আমাদের বাতিঘর

শুক্রবার, ১৭ মে ২০১৯

তাহমিনা কোরাইশী

নারী জাগরণের পথিকৃৎ মেধামননে দৃঢ় প্রত্যয়ী সৃজনশীল এক ব্যক্তিত্ব আমাদের প্রাণ প্রিয় আপা নূরজাহান বেগম। উপমহাদেশের নারীদের জন্য প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা বেগম। তিনি প্রথম মহিলা সম্পাদক নূরজাহান বেগম। আমাদের সকলের শ্রদ্ধার প্রিয় আপা চলে গেলেন না ফেরার দেশে ২৩ মে ২০১৬। তাঁর এই চিরবিদায় এক নক্ষত্রের পতন কিন্তু রয়ে যাবে কালের খের খাতায় তাঁর কীর্তিমালা।

তৎকালীন সওগাত পত্রিকার সম্পাদন মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেবের একমাত্র সুযোগ্য কন্যা নূরজাহান বেগম তাঁর হাতেই বেগম পত্রিকার ভার তুলে দেন। প্রথমত এই দায়িত্ব পালন করেন কবি সুফিয়া কামাল। পরবর্তী পুরোটা সময়ই আমাদের নারী অগ্রদূত নূরজাহান আপা দায়িত্ব পালন করেন।

জন্ম ১৯২৫ সালে চাঁদপুর জেলায় পরবর্তীতে ১৯৪২ সালে বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, কলকাতা লেডিব্রেবোর্ন কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন তিনি।

প্রগতিশীল বিশিষ্ট সাংবাদিক সওগাত পত্রিকার সম্পাদক পিতা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের অনুপ্রেরণায় নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর সুযোগ্য কন্যাটি। লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকতেন আমাদের এই প্রিয় আপা।

রবীন্দ্রসঙ্গীত, নাটক, বহুবিধ সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকতেন নূরজাহান আপা। প্রিয় নূরজাহান বেগম প্রায় সাত দশক কাল বেগমের কর্মকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। বেগম মানে নূরজাহান বেগম তাঁর যত ভালোবাসা বেগমকে ঘিরে। এর লেখকদের ঘিরে। বেগমকে আলোক বর্তিকার মতো উজ্জ্বলতার ঝলমল করে রেখেছিলেন আজকের সুখ্যাতি প্রাপ্ত লেখিকরা। অনেক লেখিকাদের প্লাটফর্ম এই বেগম পত্রিকা। সে যুগে তাঁর মতো একজন সাহসী, নির্ভীক, প্রত্যয়ী, সৃজনশীল, দূরদর্শী সম্পাদক, সংগঠক, মমতাময়ী, হিতাকাক্সক্ষী ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুরূহ ছিল। তিনি ছিলেন বেগম রোকেয়ার আদের্শ গড়ে ওঠা সেনানী। বাঙালি নারীদের সমাজে নিজের যোগ্যতায় কিছু করে দেখানোর দক্ষতা অর্জনের চেষ্টায় তিনি সর্বদাই সচেষ্ট ছিলেন। তিনি সব সময়ই চাইতেন এবং করে গেছেন নিরলসভাবে সমাজের নারীদের আত্মজাগরণ। তাদের আলোর পথের দিশারী করতে। লেখার প্রতি উৎসাহিত করতে। তাদের মন ও মানস ঘর পুষ্পিত হোক, আনন্দিত হোক। মেয়েরা সমাজে নিগৃহীত হোক আপার কাম্য নয়। তাই সর্বদা তার চেষ্টা ছিল নারী জাগরণের। অসম্প্রদায়িক গুণী স্বনামধন্য সাংবাদিক বাবা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন মেয়ের শিক্ষাগুরু হাতে কলমে মেয়েকে গড়ে তুলেছেন। প্রিয় আপা তিনিও গ্রহণ করেছেন বাবার দেয়া সব ধরনের তালিম। দেখে শিখেছেন বাবার সাথে সার্বক্ষণিক সম্পৃক্ত থেকে শিখেছেন গুণী বাবার কর্মকাণ্ড। বাবা যেমন কলকাতার বাড়িতে সাহিত্যিক সাংবাদিক গুণী প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বদের আড্ডার আসর বসাতেন তেমনিভাবে পরবর্তীতে ঢাকার বাড়ি নারিন্দাতেও বসতো আড্ডা। তেমনিভাবে প্রিয় আপা নূরজাহান বেগম করেছিলেন ‘বেগম ক্লাব’ সেখানেও উপস্থিত থাকতেন লেখিকারা। গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি, নারিন্দা মহিলা সমিতির নেত্রী ছিলেন তিনি। উনার চাওয়াই ছিল মহিলাদের আলোর ভুবনে আনা। তাদের জন্য কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করা। পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও এগিয়ে আসুক। সমাজ হোক আলোকিত কেবল পুরুষরা এগিয়ে যাবে সমাজের অর্ধেক জনসংখ্যাই পিছিয়ে থাকবে তা কি করে হয়। তবে সমাজ এগিয়ে যাব কীভাবে? সর্বদাই তিনি সচেষ্ট ছিলেন নারী জাগরণে।

শ্রদ্ধেয় আপা তার কাজের মূল্যায়ন পেয়েছেন। পেয়েছেন একুশে পদক, অনন্যা সাহিত্য পদক, রোকেয়া পদক, লেখিকা সংঘ সংবর্ধনা ও আজীবন সম্মাননা, বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলো, আরো বহু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা ও স্বর্ণপদক।

১৯৫২ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি আমাদের আরো একজন প্রিয় ব্যক্তিত্ব সাংবাদিক শিশু সাহিত্য সংগঠক। ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরের সম্পাদক রোকনুজ্জামান দাদাভাই। দুটি কন্যা সন্তানের জননী তিনি।

ভীষণভাবেই মনে পড়ে আপার কথা এমন আত্মার আত্মীয় ক’জনা হয়। এমন শুভাকাক্সক্ষী ক’জনা হতে পারে। কিছুদিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে আপা বলেছিলেন- আমি কেবল নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দেয়ার চেষ্টা করেছি। দেখেছি সংসারে সমাজে প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে থাকা এবং বাঁধার কথা- ‘তুমি এটা করো না, তুমি ওটা করো না, তুমি পারবে না, তুমি যেও না।’ ‘না’ শব্দটিকে ভাঙতে চেয়েছি। তোমরা পারবে। তোমরা এগিয়ে চল। আপনার এই অনুপ্রেরণা আমাদের জীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে।

আরো বেশি করেই মনে পড়ছে আমাদের আলোর দ্যুতি নূরজাহান আপা কথা। তাঁর শ্বাসকষ্ট বেশ অনেকদিন ধরেই ছিল কখনো বেশি হলে হাসপাতালে ভর্তি হন। আমরা ভাবলাম এবারও এমনই। হাসপাতালে ভর্তির কয়েকদিন আগের কথা- ‘তাহমিনা এখনো তোমার ঈদ সংখ্যার জন্য লেখাটি পাইনি। তাড়াতাড়ি পাঠাও। লোক পাঠাবো’। টেলিফোনের ওপাশ থেকে দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ। অবশ্য ঠাণ্ডায় গলাটা আরো ভারী হয়ে আছে। আমি ভীষণ লজ্জিত, বললাম- না না আপা লোক পাঠাতে হবে না। আমি কালই কুরিয়ার করে দেব। পরশু পেয়ে যাবেন। বললেন- ‘আচ্ছা ঠিক আছে কিন্তু তোমার খালা হাজেরা নজরুল তাকে তো ধরতে পারছি না। কত যে ভালো লিখতো। আজকাল ওকে ঠেলে ঠেলে একটা লেখা বের করতে পারছি না। ওকে বল।’

ঐ আমার শেষ কথা আপার সাথে। প্রায়ই তিনি ফোন করতেন কেবল আমাকে নয়। প্রায় সবাইকে ছোট-বড় সব লেখকের খোঁজখবর উনার নখদর্পণে এত বেশি মনে রাখতেন তিনি, আমি অবাক হয়ে যাই। নামও ভুলতেন না। এই ৯০ বছর বয়সেও। আমরা কতজন মানুষ বেগমে লিখি বিশেষ করে ঈদ সংখ্যায়। তিনি যে কীভাবে এত জনের সাথে কথা বলেন তা একেবারে বিস্ময়কর ব্যাপার। অবশ্য উনার একজন পুরাতন লোক আছে সে ফোনগুলো লাগিয়ে দেন আপা কথা বলেই চলেন। তাঁর স্মরণশক্তি মেধা মননের তুলনাই হয় না। নূরজাহান আপা ছিলেন এমনই একজন মমতাময়ী, শুভাকাক্সক্ষী মাতৃতুল্য আমাদের আপনজন।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমার বড় মামা ডা. মোতালিব এর ফাউন্ডেশন থেকে আমার খালা কথাসাহিত্যিক হাজেরা নজরুল আরো অন্যরাও একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। গুণীজন সম্মাননার আয়োজন করেন। সেই অনুষ্ঠানে নূরজাহান আপাকেও সম্মাননা দেয়া হয়। আমার মা নূরজাহান খানকেও সম্মাননা দেয়া হয়। আমার মা একজন সমাজসেবক। সুস্থ দরিদ্র অল্প আয়ের মহিলাদের স্বল্প বেতনে এবং বিনা বেতনে তার নিজের প্রতিষ্ঠানে নানাবিধ সেলাই কর্মের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। তাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলায় তিনি সচেষ্ট। তাদের চাকরি এবং অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা করতেন তিনি। পরিবারে স্বচ্ছলতা যাতে করে ফিরিয়ে আনতে পারেন।

এই দিনের এই অনুষ্ঠানে আমার মা অসুস্থতার জন্য আসতে পারেননি। আপা শুনে বললেন- তোমার মায়ের থেকে আমি ১০ বছরের বড়। এখনো ভালোভাবে চলে ফিরে দিন কাটাচ্ছি। বুঝলে মনের জোড় বড় কথা। আমি জ্বি আপা বলে হাসলাম। আর কিছু বললাম না। মা আমার রতœগর্ভা ছয়টা কন্যা সন্তানকে মানুষ করেছেন। তারা স্ব-স্ব যোগ্যতায় নিজস্থানে কাজকর্ম করে চলেছেন।

দেখলাম আপার সহসী মন, উৎসাহ, উদ্দীপনায় ভরপুর। প্রিয় আপা কখনও অসুস্থতায় নিজের কাজ বাদ দেননি। আপা সারা জীবনই প্রাণউচ্ছল একজন মানুষ। খুব একটা অসুস্থ হননি তিনি। তাঁর এই শ্বাসকষ্ট ছিল। ঠাণ্ডা লেগে একটু অসুস্থ হতেন। তার মধ্যেও কাজ বন্ধ রাখেননি। এমনই প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর একজন মানুষ ছিলেন। উনার স্মরণশক্তিও ছিল প্রচুর। একাগ্রতা, নিষ্ঠা, সচেতন, উন্নত প্রগতিশীল মানসিকতার মানুষ ছিলেন তিনি। শ্রদ্ধেয় বাবার আদর্শে গড়ে ওঠা নিপুণ নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন তিনি।

যিনি রাধেন তিনি চুলও বাঁধেন। প্রিয় নূরজাহান আপার নাতনি মুনিয়া নানীর কাছ থেকে রান্না শিখেছে। সে বলেছে, নানী বলতেন মাছ-মাংস মসল্লা দিয়ে মাখিয়ে সেই হাত ধোয়া পানিটা রান্নায় দিলে রাঁধুনীর রান্নায় জাদু আনে। স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। সত্যি তাই। আমিও আমার মাকে দেখেছি এভাবেই রান্না বসাতেন চুলায়। তখনো তো সয়াবিন তেল ছিল না। সরিষার তেল অল্প করে ঢেলে দিয়েই রান্না করতেন। হাত দিয়ে মাখিয়ে বসানোর অভ্যাসই ছিল বেশি।

প্রিয় আপার গুণের শেষ ছিল না। তিনি প্রখর স্মারণশক্তির অধিকারী ছিলেন। সবার নাম মনে রাখতেন। তার লেখা সম্পর্কে ভালো জানতেন। এতটা সময় ধরে কোনো প্রতিষ্ঠানের হাল ধরে রাখা সহজসাধ্য নয়। যেমন তিনি দেখতে রানীর মতো সুন্দর ছিলেন। তেমন তিনি গুণবতী নারী ছিলেন। এতটা প্রাণশক্তি, প্রজ্ঞাবান, নিষ্ঠাবান মেধা-মননে দৃঢ় চেতা মানুষ ছিলেন। আমাদের বটবৃক্ষ তিনি মহীরূহ ছিলেন। শহর বন্দর গ্রাম প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘরে ঘরে আলোর পিদিম জ্বেলে দিয়ে গেছেন। নারীদের জীবন হোক আলোকিত। তিনি আমাদের বাতিঘর।

আপার ৯০তম জন্মদিনে ছিলাম আনন্দমেলায়। দলে দলে আমরা করেছি আপাকে নিয়ে সারাদিনের উৎসব। ভাবতাম এবং চাইতাম শ্রদ্ধেয় আপা নূরজাহান বেগম তার শ্রদ্ধেয় পিতার মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন উনার মতো ১০৬ বছর আয়ুতে বেঁচে থাকুন। আল্লাহতায়ালা যা চাইবেন তার ওপর মানুষের কোনো হাত নেই। কিন্তু একটি নক্ষত্রের পতন হয়েছে। বেগম যুগের অবসান। সেই অর্থে না বেগম থাকবে আছে। আপার প্রাণের চেয়ে প্রিয় এই পত্রিকা ধরে রাখবেন তার সুযোগ্য দুই সন্তান। ভীষণ শ্রম দিয়ে তুলে ধরতে হবে ‘বেগম’কে। আমরা চাই আপা এবং তাঁর বাবার স্মৃতিময় এই সংগঠন বেঁচে থাকুক সারা জীবন। ইতিহাস কথা বলবে পূর্বসূরিরা জানবে। ছিল একজন মমতাময়ী নারী যিনি মহিলাদের শুভাকাক্সক্ষী।

শ্রদ্ধেয় নূরজাহান বেগম আপার জন্য আল্লাহতায়ালার দরবারে দোয়া প্রার্থনা করি। আল্লাহ উনাকে বেহেস্ত নসিব করুন, আমিন।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj