খোদাভীতি জাগ্রত করাই রোজার শিক্ষা

মঙ্গলবার, ১৪ মে ২০১৯

মাহে রমজানে রোজাদার মুসলমানরা নিজেদের স্বভাব-চিন্তাধারা ও কর্মকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা-সাধনা করে। রোজা হচ্ছে সারা বছর সাবধানী পথ চলার লক্ষ্যে ঐশী প্রশিক্ষণ। রোজা মানুষের মধ্যে তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি করে। তাকওয়া মানে খোদাভীতি ও আত্মবোধের জাগৃতি। তাকওয়া মানব চরিত্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাকওয়ার গুণ অর্জন করতে না পারলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা অসম্ভব। রোজার সঙ্গে রয়েছে তাকওয়ার নিবিড় যোগসূত্র। বান্দার মধ্যে তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআন পাকে বলা হয়েছে ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছিল। আশা করা যায় তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি হবে। (আল বাকারা: ১৮৩) এখানে বলা হচ্ছে ‘লা আল্লাকুম তাত্তাকুন’ অর্থাৎ ‘তোমরা যেন মুত্তাকি হতে পার’।

তাই আমাদের জানা প্রয়োজন মুত্তাকি কারা, তাকওয়াই বা কী? মূলত তাকওয়া আরবি শব্দ। অর্থ ভয় করা, বিরত থাকা, বেছে চলা, আল্লাহভীতি, আত্মশুদ্ধি ও অসৎ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক পরিশুদ্ধ জীবন পরিচালনার নামই তাকওয়া। প্রত্যেক কাজের জন্য সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অনুভূতিকে তাকওয়া বলে। হাদিস শরিফের আলোকে তাকওয়ার সংজ্ঞা হলো- আল্লাহ্র রাসুল (দ.) যা করতে বলেছেন তা করা এবং যা করতে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা। হজরত ওমর (রাদ্বি)-এর মতে ইমান আক্বিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক সব বৈরী পরিবেশকে পাশ কাটিয়ে স্বীয় মহৎ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখে জীবনযাপন করার নামই তাকওয়া (ইমাম গাজ্জালী কৃত ইয়াহ্ইয়া উলুমুদ্দীন)।

একদা কোনো এক ব্যক্তি তাকওয়ার অর্থ জিজ্ঞেস করলে হজরত ওমর (রাদ্বি) বলেন : আপনি কি কখনো কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করেছেন? বললেন ‘হ্যাঁ! আপনি তখন কী কী করেছিলেন? ‘আমি সাবধানতা অবলম্বন করে দ্রুতগতিতে ওই পথ অতিক্রম করেছিলাম।’ বলা হচ্ছে এটাই হচ্ছে তাকওয়া। এভাবে সাবধানী পথ চলাই তাকওয়া। আর তাকওয়া সুসম্পন্ন ব্যক্তিকে মুত্তাকী বলে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে ‘যে ব্যক্তি মহান প্রভুর সামনে দাঁড়াতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছে এবং নিজেকে প্রবৃত্তির কামনা থেকে বিরত রেখেছে তার জন্য রয়েছে জান্নাতে বাসস্থান।’ মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদ্বি) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন ‘যে ব্যক্তি শিরক, কবিরা গুনাহ, অশ্লীল কাজকর্ম এবং কথাবার্তা থেকে নিজেকে বিরত রাখে তাকে মুত্তাকী বলা হয়। এ মাসের রোজা খোদাভীতির এক অনন্য উদাহরণ।

ইমাম গাজ্জালী বলেছেন জীব সত্তা যা দ্বারা প্রবল হয় সে সব রিপুকে অবদমন করে রুহের শক্তিকে বৃদ্ধি করাই রোজার সাধনা। আর এ সাধনায় অর্জিত হয় এক অকল্পনীয় আত্মশক্তি, যা সাধককে সৃষ্টিকুলের সব কিছুর ওপর এক অনন্য মর্যাদায় সমাসীন করে। তাই আল্লাহতায়ালার ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্ত হয়ে জান্নাতের অমীয় সুধা আস্বাদনে মাহে রমজানে তাকওয়ার সাধনাই করা উচিত। এ জন্য আল্লাহ বলেন- ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে সেভাবে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিত এবং প্রকৃত মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (আলে ইমরান : ১০২) মুত্তাকীদের সুসংবাদ দিয়ে আল্লাহ পাক তাদের আবাসস্থল জান্নাত বলে ঘোষণা দেন। আল্লাহর মেহেরবানী ও নৈকট্য পেতে হলে রোজার দিনগুলো ইবাদত-রিয়াজতে মগ্ন থাকতে হবে। বলাবাহুল্য, সব কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার কথা স্মরণ রেখে চললে মানুষ কখনো অন্যায় ও অপরাধে জড়াতে পারে না। আর আল্লাহভীতির চেতনা জাগ্রত হয় সিয়াম সাধনার মাধ্যমে। এই সুযোগই তো এখন আমাদের দোরগোড়ায়।

আ ব ম খোরশিদ আলম খান
লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ, সাংবাদিক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj