প্রতি বছরই অতীতের রেকর্ড ছাড়ায় শিশু ধর্ষণ : অবক্ষয়ের বীভৎস বহিঃপ্রকাশ

বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ : প্রতিনিয়তই বাড়ছে শিশু ধর্ষণের ঘটনা। পরিসংখ্যান বলছে, এ ক্ষেত্রে প্রতি বছরই অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। আড়াই বছরের শিশু এবং প্রতিবন্ধী শিশুরাও ধর্ষণের মতো পাশবিকতার শিকার হচ্ছে। সরকার শিশু ও নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বললেও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ শাস্তির কোনো বাস্তবায়ন নেই। কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরও সেই শাস্তি দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর হচ্ছে না।

সম্প্রতি দেশে শিশু ধর্ষণ বেড়ে যাওয়াকে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বীভৎস বহিঃপ্রকাশ আখ্যায়িত করে সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এর পেছনে বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে। আর একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কিত। তবে মোটা দাগে সামাজিক অস্থিরতা, তথ্যপ্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ও অপব্যবহার, মাদক, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সুষ্ঠু মানসিক বিকাশের চর্চার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই দায়ী করছেন তারা।

২৬৯টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জাতীয় নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্য অনুযায়ী; ২০১৯ সালে (জানুয়ারি থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত) সাড়ে চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৪৬ জন শিশু। ২০১৮ সালে ৫৭১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ওই বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয় ২৮৬ জন শিশু। ২০১৭ ও ২০১৬ সালে ধর্ষণের শিকার হয় যথাক্রমে ৫৯৩ ও ৪৪৬। বিএসএএফর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এপ্রিল মাসে ১২২ জন এবং চলতি মাসের ১৪ দিনে ৬০ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে অন্তত দুই এবং প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ জনেরও বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। তাদের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের বড় শহরগুলোতে শিশু ধর্ষণ বেশি হচ্ছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্স এন্ড চাইল্ড প্রোটেকশন সেক্টরের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন ভোরের কাগজকে বলেন, দেশে শিশু ধর্ষণ বাড়ার পেছনে বহুমাত্রিক কারণ কাজ করছে এবং এই কারণগুলো একটি অপরটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধর্ষণের ঝুঁকি ও ভয়াবহতা বাড়াচ্ছে। প্রধানত তথ্যপ্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ও অপব্যবহারের ফলে বিকৃত যৌনাচার সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকার ফলে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধগুলোও যথাযথভাবে চর্চিত হচ্ছে না। ফলে যৌন চাহিদা নিবারণের জন্য ধর্ষক অধিকাংশ সময় অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রতিরোধে অক্ষম কাউকে বেছে নেয়, যার শিকার হচ্ছে শিশুরা। পাশাপাশি মাদক, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, আইনের ধীর ও অসম প্রয়োগ এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ধর্ষককে নানাভাবে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি এর বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পরদক্ষেপ নিতে না পারি, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে শিশু ধর্ষণের মতো বীভৎস ও গর্হিত অপরাধ সমাজের কাছে গা সওয়া হয়ে যাবে, তখন এই শিশুদের জীবন আর ভোগান্তি কেবল কতগুলো সংখ্যায় প্রকাশ পাবে।

চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী আমির হোসেনের মতে, সামাজিক অস্থিরতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই শিশু ধর্ষণ বাড়ার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, সুস্থ মানসিকতার যে বিকাশ দরকার এবং যৌন বিষয়টি যে গোপন বা খেলার বিষয় নয় এই ধারণা অনেকের মধ্যেই নেই। চারপাশে নিষ্ঠুর আচরণও বাড়ছে। যা দেখে অনেকে প্রলুব্ধ হয়। তাছাড়া শিশুরা প্রতিবাদ করতে পারে না বলে বিকৃত মানসিকতার মানুষ শিশুদের ওপর ধর্ষণের মতো পাশবিকতা করে থাকে।

ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানার মতে, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় (মৃত্যুদণ্ড) ঘোষণা হলেও রায় বাস্তবায়নের কোনো নজির নেই। যে কারণে অপরাধীরা অপরাধ করতে উৎসাহীত হয়। এই সামাজিক অপরাধগুলো বন্ধ করার জন্য দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj