মা-মেয়ে-ছেলের মৃত্যু : দুজনকে হত্যার পর একজনের আত্মহত্যা!

বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : রাজধানীর উত্তরখানের মৈনারটেকে উদ্ধার হওয়া মা-মেয়ে-ছেলের মরদেহ প্রাথমিক তদন্তে তাদের মধ্যে যে কোনো একজন অন্য দুইজনকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর গতকাল বুধবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ। এদিকে ওই ঘটনায় নিহত মুহিব হাসানের মামা মনিরুল হক বাদী হয়ে গত মঙ্গলবার রাতে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে।

সোহেল মাহমুদ বলেন, ময়নাতদন্তের পর যে আলামত পেয়েছি, সেগুলো নিশ্চিত করতে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক বোর্ড সিন অব ক্রাইম ভিজিট করেছি। ভিজিট করে সেখানে অনেক তথ্য পেয়েছি। আমরা গিয়েই প্রথমে বাসার দরজা পরীক্ষা করি। বাসার দরজার ছিটকিনি ভেতর থেকে লক ছিল। পুলিশ আমাদের জানিয়েছে, তারা শাবল দিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। ঘটনাস্থল ঘুরে আমরা শাবল দিয়ে দরজা ভাঙার আলামত পেয়েছি। এরপর বাসার ভেতরে ঢুকতেই মেঝেতে প্রচুর রক্তের দাগ দেখতে পাই, যার ওপরে কিছু মাছি পড়ে মরে ছিল। তিনি আরো বলেন, সেখানে ডাইনিং টেবিলের ওপর একটা কীটনাশকের খালি কৌটা পেয়েছি। আর এক পাতা ঘুমের ট্যাবলেট পাই, যেখানে ১০টি ট্যাবলেট থাকার কথা, কিন্তু মাত্র দুইটি ট্যাবলেট ছিল। মা-মেয়ে যে বিছানায় মারা গেছেন ওই বিছানাতেও রক্ত ছিল। ফ্লোরে বমি পড়েছিল, সেগুলো সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য সিআইডিকে দেয়া হয়।

সোহেল মাহমুদ বলেন, সবকিছু মিলিয়ে অনেক প্রশ্নের সূত্রপাত হয়েছে। সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা থানায় গিয়ে পুলিশের জব্দ করা আলামতগুলো দেখি। একটা বঁটি আর ২টি রক্তাক্ত ছুরি পুলিশ জব্দ করেছে। সেগুলো থেকে রক্ত সংগ্রহ করে সিআইডির কাছে ডিএনএ স্যাম্পলিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। ওই রিপোর্ট পাওয়ার পর বোঝা যাবে তাদের মৃত্যু সুইসাইডাল, নাকি হোমোসাইডাল। যে কোনো একজন অন্য দুইজনকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আপাত দৃষ্টিতে সুইসাইডাল কেস মনে হচ্ছে। যদিও ছেলের গলার কাটা চিহ্নটা আত্মহত্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকা, বিষের বোতল পাওয়া- সব মিলিয়ে আত্মহত্যাই মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, কেমিক্যাল এনালাইসিস করার পরই জানা যাবে কে বিষ খেয়েছিল। রিপোর্টে যদি মায়ের শরীরে বিষের আলামত পাওয়া যায়, তাহলে বলা যাবে, মা নিজে মেয়ে-ছেলেকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন। আর তা না পাওয়া গেলে তাহলে বলা যাবে, ছেলেই মা-বোনকে হত্যা করেছেন।

উত্তরখান থানার ওসি মো. হেলাল উদ্দিন ভোরের কাগজকে বলেন, এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে মুহিব হাসানের মামা মনিরুল হক বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। তিনি আরো বলেন, জমিজমা নিয়ে তাদের গ্রামের বাড়ি ভৈরবে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বিরোধ আছে কিনা সেগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। গ্রামে তাদের মাত্র ৩ শতাংশ জমি থাকার তথ্য পেয়েছি। কারো সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না। মূলত মুহিব হাসান তার বোনকে নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত ছিল। তার মাও অসুস্থ ছিল। প্রতিবন্ধী বোনকে একা রেখে কোথাও বেশি সময় থাকতে পারতো না। প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে, মানসিক যন্ত্রণা থেকে তারা আত্মত্যার ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।

গত রবিবার রাতে উত্তরখানের মৈনারটেকের ৩৪/বি নম্বর বাড়ি থেকে মা জাহানারা খাতুন মুক্তা (৪৭), মেয়ে তাসফিয়া সুলতানা মিম (২০) ও ছেলে মুহিব হাসান রশ্মির (২৮) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের মরদেহের পাশ থেকে দুইটি চিরকুট উদ্ধার করার পর রহস্য দেখা দেয় তাদের মৃত্যু কি হত্যা না আত্মহত্যা সেটা নিয়ে।

দ্বিতীয় সংস্করন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj