খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক : আমরা কী খেয়ে বেঁচে আছি!

বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

খাদ্যে ভেজাল বিষয়টি এখন অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক। তা নিয়ে মাঝে-মধ্যে অভিযান চালানো হয়। তবে সেটি নির্দিষ্ট কোনো সময়ে সীমাবদ্ধ থাকা সমীচীন নয়। সরকারের তরফ থেকে বিএসটিআই কিংবা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মতো সংস্থা সৃষ্টি করে দেয়া রয়েছে। তারা সারা বছরই খাদ্যে ভেজাল বিষয়ে তৎপরতা চালানোর কথা। কিন্তু তাদের দেখা যায় বছরের বিশেষ বিশেষ সময়ে সীমিত আকারে ভ্রাম্যমাণ আদালত কিংবা অভিযান পরিচালনা করে কিছু সময়ের জন্য জেল, জরিমানা ও আলামত জব্দ ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করছেন। রমজান মাস তার মধ্যে অন্যতম। রমজান মাস এলেই চোখে পড়ার মতো কিছু তৎপরতা লক্ষ করা যায়।

আর এবারের রমজান মাসের আগে এবং রমজান মাসে খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। যেখানে ৫২টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর ভেজালের কারণে মহামান্য হাইকোর্ট এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার ওপর নাখোশ হয়ে বিভিন্ন গণমুখী নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে দেশের অনেক নামিদামি ব্র্যান্ডের কোম্পানির পণ্যও রয়েছে। এগুলো পত্রিকায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আশা করি এতে ভোক্তাদের মধ্যে কিছুটা হলেও সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। অথচ আমরা যদি সামগ্রিকভাবে দেখি তাহলে কিসে ভেজাল নেই, সেটা বের করাই কঠিন হয়ে পড়বে। উদাহরণস্বরূপ ধান-চাল, আটা-ময়দা, তেল-চিনি, মসলা, মাছ-মাংস, শাকসবজি, ফলমূল, তরিতরকারি ইত্যাদি।

নমুনা পরীক্ষার পর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, গরুর খোলা তরল কাঁচা দুধে অণুজীবের সহনীয় মাত্রা ৪ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ৭ দশমিক ৬৬ পর্যন্ত। আলফাটক্সিনের সহনীয় মাত্রা ০ দশমিক ৫ হলেও পাওয়া গেছে ০ দশমিক ৯৯৬ পর্যন্ত। টেট্রাসাইক্লিনের মাত্রা ১০০ পর্যন্ত সহনীয় হলেও পাওয়া গেছে ৬৭১ দশমিক ১৩ পর্যন্ত, সিপ্রোফ্লক্সাসিনের মাত্রা ১০০ পর্যন্ত সহনীয় হলেও পাওয়া গেছে ১৪৮ দশমিক ৩৬ পর্যন্ত। কীটনাশকের মাত্রা ৫ সহনীয় হলেও পাওয়া গেছে ৯ দশমিক ৫০ থেকে ১৬ দশমিক ২০। প্যাকেটজাত দুধের ক্ষেত্রে টেট্রাসাইক্লিনের সহনীয় মাত্রা ১০০ হলেও দেশীয় প্যাকেটজাত দুধে পাওয়া গেছে ১৮৭ দশমিক ৫৮ পর্যন্ত। আমদানি করা প্যাকেটজাত দুধে এ উপাদানের মাত্রা ৭১৭ দশমিক ৮২ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। আর অলফাটক্সিনের সহনীয় মাত্রা ০ দশমিক ৫ হলেও পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৯৩ পর্যন্ত। এ থেকেই ভয়াবহতা অনুমেয়।

দুধে ভেজাল তো আছেই। তার ওপর আবার শোনা যাচ্ছে পুরোপুরি ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে নতুন দুধ নাকি তৈরি করা হয়। সে ক্ষেত্রে দুধের ছানার পানির সঙ্গে আটা-ময়দার গুঁড়া, চক পাউডার, গুঁড়া দুধ মিশ্রিত করে সঙ্গে আরো ফরমালিনসহ অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে তৈরি করা হয় এ দুধ। এমনভাবে মিশ্রণটি তৈরি করা যেখানে ল্যাকটোমিটারেও নাকি তা ধরা পড়ে না।

তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, আমরা কী খেয়ে বেঁচে আছি! শুনেছি অসাধু গোয়ালারা দুধে পানি মেশায়, কিংবা দুধে কনডেন্সড মিল্ক মেশায় আবার ভেজাল দুধকে ঘন করার জন্য ভাগাড়ের ময়লা পানি মেশায়। এসব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে নতুন দুধ তৈরি করা। হাসপাতালে ভর্তিকৃত শিশুদের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। বিষয়টি আসলেই শুধু ভয়ের নয়, আতঙ্কেরও। কাজেই সময় এসেছে রুখে দাঁড়ানোর। মহামান্য হাইকোর্ট থেকেও এসব বিষয়ে ছাড় না দেয়ার জন্য রীতিমতো আদেশ জারি করা হয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল হওয়ার এখনই সময়। তা না হলে একটি জাতি পঙ্গু হয়ে যাবে।

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

:: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj