নিরুদ্দেশ

শনিবার, ১৮ মে ২০১৯

জোবায়ের রাজু

এই যে বিশাল হাসপাতাল, এখানে যতজন ডাক্তার, নার্স আছেন- সবার অগাধ বিশ্বাস আছে পলাশের ওপর। টানা ১৬ বছর ধরে এ হাসপাতালে কর্মরত সে। দক্ষ মনোবল আর বিশেষ যতেœ সে রোগীদের দেখাশোনা করে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভালো মাইনে দেয় তাকে। সে মাইনে দিয়ে স্ত্রী শাবানার সঙ্গে বেশ সুখেই দিন কাটে। একমাত্র মেয়ে ইউসাকে নিয়ে শাবানা আর পলাশের চোখ ভরা রঙিন সব স্বপ্ন।

আজ হাসপাতালের নিচতলার মেঝেতে মাঝ বয়সের এক মহিলাকে অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে মনটা কেমন করে উঠল পলাশের। কী তাচ্ছিল্যেই না পড়ে আছেন। নার্স পারুলের কাছে জানা যায়, এই মহিলা রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। কয়েকজন যুবক এখানে এসে রেখে যাওয়ার খানিক পরই জ্ঞান ফিরেছে তার। ঘটনা তদন্তে মহিলার কাছে এগিয়ে যেতেই চমকে উঠে পলাশ। মা এখানে এভাবে? ভাবতেই পারে না সে।

মেঝেতে শুয়ে থাকা নুরজাহান বড় বড় চোখে পলাশকে দেখছেন। ছেলেকে চিনতে পারছেন না। এত বছরে চেনার কথাও না। বয়সের ভারে পলাশের চেহারায়ও যে পরিবর্তন এসেছে অনেক।

এতদিন পর মাকে দেখে পেছনের স্মৃতিরা করুণ সুরে ডাকছে পলাশকে। বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী নুরজাহানকে কখনোই সৎমা ভাবেনি পলাশ। অথচ সতীনের সন্তান বলে বিয়ের পরদিন থেকে এতিম পলাশকে হিংসার কোনো ত্রুটি রাখেননি নুরজাহান। তিন বেলা পেট পুরে ভাত বেড়ে দেয়া তো দূরের কথা, কখনো একটুখানি মমতার চোখে তাকানওনি। অন্যদিকে পলাশের ছিল মায়ের ওপর অগাধ সম্মান। সে সম্মানকে তখনই আরো অবজ্ঞায় ঠেলে দেন নুরজাহান, যখন তিনি যমজ দুই ছেলের মা হন। বিলাস আর তিতাসের মতো দুটি ফুটফুটে ভাই পেয়ে পলাশের আনন্দ কে দেখে আর।

দিন দিন বড় হতে থাকে নুরজাহানের দুই ছেলে। বড় ভাই পলাশকে তারা বড় পছন্দ করে। নুরজাহান ছেলেদের তাগিদ দেন ওই সৎভাই থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে। মায়ের এমন কাণ্ডে ভেঙে পড়ে পলাশ।

এক সময় নুরজাহানের মনে কুমন্ত্রণা আসে। পলাশ বড় হয়ে বাবার কাছে তার প্রাপ্য সম্পত্তির ভাগ চাইবে। ফলে বিলাস ও তিতাসের ভাগে সম্পত্তি কম যাবে। না, এই সুযোগ দেয়া যায় না। পলাশকে সরিয়ে দিতে হবে।

কিন্তু কীভাবে! ভাতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে, নাকি বালিশ চাপা দিয়ে? না, ওসব হলে মামলা-মোকাদ্দমা হবে। অযথা আপদ বাড়বে।

একদিন রাতে স্বামীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির সময় নুরজাহান স্বামীকে ক্ষ্যাপা গলায় বলে- ‘তোমার ছেলেকে যতœ করে আমার কী লাভ বলো? বিয়ের পর তো ওই ছেলে বউয়ের গোলামি করবে। আমাকে তখন আর দাম দেবে না। আমার দুই পোলাই আমার ভরসা। ওরাই আমাকে আয়েসে রাখবে।’ আড়াল থেকে কথাগুলো শুনে কেঁদে ফেলে পলাশ। এই সংসারে এত অবহেলা নিয়ে আর থাকা যায় না। কাল ভোরে সূর্য ওঠার আগে এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে সে।

পরদিন সকাল থেকে নিরুদ্দেশ পলাশ। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েও সবাই নিরাশ। পলাশের নিরুদ্দেশ হওয়ায় মনে মনে খুশি নুরজাহান। তার দুই ছেলের পথের কাঁটা উচ্ছেদ হলো। বাপের সব সম্পত্তি এখন দুই ছেলে সমান ভাগে পাবে।

ওইটুকু বয়সে ঘর ছাড়া পলাশ জীবনযুদ্ধে নেমে পড়ে। নানা দুর্যোগ পেরিয়ে এসে শেষে সদর হাসপাতালে চাকরি নেয়। সময়ের আবর্তে পরিচয় হয় শাবানার সঙ্গে। দুজনে ঘর বাঁধে। সংসার পাতে। হাসপাতালের আয়ে দুজনের সংসার ভালো কাটে।

২.

কল্পনা থেকে ফিরে আসে পলাশ। এই সেই মা, যার কারণে তার জীবনধারা বদলে গেছে। কিন্তু মা এখানে কেন!

সেবিকাদের নিরন্তর সেবায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সুস্থবোধ করেন নুরজাহান। পলাশের আদেশে মাকে কেবিনে আনা হয়। মায়ের পাশে আসে পলাশ। শোয়া থেকে উঠে বসেন নুরজাহান।

– তুমি কে বাবা, এতো যতœ নিচ্ছো আমার।

– আমি আপনার সন্তানের মতোই একজন। আচ্ছা আপনার কী হয়েছে? এভাবে পথের মধ্যে…?

– সবই আমার কপাল। দুই ছেলেকে বড় স্বপ্ন নিয়ে বড় করেছি। বিয়ের পর দুজনই এখন বউয়ের হুকুমের গোলাম, ফলে আমি তাদের কাছে এখন গৌণ।

– কী বলছেন?

– হ্যাঁ বাবা। পুত্রবধূদের কাছে আমার মূল্য নেই। পুত্রদের কাছে তো নেই-ই।

বুকটা ফেটে উঠে পলাশের। মাকে তাহলে বিলাস আর তিতাস আয়েসি জীবন দিতে পারেনি! অথচ এই মা-ই যে বলেছে পলাশ নয়, তার গর্ভজাত দুই ছেলেই তাকে সুখে রাখবে। ভাগ্য পরিহাসে আজ বিপরীত জীবন নিয়ে নুরজাহানকে এই হাসপাতালে পলাশই সেবা করছে।

:: আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj