সূর্য ওঠার আগে

শুক্রবার, ১৭ মে ২০১৯

রফিকুর রশীদ

ধারাবাহিক উপন্যাস : ১

মানুষ মাত্রেরই এক বা একাধিক নাম থাকে। নামেই তার পরিচয়। কারোবা একটি মাত্র নাম দিয়ে কেটে যায় গোটা জীবন। কারোবা একাধিক নামের প্রয়োজন হয়। জীবনের বাঁক বদলের সময় পদবি বা সুগন্ধী বিশেষণ এসে নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঝুলতে ঝুলতে এক সময় মূল নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়, তখন কোনটা মূল আর কোনটা যে ডালপালা তা শনাক্ত করাও দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। তবু মানুষ কিন্তু নামের কাঙাল, নাম নিয়েই বাঁচে-মরে। নামের মধ্যেই বসবাস সকলের।

নিজের নাম কখনো কারো কাছেই দুর্বহ হয়ে ওঠে, নাকি হয়ে উঠতে পারে? আর যদি বিশেষ কোনো কারণে তা হয়েই পড়ে, তখন কীইবা করার থাকে! পিতৃপ্রদত্ত নামও সমূলে উৎপাটনের মতো ঘটনা খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন আকারে মাঝেমধ্যে ছাপা হতে দেখা যায়, এফিডেফিট নম্বরসহ, কিন্তু সে সবের অধিকাংশই ধর্মান্তর ঘটিত নাম পরিবর্তন। সূর্যখোলা গ্রামের মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে তো তেমন কিছুই ঘটেনি। তার জন্মদাতা পিতা শেখ মো. আজিজুর রহমান ছোটবেলায় মক্তব মাদ্রাসায় ভর্তির সময় যেমনটি লিখে দিয়েছিলেন, তেমনই আছে। আংশিক পরিবর্তনের দুর্মতিও কখনো হয়নি আর। এ সব নাকি কবি-টবি অনেকে করে থাকেন, নিজের নামকেই ভেঙেচুরে একটুখানি কাব্যসুষমা যুক্ত করে জাহির করতে ভালোবাসেন। গ্রাম্য স্কুলের ধর্মশিক্ষক মুজিবুর রহমান কোথায় পাবেন কাব্যপ্রতিভা!

সমস্যা হয়েছে মুজিবুর রহমানের একমাত্র পুত্র হাফিজুর রহমানকে নিয়ে। তিন মেয়ের পর সবেধন নীলমণি, বোধহয় একটু বেশিই পাত্তা পেয়েছে সে। মায়ের আঁচতলে সন্তানেরা চিরকালই অবারিত স্বর্গসুখ পেয়ে থাকে, হাফিজুরও তার ব্যতিক্রম নয় হয়তো; কিন্তু বাবা হিসেবে তিনিই বা কতটুকু নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছেন ছেলের উপরে? হাতের মুঠোর চেয়ে আমের আকৃতি বড় হয়ে গেলে তো হাত ফসকে যেতেই পারে! এমন তো হরহামেশাই ঘটে থাকে। এ জন্য পস্তালে চলবে?

নিজের নামের আগে ‘শেখ মো.’ রাখতে চায় না হাফিজুর। এসব নাকি একেবারে ব্যাকডেটেড। এ ভারি তাজ্জব কথা! এ কি হচ্ছে-অনিচ্ছের ব্যাপার! মুজিবুর রহমান শৈশবে তার পিতা আজিজুর রহমানের কাছে বহুবার শুনেছেন- এ দেশের সব শেখ আদি ও অকৃত্রিম শেখ নয়। অনেক আছে ধার করা শেখ। অনেকে আছে ভেজাল শেখ। শেখ বললেই শেখ হয়ে যায়! আদি শেখ বংশের ধারা এসেছে আরব জাহান থেকে। দেওবন্দের মওলানা শেখ মো. আজিজুর রহমান পুত্রের পিঠেই হাত রেখে ছবক দিতেন- মনে রেখো তোমার শরীরে বইছে আরবীয় রক্তের শক্তিশালী ধারা। এরপর তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের চেহারার বর্ণনা শোনাতেন। গৌরবর্ণ, খাঁড়ার মতো টিকালো নাক, ছয় ফুটের উপরে উচ্চতা… … ইত্যাদি। হাফিজুর বংশ-লতিকার এই গর্বিত ধারা একেবারে ঘ্যাচ করে একটানে কেটে দিতে চায়, হাত উল্টিয়ে নিজের গায়ের চামড়া দেখিয়ে সোজাসুজি দাবি করে- আমরা তামাটে জাতি।

হাফিজুরের গোয়ার্তুমি তো নতুন নয়। শৈশবে সে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে স্কুলে গেছে। ধর্মীয় লাইন পছন্দ হলো না, গেল জেনারেল লাইনে। স্কুল-কলেজ পেরিয়ে একেবারে ইউনিভার্সিটি। শুধু সূর্যখোলা কেন আশপাশের ৮-১০ গ্রামের মধ্যে ঢাকা ইউনিভার্সিটি পড়–য়া ছাত্র বলতে এক হাফিজুরই প্রথম। লোকে বলে, হুজুর স্যারের ছেলের মাথা ভালো, নিশ্চয় বড় কিছু হবে।

গ্রামের মানুষ ধর্মীয় শিক্ষককে সাধারণত মওলানা সাহেব বলেই সম্বোধন করে। কেউ কেউ আবার হুজুর স্যারও বলে। হাফিজুরের বড় কিছু হবার সম্ভাবনার কথা শুনে তিনি বেশ আরাম পান, স্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু তার প্রবল আশঙ্কা হয়- দেশে যে রাজনৈতিক ডামাডোল চলছে, এই উথাল-পাথাল ঘূর্ণি¯্রােতে তার ছেলেটি কোথাও না হারিয়ে যায়! নিজের নামের সম্মুখভাগে ‘শেখ মো.’ লিখতে ভালো লাগে না, অথচ শেখ মুজিবের চ্যালা হয়ে মিছিলে নেমে জান বাজি রাখতে তার একটুও আপত্তি নেই। কেন, তোদের লিডারের নামের মাথা থেকে শেখ মুছে ফ্যাল! তারপর না হয় নিজেরটা ছেঁটে ফেলিস! উঁহু, তার বেলা রয়েল বেঙ্গলের মতো গর্জে ওঠে- শেখ মুজিব মহান নেতা। তিনি বঙ্গবন্ধু। এ সব আস্ফালন শুনলে হাফিজুরের বাবার ব্রহ্মচাঁদিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে। তখন নিজের নামটিকে নিজেই মুখ ভেংচিয়ে উচ্চারণ করেন- হুঁ! শেখ মুজিব! দেশের ছাত্র-সমাজের মাথা চিবিয়ে খেয়েছেন, তিনি আবার বঙ্গবন্ধু! তোফায়েল আহমেদ চোঙা ফুঁকে বললো, আর অমনি হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু! ওই নামের পেছনে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে? যত্তোসব ফালতু নাচানাচি।

মুখে যাই বলুন, পুত্র জন্মের দায় তো এড়াতে পারেন না মুজিবুর রহমান। একমাত্র পুত্রসন্তান, দু’মাস তার খোঁজখবর নেই। হলের ঠিকানায় চিঠি লিখে তার জবাব আসে না। মায়ের চোখে ঘুম নেই। বোনেরা কান্নাকাটি করতে করতে একদিন অভিযোগই জানিয়ে বসে- আব্বা কি ঢাকায় গিয়ে একবার খোঁজটোজ নিতে পারে না। বাহ্যজ্ঞানশূন্য এই সব মেয়ে মানুষদের কী বলবেন তিনি! দেশের যে অবস্থা, এখন কি ঘরের বাইরে পা বাড়াবার সময়! ঢাকায় আগুন জ্বলছে, সেখানে এখন পৌঁছবেন কী করে। ইয়াহিয়া সংসদ অধিবেশন স্থগিত করার পর চলছে অসহযোগ আন্দোলন, প্রতিদিন আধাবেলা হরতাল, রাস্তাঘাটে মিটিং-মিছিলে সয়লাব, এর মধ্যে ঢাকায় যাওয়া কি মুখের কথা! বললেই হলো! এদিকে হাফিজুরের মা নাওয়া-খাওয়া ছেড়েছে, কথাবার্তাও বন্ধ-প্রায়। নিরুপায় জননী অবশেষে একরাতে স্বামীর পায়ের উপরে মাথা রেখে কেঁদেকেটে ভাসিয়ে দিলে মুজিবুর রহমান সেদিন প্রত্যুষে ফজরের নামাজ শেষে দোয়া দরুদ পড়ে পুত্রের সন্ধানে অনিশ্চিত পথযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন। কোথায় দেশের এক প্রান্তের সীমান্ত-গ্রাম সূর্যখোলা, আর কোথায় কোন সুদূরে ঢাকা মহানগরী! কখন কীভাবে পৌঁছুবেন কে জানে!

সেদিন সাতই মার্চ।

দুদিন দুরাতে পথে পথে ঘুরে ঘুরে সূর্যখোলা গ্রামের ধর্মীয় শিক্ষক শেখ মো. মুজিবুর রহমান ঢাকা নগরীতে প্রবেশ করেন। পথে কত দুর্ভোগ, কত বিড়ম্বনা! কত গুজব, কত খবর! সংবাদের গায়ে হুমড়ি খেয়ে আছড়ে পড়ে দুঃসংবাদ। ঢাকা-চট্টগ্রাম-খুলনা-টঙ্গী আর্মি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, নির্বিচারে মানুষ মারছে গুলি করে। কিন্তু মিছিল মিটিং সমাবেশ তো থামছে না। গ্রাম-গঞ্জ-লঞ্চঘাট সর্বত্র টানটান উত্তেজনা, রাস্তায় রাস্তায় মিছিল আর মিছিল। গুলির ভয় করছে না মানুষ, এতা সাহস পাচ্ছে কোথায়! ঢাকায় পৌঁছুনোর পর বড়ই দুর্ভাবনা হয়- এই উথালপাথাল মানব¯্রােতের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে তো হাফিজুর রহমানকে?

প্রতিবাদী মানুষের পদভারে প্রকম্পিত রাজপথ। চতুর্দিক শোভিত ব্যানারে ফেস্টুনে। মার্চের বাতাস মুখরিত গগনবিদারী ¯েøাগানে ¯েøাগানে। হাজার হাজার মানুষ। লাখ লাখ মানুষ। সবার চোখেমুখে কী উৎকণ্ঠা, কী উচ্ছ¡াস! সবাই চলেছে রেসকোর্স ময়দানে। না, কোনো ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা নয়; নয় কোনো বিশেষ কসরৎ দেখানো সার্কাস বা জাদুর খেলা। মানুষ চলেছে মানুষের প্রবাহে মিশে। লাখো লাখো মুখের আদল আর আলাদা করে চেনা যায় না। এরই মাঝে কোথাও যদি হাফিজুর থাকে, যদি থাকেই সত্যি, বাপ হয়ে মুজিবুর রহমান তাকে চিনবেন কেমন করে?

হাফিজুর কি চিনবে তার জন্মদাতা পিতাকে?

ভরসা পান না তিনি। মানব¯্রােতে গা ভাসিয়ে এগিয়ে চলেন। দুদিন দুরাতের ক্লান্তি শ্রান্তি কখন অজান্তে হারিয়ে গেছে! সকলের সঙ্গে পায়ে পা লিমিয়ে চলতে চেষ্টা করেন তিনি। নদীর ¯্রােতের যেমন নিজস্ব টান থাকে, তিনি বেশ অনুভব করেন এই মানবপ্রবাহেরও তেমনই অনতিক্রম্য টান আছে। এই প্রবাহের পড়ে তিনি দিব্যি এগিয়ে চলেন সামেন, নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছে কিছু আর টের পান না আলাদাভাবে। কিন্তু অনভ্যস্ততাজনিত কারণে সবার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে ¯েøাগান ধরাটা কিছুতেই যেন হয়ে ওঠে না তাঁর। এত জনারণ্যেও শুধু এই কারণে নিজেকে ভয়ানক নিঃসঙ্গ মনে হয়। থোকা থেকে খসে পা বৃন্তচ্যুত লিচু যেন বা। হঠাৎ ভাবনা হয় তাঁর এই একাকীত্ব আবার অন্যদের চোখে ধরা পড়ে যাচ্ছে না তো! চলতে চলতে আড়চোখে একবার তাকিয়ে দেখেন তিনি। নাহ, কোথাকার কোন এক মুজিবুর রহমান, তার দিকে তাকাবার সময় কারো নেই। সবার লক্ষ্য অন্য এক মুজিবের দিকে। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশ তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। তিনি শেখ মুজিব।

কিন্তু হাফিজুর রহমান কোথায়!

¯্রােতের উজানে বহু কষ্ট করে ছাত্রদের হলে এসে পৌঁছেন মুজিবুর রহমান। ২৫০ মহসিন হল। ভুল হয়নি, খুঁজে পেতেই এসেছেন তিনি। চোখের চশমা খুলে কাচ মুছে আবারও চোখে পরেন। নাহ, দুশ পঞ্চাশ নম্বর ঠিকই আছে। এই যে বন্ধ দরজার কপাটে চক দিয়ে নাম লেখা- হাফিজুর। আরো দুটো নামও আছে। কিন্তু রুমে কেউ নেই। রুম তালা বন্ধ। আসলে এত বড় ছাত্রাবাসেই কেউ নেই। বিলম্বে হলেও নিজের বোকামিতে ভীষণ লজ্জিত বোধ করেন তিনি, বেশ বুঝতে পারেন- ওদের সবার আজকের আসল ঠিকানা রেসকোর্স ময়দান। এখানে খুঁজলে চলবে কেন!

মুজিবুর রহমান নেমে আসেন হল থেকে। পা বাড়ান সামনে। আবারও মিশে যান মিছিলের ¯্রােতে। একবার জানতে কৌত‚হল হয়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঐতিহাসিক বটতলাটা কোথায়! কোথায় দাঁড়িয়ে ছাত্রনেতা রব নতুন পাতাকা তুলেছিল? এ খবরটা যখন মুজিবুর রহমান প্রথম শোনেন, তখনই তাঁর বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠে- আবার নতুন পতাকা! তার মানে দেশটা ভেঙে টুকরো টুকরো করাটাই খুব জরুরি তোমাদের কাছে! শেখ মুজিব তোমাদের কানে কানে এই মন্ত্র ভজিয়েছে কেমন? হায়রে দেশ ভাগ! সাতচল্লিশের দেশভাগের তোমরা কী দেখেছ, কী জানো? ওপারে চন্দ্রখোলায় বিষয়-সম্পত্তি সব ফেলে এসে এপারে সূর্যখোলায় নতুন বসতি গড়তে হয়েছে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ছোট চাচার প্রাণ হারিয়েছে- এ সবের কিছুই ভুলে যাননি মুজিবুর রহমান। সেই ভারতের দুর্বুদ্ধিতে আবার এ দেশ ভাঙাভাঙি! সরাসরি কোনো রাজনীতি না করলেও এই দুর্ভাবনা তাঁকে সর্বদা তাড়িত করেছে। ভেবেছেন, শুধু ছাত্র দিয়ে পতাকা তুললেই দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে! স্বাধীনতা কি ছেলের হাতের মোয়া! যত্তোসব ইয়ার্কি!

কিন্তু এটা কী হলো! এভাবে পিছিয়ে পড়ার কোনো মানে হয়! হাফিজুরের হলে না গেলে তো আরো খানিকটা এগিয়ে থাকাই যেত! লাখো মানুষের ভিড় ঠেলে এখন সামনে এগোবেন কী করে! হাফিজুর যেখানেই থাকুক, নিশ্চয়ই এই লাখো জনতার মধ্যে আছে। হ্যাঁ, জনতাই তো! ছাত্রের তুলনায় শ্রমিক-জনতাই অধিক। এত মানুষ! এত জনতা! সবাই আছে ঐ পতাকার সঙ্গে? মুজিবুর রহমানের বুকের ভেতরে নদীভাঙনের শব্দ হয়, রেসকোর্স তবে কি আজ শুধু ছাত্রদেরই ঠিকানা নয়, সারা দেশের আপামর জনতার ঠিকানা? তাহলে এই ভরা মধ্যহ্নবেলায় তাঁর হাত-পা কেঁপে উঠছে কেন? কোথায় দুর্বলতা তার? তিনি কি আর সামনে এগোতে পারবেন না?

এরই মাঝে কলরেডি মাইক্রোফোনে গমগম করে ওঠে বজ্রকণ্ঠ,

-ভাইয়েরা আমার!

একী! গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছে কেন! কোথায় শেখ মুজিব! নাহ্, কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। দু’পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে নিজেকে উঁচু করে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল লাখো মানুষের মাথা। দূরে নৌকা আকৃতির মঞ্চ বানানো হয়েছে। কিন্তু সেই মঞ্চের মানুষগুলো যেন বা খেলনা পুতুল। মুজিবুর রহমান চোখের চশমা খুলে তাকান। তবু স্পষ্ট হয় না কিছুই। নাহ, চশমাটা এবার না বদলালেই নয়। এবার কালো রঙের চওড়া ফ্রেমে চশমা নেবেন, শেখ মুজিবের চশমার মতো, যাতে বর্তমান থেকেই ভবিষ্যৎ দেখা যায়।

মার্চের পড়ন্ত বিকেল। মেঘযুক্ত আকাশ রোদ ঢালছে খাঁটি সোনার মতো। তারই মাঝে খাপ খোলা তরবারির মতো ঝলসে ওঠে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ। তাঁর কণ্ঠে ছলকে ওঠে তেইশ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস! তাঁর কণ্ঠে উঠে আসে দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর। তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় উত্তরের হিমালয়ে ধাক্কা খেয়ে। তাঁর কণ্ঠে যেন বা মন্দ্রিত হয় বারো শত নদীর নূপুর নিক্কন আর হাজারও পাখপাখালির কলকাকলি।

মুজিবুর রহমানের ভেতরে-বাইরে ওলোটপালোট হয়ে যায়। ঢাকার আকাশ থেকে যেন বা মেঘের পালক এসে পড়ে তাঁর মাথায়। তিনি সম্মোহিত হয়ে পড়েন। তিনি শুনতে পান-

আর যদি গুলি চলে….।

মুজিবুর রহমান পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করেন। কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করেন- কী করতে হবে গুলি চললে?

প্রত্যেক ঘরে গরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। একেবারে জড়তামুক্ত স্পষ্ট আদেশ, যার যা আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।

এই সহজ সরল নির্দেশ খুব ভালো লাগে মুজিবুর রহমানের। তাই তো, রাইফেল বন্দুক কী হবে! যার যা আছে সেটাই তো যথেষ্ট। কৌশলটাই বড় কথা। ওই যে বললেন- আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব।

মুজিবুর রহমান মনে মনে তাঁর পুত্র হাফিজুর রহমানকে খোঁজেন। রণকৌলশটা বুঝিবা তিনি নিজে হাতে শিখিয়ে দিতে চান। কিন্তু কোথায় হাফিজুর? খুব নিকটেই, একেবারে পাশে থেকে কে যেন উচ্ছ¡সিত গলায় বলে ওঠে- ‘বাপের ব্যাটা শেখ সাহেব।’

কেন এ উচ্ছ¡াস!

শেখ সাহেব বললেন,

-রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। বাপরে বাপ! এ কী দৃঢ় প্রত্যয়। ভাঙবে, তবু মচকাবে না। সামনে মুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকলে কেউ কি স্থিরপ্রতিজ্ঞ হতে পারে? কী সেই লক্ষ্য? দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন শেখ সাহেব,

-এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

মুজিবুর রহমানের কানের দরজায় ‘শেখ সাহেব’ শব্দযুগল হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে পড়ে। বহু বছর আগে এক স্কুল ইন্সপেক্টর তাঁর সার্টিফিকেটে মুদ্রিত নাম দেখে তাঁকে ‘শেখ সাহেব’ বলে ঠাট্টা করেছিলেন। এতদিন পর মিথ্যে সেই পরিহাসটুকুই আবারও শোনার জন্য ভেতরে ভেতরে কে যেন লালায়িত হয়ে ওঠে। এখন মনে হয় হাফিজুরকে এবার সামনে পেলে সব দ্বিধা সংকোচ ঝেড়ে ফেলে তিনিও চিৎকার করে ¯েøাগান দিতে পারতেন- জয় বাংলা।

আহা, আর কেউ না জানুক, হাফিজুর রহমান তো জানে- তার বাপের নাম শেখ মুজিবুর রহমান। এই নাম অন্ধকারে আলো ছড়ায়। এই নাম দূর আকাশে সাদা মেঘের পালকের মতো নির্ভার। নামের সাদৃশ্যটা যতোই কাকতালীয় হোক না কেন, এমন একটি নাম রাখার জন্য আজ এতদিন পরে পরলোকগত পিতা শেখ মোঃ আজিজুর রহমানের প্রতি নতুন করে কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়ে আসে।

মানুষের নামও কি কখনো আতরদানি হয়ে যায়! সূর্যখোলা গ্রামের ধর্মীয় শিক্ষক শেখ মোঃ মুজিবুর রহমানের জানা ছিল না মানবিক একটি নাম এমন অনিঃশেষ সৌরভ ছড়িয়ে দিতে পারে সর্বত্র, সারা দেশে।

দুই.

সূর্যখোলা গ্রামের ধর্মীয় শিক্ষক শেখ মোঃ মুজিবুর রহমান ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে আসেন আরো তিনদিন পর।

এই তিনদিনে তাঁর বাড়িতে বিরাজ করে থমথমে অবস্থা। মেজো মেয়ে চামেলির শ^শুরবাড়ি পাশের গ্রামে। জামাই বাবাজি কয়েক মাইল দূরে হাড়াভাঙা সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষক। খুব সাদাসিধে মানুষ। শ^শুরের ঢাকা যাত্রা উপলক্ষে সে সস্ত্রীক সূর্যখোলায় এসে শাশুড়ির পাশে দাঁড়িয়েছে। না, একটুখানি ভুল হচ্ছে, ঢাকা যাবার আগে শ^শুর নিজেই মেয়ে-জামাইকে খবর পাঠিয়েছিলেন বেড়াতে আসার জন্য। সেই খবর পেয়ে চামেলি এসেছে বাপের বাড়ি। তার স্বামী আব্দুল কুদ্দুস এমনিতেই ভয়ানক স্ত্রী-ন্যাওটা, তার উপরে সে পেয়েছে ডাক্তারের সমর্থন; সন্তানহীনতার চিকিৎসা করাতে গেলে ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছেন স্বামী-স্ত্রী কাছাকাছি থাকার জন্য; কাজেই শ^শুরের অনুপস্থিতিতেও তাকে আসতে হয়েছে স্ত্রীর সঙ্গে। ছোট মেয়ে জুঁই এসেছে শেষের দিন। আব্বা যে হাফিজুরকে বাড়ি নিয়ে আসার জন্য ঢাকায় গেছে, সে খবর সে আগেই পেয়েছে। হাফিজুর তার পিঠাপিঠি ভাই, হাতাহাতি খুনসুটি গলাগলির স্মৃতি তার সঙ্গেই বেশি; ছোটভাইকে দেখার জন্য উতলা হয়ে আছে মন, তবু কি সহজে আসার উপায় আছে? একান্নবর্তী বড় সংসারের বউ, কাঁধের উপরে বড় বড় দায়িত্ব; বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে নিজ হাতে সব দিক সামলে তারপর পা বাড়াতে হয়। এ নিয়ে কাউকে কিছু বলারও নেই। সেলিমের সঙ্গে এই বিয়ে সে করেছে নিজের পছন্দে। পছন্দ নিজেরই, কিন্তু মুখ ফুটে সে কথা কি বলার উপায় ছিল! এ সব কথা কানে গেলে তার আব্বা সে মেয়েকে কেটে টুকরো টুকরো করে গাঙে ভাসিয়ে দিতে মোটেই দ্বিধা করবে না সে জ্ঞান খুব আছে জুঁইয়ের। তবু প্রতিবেশী নাসিমা ভাবীর মামাতো দেবর সেলিম কেমন করে যেন তাকে পটিয়ে ফ্যালে। বিএ পরীক্ষা দিচ্ছে মেহেরপুর কলেজ থেকে, পাস করলেই চাকরি এবং শহরে ছোট্ট বাসা নিয়ে দুজনে মিলে কুহু কুহু করবে- এই সব সাতকাহনের স্বপ্নের ঘোর লাগিয়ে দেয় জুঁইয়ের চোখে। কিন্তু সেলিমের চাকরি বাকরি হবার আগে এ প্রস্তাব হুজুর স্যারের সামনে তুলবে কে? কার আছে এতটা সাহস? ছোট বুবুর এই হৃদয়ঘটিত সমস্যার ভার অবশেষে কাঁধে তুলে নেয় ছোটভাই হাফিজুর। বাড়ির সবাই জানে, হাফিজুর বললে সে প্রস্তাবে না বলতে পারবে না তার আব্বা। সেই সুযোগটাই গ্রহণ করে জুঁই।

বাড়িতে সবাই অপেক্ষায় আছে একমাত্র পুত্র হাফিজুরকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন মুজিবুর রহমান। কিন্তু না, বাস্তবে দেখা গেল তিনি ফিরলেন একা। দিনের আলো নিভে যাবার পর সন্ধ্যা যখন অন্ধকারের ডানা মেলে নেমে আসে, তখনই তিনি আসেন বাড়ি। পুত্রের কল্যাণ কামনায় পরপর তিনদিন রোজা রাখছে হাফিজুরের মা। ইফতার শেষে তখন সে মাগরিবের নামাজে, সালাম ফেরাতেই তার দৃষ্টি পড়ে স্বামীর মুখের ওপর। এমন বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত চেহারা দেখে মুনাজাত করা হয় না তার। ওই অবস্থায় নামাজ অসমাপ্ত রেখেই ধসমস করে উঠে আসে এবং স্বামীকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে সে একটা হাতল ভাঙা চেয়ার টেনে বসিয়ে দেয়। টলটলে গøাসের পানি এনে সমামনে বাড়িয়ে ধরে। এটা অনেকদিনের অভ্যেস। তারপর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে প্রশ্ন করে,

-তুমি একা যে শেফালির আব্বা? খোকা কই?

কোনো উত্তর না দিয়ে শেখ মোঃ মুজিবুর রহমান চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে থাকেন স্ত্রীর মুখের দিকে। প্রথম সন্তান শেফাফির জন্মের পর থেকে তিনিও স্ত্রীকে শেফালির মা বলে ডাকেন। শেফালির আরও একটা নাম আছে। শামসুন্নাহার। চামেলির নাম বদরুন্নাহার। জুঁইয়ের নামটা আবার একটু অন্যরকম। গুল বাহার। তিনি বোনের মধ্যে জুঁই বেশি সুন্দর। সেই কারণে ভিন্ন ধারার নামকরণ কিনা সে কথা কেউ জানে না। এই সব নাম রেখেছেন ওদের পিতা নিজে। কিন্তু ইশকুলের খাতা ছাড়া অন্য কোথাও নামগুলো প্রতিষ্ঠা পায়নি বললেই চলে। সবার মুখে মুখে ডাক নামগুলোই ভেসে বেড়ায়। স্বামীর মুখে উত্তর না পেয়ে শেফালির মা আবার জিজ্ঞেস করে,

কী হলো, অমন করে তাকিয়ে আছ কেন? আমার খোকা কই?

খোকা নামটাই যেন হঠাৎ চমকে দিয়েছে মুজিবুর রহমানকে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj