গরিব খুঁজে খুঁজে জাকাত বণ্টন করুন

সোমবার, ১৩ মে ২০১৯

মাহে রমজানে একটি ভালো কাজের সওয়াব বা প্রতিদান যেহেতু সত্তর গুণ পর্যন্ত বর্ধিত হয়ে আল্লাহর করুণাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়- তাই রমজান মাসে জাকাত প্রদানের প্রচলিত নিয়মটি অবশ্যই যৌক্তিক ও ইতিবাচক। পবিত্র কুরআনে নানা প্রসঙ্গে বিভিন্নভাবে প্রায় পৌনে একশ বার নামাজের সঙ্গে সঙ্গে জাকাত প্রদানের জোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ‘আক্বিমুস সালাত ওয়াতুজ জাকাত’- তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো। নামাজের মতোই জাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক ফরজ ইবাদতরূপে সাব্যস্ত করা হয়েছে। নামাজের মত জাকাত যার ওপর ফরজ হয়েছে সে নিজ তাগিদে স্বউদ্যোগী হয়েই কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হবে এই তো ইসলামের দিকনির্দেশনা।

গরিবের দিকে চেয়ে রমজানে জাকাত বিতরণ যথার্থ ও প্রাসঙ্গিক। যেহেতু গরিব দুস্থ মানুষরাও এ মাসে রোজা-ঈদ উদযাপনে শামিল হতে চায়। যদিও এদের আর্থিক সঙ্গতি ও সচ্ছলতা নেই। তাই গরিবরা যাতে রোজার মাসটি নিশ্চিন্তে শান্তিতে সচ্ছলতার সঙ্গে খেয়ে পরে পার করতে পারে- এজন্য রোজার শুরুর দিকে হিসাব করে ধনীদের জাকাত প্রদানে মনোনিবেশ করতে হবে। এ কারণেই রোজার শেষের দিকে জাকাত বিতরণের যে রীতি তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জাকাত সঠিকভাবে প্রদান ধনীদের ওপর ধর্মীয় ফরজ কর্তব্য হলেও এদিকে অনেক ধনীর দৃষ্টিপাত নেই। ঠিকভাবে জাকাত বিতরণে আগ্রহ ও সহানুভূতি যতটা থাকা দরকার ততটা চোখে পড়ে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক। ঐশী দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা প্রদর্শন দুঃখজনক। জাকাত গ্রহণের যুদ্ধে নেমে প্রতি বছর বহু লোকের প্রাণহানি ও হতাহতের খবর রমজানের শেষ দিনগুলোতে সংবাদপত্রে অহরহ চোখে পড়ে। বিগত দিনে এ ধরনের মর্মান্তিক খবর দেখে সবাই বিচলিত ও ক্ষুব্ধ হলেও কীভাবে জাকাতের নামে গরিবদের জন্য মৃত্যুফাঁদ পাতা বন্ধ করা যায় তা সরকার বা বিত্তবান কোনো পক্ষই ভাববার গরজবোধ করছে না।

মহানবী (দ.) বলেছেন, ‘আযজাকাতু কিনতারাতুল ইসলাম’ জাকাত ইসলামের সেতুবন্ধন। জাকাত আদায়ের দ্বারা বিত্তবানরা নিঃস্ব মানুষের কাছাকাছি অবস্থান তৈরি করে। পরস্পর ভালোবাসা ও সম্প্রীতি জাগ্রত হয় জাকাতের মাধ্যমে। অথচ আমরা চারপাশে যা দেখছি তা হাদিসের শিক্ষার সঙ্গে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কুরআন মজিদের সুরা তাওবার ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘ওয়াতুজ্ জাকাত ফাইখ্ওয়ানুকুম ফিদ্দ্বীন’- ওরা জাকাত দেয়ার নীতি গ্রহণ করলে ওরা তোমাদের দ্বীনি ভাই হয়ে যাবে। এখানে বলা হয়েছে জাকাত আদায় ও গ্রহণের মাধ্যমে ধনী-গরিবের দূরত্ব ঘুচে গিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো ঘটছে। জাকাত দেয়ার ঘোষণা মাইকে প্রচার করে হাজারো অভাবী মানুষকে ঘরের আঙিনায় জড়ো করে ওদের মধ্যে ঠেলাঠেলি মারামারি লাগিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত করে ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার সবক কতটুকু পালন করা হচ্ছে তাই আজ ভেবে দেখার বিষয়। প্রদর্শনীর চিন্তা বাদ দিয়ে যথাযথভাবে জাকাত আদায়ে ধনীরা সচেষ্ট হবে এটাই ধর্মীয় নির্দেশনা। নামাজের মতোই আরেকটি ফরজ ইবাদত জাকাত আদায় করতে গিয়ে আত্মম্ভরিতা বা লৌকিকতা প্রদর্শন মোটেই ইসলামের শিক্ষা নয়। নামাজের আজান শুনে নামাজি নিজ উদ্যোগেই মসজিদে ছুটে যায় নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে। অথচ যার ওপর জাকাত দেয়া ফরজ হলো সে জাকাত আদায়ে মোটেই তৎপর নয়, উদ্যোগী নয়- তাতো আল্লাহর আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, জঘন্য পাপ।

গরিব দুস্থ মানুষের সেবার মাধ্যমে প্রকারান্তরে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জিত হতে পারে। তাই পুণ্যময় রোজার মাসে সবাই দানের হাত প্রসারিত করুন। গরিবের কষ্ট ও অসহায়ত্বের বোঝা কিছুটা হলেও হাল্কা করতে এগিয়ে আসুন। গরিব খুঁজে খুঁজে জাকাত বণ্টন করে দায়মুক্ত হোন।

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ, সাংবাদিক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj