দিবসহীন মা জননী

রবিবার, ১২ মে ২০১৯


আমার মতো যাদের মা নেই তারা ভালো করেই জানেন মা না থাকা মানে মাথার ওপর আকাশ না থাকা। বাবা মারা যাওয়ার পর মনে হয়েছিল মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে গেছে। আর মা যাওয়ার পর খেয়াল করলাম আকাশটাই নেই হয়ে গেছে। মায়ের সঙ্গে বিজ্ঞানসম্মত কারণে সম্পর্ক যতটা নিবিড় স্নেহজ কারণে ততটাই গভীর। আমরা বিষয়টাকে কেবল স্পর্শাতীত ভাবলে ভুল করব। মা আমাদের আশ্রয়। এটা শুরু হয় শৈশবে। যখন সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত একমাত্র মা-ই সন্তানকে সময় দেন। তার হাঁটার শুরু, তার কথা বলার শুরু, তার খাবারদাবার-পোশাকের শুরুটাও হয় মায়ের কাছে। বড় হতে হতে প্রকৃতির নিয়মে আমরা দূরত্বে যেতে থাকি।

কৈশোর অবধি যে মা আমাদের আশ্রয় বা ভরসাস্থল সে মা তখন একটু একটু করে দূরবর্তী হতে থাকেন। বন্ধু-বান্ধব, পড়াশোনা বা নিজের জগৎ আস্তে আস্তে কেড়ে নিতে থাকে আমাদের সময়। সে ভুবনে মা তখন শুধু প্রয়োজন। কোনো সমস্যায় মা’র কাছে যাওয়ার বাইরে আর সময় থাকে না মাকে সময় দেয়ার। এর পরের পর্বটা আরেক ধরনের। বড় হতে হতে প্রকৃতির নিয়মে আমাদের জীবনে প্রেম আসে। প্রেমময় মানুষ সবকিছু গুলিয়ে ফেলবে, এটাই স্বাভাবিক। এটা এমন এক প্রবণতা, একসময় মনে হতে থাকে প্রেমই সব। প্রেমিক-প্রেমিকা ছাড়া জীবন অচল। বা এ ছাড়া আর কিছুই চাই না। এই ভ্রান্তি কিংবা মোহ কাটতে অনেক সময় লাগে মানুষের। প্রেম মন্দ কিছু না। প্রেমিক-প্রেমিকা আছে বলেই ভুবন এত মনোরম। এত গান এত কবিতা এত কথা এত ছবি সব তার প্রতিধ্বনি প্রতিচ্ছবি। তারপর ও মা তখন আরো দূরে যেতে থাকেন। সংসার, নিজেদের সন্তান-সন্ততি আর পরিবেশ মেয়েদের নিয়ে যায় শারীরিক দূরত্বে আর পুরুষরা যায় মানসিক দূরত্বে। অথচ মা তখন আর ভালো করে চোখে দেখেন না। মায়ের তখন পা চলে না। মা তখন দাঁত হারিয়ে ভালো করে খেতে পারেন না। মুখে না বললেও মায়ের অন্তরজুড়ে দূরের খোকা বা খুকির জন্য কেবলই হাহাকার।

মায়ের অন্তরে তখন দেখার তৃষ্ণা, কথা বলার তৃষ্ণা। কিন্তু আমাদের সে সময় কোথায়? এটা ঠিক না যে সন্তানরা তাকে মনে করে না। বিদেশে মনে করার রীতিটা অদ্ভুত। সেটা তাদের জন্য প্রযোজ্যও বটে। বছরে কয়েকটা দিনের সম্পর্ক বলে তারা মা দিবস নামে একটি দিবস চালু করেছে। আজকাল সে দিবসটি আমাদের দেশেও ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়। যে সন্তান মাকে দেখভাল করে না সেও সামাজিক মিডিয়ায় কেঁদে-কেটে একাকার। এর বাণিজ্যিক দিকটা বাদ দিলে বাকিটা বানোয়াট। আমরা যে সমাজ, যে দেশের মানুষ সেখানে মা শব্দটার অর্থ ব্যাপক। আমরা দেশকে মা বলি। আমাদের নদীগুলো মায়ের মতো। আমাদের গান, কবিতা, শিল্পে মা এক চমৎকার অনুভূতি। সেখানে এমন দিবস থাকা না থাকায় কিছু আসে যায় না। তারপরও ঘটা করে একদিন স্মরণ করার রেওয়াজ চলছে। যেটা আপত্তির তা হলো, জীবদ্দশায় মাকে ওষুধ-পথ্য কিংবা ভালোবাসা না দিয়ে মৃত্যুর পর উৎসব করা। হাহাকারকে আনন্দে পরিণত করা।

দোলনা থেকে মৃত্যু অবধি যার ঋণ শোধ করা অসম্ভব তাকে কোনোভাবে বৃত্তবন্দি বা ফ্রেমবন্দি করার নাম অপরাধ। আমার কাছে মায়ের নাম একটাই- জননী। তিনি যার হোন, যে দেশের হোন, তরুণী মা হোন আর বয়সী মা হোন- তিনিই জননী। আজকাল বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিও কমে আসছে বৈকি। অনেক কিছু ভালো দেখি না। কিন্তু এখনো এটাই আমার দেখা সেরা ছবি যখন আমি ব্যালকনিতে বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি ছোট শিশুর হাত ধরে দ্রুত চলে যাচ্ছেন কোনো মা। শিশুটি নিজের মনে বকবক করে চলেছে। আর মা একদিকে তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন আরেকদিকে কীভাবে তাকে নিরাপদ রাখা যায় তার চেষ্টা করে চলেছেন।

ফিরে আসতে থাকে। তখন আমার মাও আমার কাছে ফিরে আসতে থাকেন। তিনি কীভাবে কীভাবে যেন ফিরে আসতে জানেন। রোগশয্যায় কপালে হাত রেখে, শ্রান্ত হয়ে গেলে আঁচলে মুখ মুছিয়ে কাছে আসা দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান মা কখনো হারায় না।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মোস্তাফা জব্বার

মহাকাশে জয় বাংলার এক বছর

অজয় দাশগুপ্ত

দিবসহীন মা জননী

Bhorerkagoj