্টিনে যায়। মায়ের পছন্দের খাবারের কথা বলে, মা খুব খুশি হয়। দুজনে খাবার খেয়ে ছাদে যায়। চারপাশের সব কিছু মাকে দেখায়। গল্প আর গল্প। মা ও মনার গল্প। বাসায় তো যেতেই হবে। নিচে নামতে নামতে ড্রাইভারকে কল করে। গাড়ির পেছনে বসা মা ও মনা, মায়ের মুখটা হাসিতে ভরা।

তুই আমাকে অনেক কিছু দেখিয়েছিসরে মনা। কোন দিন কলেজ দেখিনি, ইচ্ছে ছিল কলেজ দেখার, তুই তা দেখিয়েছিস। তুই আমাকে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রেও নিয়ে গেছিস, আজ আবার এখানে এনেছিস, এখানে না এলে তো জানতামই না এই শহরে এত্ত সুন্দর একটা জায়গা আছে।

কথা বলতে বলতে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে। আজ শহরের অনেকগুলো ভবন লাইটিং করা, তা দেখে মা মনাকে বলেন- জানিস আগে অনেক বড় লোকদের বিয়েতে এমন লাইটের ব্যবস্থা করা হতো। আর এখন। আচ্ছা মনা তোর সেই গানটার কথা মনে আছে।

– কোন গানটা মা।

– ছোট বেলায় তোর নানিকে গেয়ে শুনাতি। ওই যে… লাল নীল বাতি দেইখা নয়ন জুড়াইছে…

– ও মনে পড়েছে মনে পড়েছে। চলো আমরা দুজনে গাই।

পাগলি মেয়ে আমি নাকি গান গাইব। মানুষ শুনলে কী বলবে?

– বোকা মা আমার! গাড়ির তো গøাস উঠানো, অন্যরা শুনবে কী করে?

– অন্যরা যখন শুনবে না তাহলে আমরা গাইব কেন?

মনা হা হা হা করে হেসে উঠে। তাই তো, কেউ শুনবে না তবে গাইব কেন?

– মা তোমার পাশের গøাস নামিয়ে দাও, আমিও এদিকেরটা নামিয়ে দিচ্ছি।

হঠাৎ আকাশে মেঘ করেই বৃষ্টি পড়তে থাকে। মনা আর মা গলা ছেড়ে গান ধরে-

ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে…

ওরে লাল লাল নীল নীল বাত্তি দেইখা নয়ন জুড়াইছে …

বাইরে বৃষ্টি, গাড়ির ভেতরে মনা আর মা গান গাইছে। গাড়ি ধীর গতিতে বিজয় সরণির মোড় পার হচ্ছে। একটু পরই বাসায় পৌঁছে যাবে মনা ও মনার মা।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj