ভেনেজুয়েলা নিয়ে কেন এত আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার

শনিবার, ১১ মে ২০১৯

কাগজ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার মধ্যে দ্ব›েদ্বর নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ভেনেজুয়েলা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিকে ঘিরে দুই পরাশক্তির নানা পদক্ষেপে সেখানকার সংকট আরো ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোর ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পর দুই দেশই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে যে, তারা ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে।

দুই পরাশক্তির টানাটানি : একটা সময়ে মনে করা হতো যে, ভেনেজুয়েলার সংকট আসলে দুই নেতা মাদুরো আর গুয়াইদোর মধ্যকার একটি বিরোধ। কিন্তু এখন সেটা বরং রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ বলেই মনে হচ্ছে, বলছেন আমেরিকান থিংক ট্যাংক র?্যান্ড কর্পোরেশনের বিশ্লেষক জেমস ডোবিন্স।

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এটি যেন দক্ষিণ আমেরিকায় সেই পুরনো স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে ফিরে যাওয়ার মতো ব্যাপার, যখন দুই পরাশক্তির বিরোধের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিউবা।

কিন্তু কেন ভেনেজুয়েলা নিয়ে এই টানাটানি : এর আসলে কোনো সহজ উত্তর নেই। রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক স্বার্থের ব্যাপারটি এখানে মিলেমিশে দেশটির বর্তমান সংকট তৈরি করেছে। কীভাবে রাশিয়া মাদুরোর বন্ধু হয়ে উঠল আর যুক্তরাষ্ট্র হয়ে গেল শত্রু : উগো চ্যাভেজের শাসনামলে (১৯৯৯-২০১৩) ওয়াশিংটন এবং কারাকাসের মধ্যে মাঝেমাঝে উত্তেজনা হয়েছে, কিন্তু দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য অব্যাহত ছিল। বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং অনেক তেল পরিশোধনাগার শুধুমাত্র আমেরিকায় তেল পাঠানোর জন্যই কাজ করতো, ব্যাখ্যা করছেন ডোবিন্স। কিন্তু ২০১৩ সালে মি. মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে। দেশটির অনেক ব্যক্তি এবং কোম্পানির বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করা হলে সংকট আরো ঘনীভূত হয়। যখন ভেনেজুয়েলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, তখন রাশিয়া আরো ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। রাশিয়ার অনেক আন্তর্জাতিক নীতিতে সমর্থন দিতে শুরু করে ভেনেজুয়েলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৪ সালে ক্রাইমিয়াকে সংযুক্ত করার পর রাশিয়া যে কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছিল, সেটি কাটাতে মস্কো অন্যত্র বন্ধু খোঁজার চেষ্টা শুরু করে। ‘মস্কো এখন এমন দেশ খুঁজছে, যারা আগ্রহের সঙ্গে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক করবে, আর এরকম একটি দেশ হলো ভেনেজুয়েলা’ বলছেন ইউক্রেনে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্টিভ পিফের, যিনি এখন মার্কিন থিংক ট্যাঙ্ক ব্রকিংস ইনস্টিটিউটে গবেষণা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র যত সরে যেতে শুর করেছে, রাশিয়া ততই ভেনেজুয়েলার সঙ্গে জড়িত হতে শুরু করে। গত এক দশক ধরে রাশিয়ার তেল কোম্পানি রোসনেফ্ট দেশটির তেল খাতে তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েই চলেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেন, ২০০৬ সাল থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার ঋণের বদলে তেল নিয়েছে রোসনেফ্ট ও রাশিয়ার সরকার।

ডোবিন্স বলছেন, রাশিয়ার ঋণ পুরোপুরি পরিশোধের ক্ষমতা নেই ভেনেজুয়েলার সরকারের। আর দেশটিতে ক্ষমতার পরিবর্তন মানে হলো তাদের অর্থকড়ি ফেরতের সম্ভাবনা আটকে যাওয়া।

সবকিছুই কি তেল কেন্দ্রিক : এটা ভেনেজুয়েলা সরকারের জনপ্রিয় ¯েøাগান : মাদুরো বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে আসছেন যে, তারা দেশটির তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। ডবিন্স বলছেন, সন্দেহ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভেনেজুয়েলা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সেই সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে চাইবে। কিন্তু আমি এই অভিযোগ মানতে রাজি নই যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেও মস্কো থেকে পাওয়া সমর্থনের প্রশংসা করছে ভেনেজুয়েলার প্রশাসন।

কলম্বিয়ার রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক ভøাদিমির রোভিন্সিকি বলছেন, রাশিয়ার কাছে আসলে তেল নয়, ভেনেজুয়েলায় অন্য স্বার্থ রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ব্যবসার দিক থেকে রাশিয়ার অনেক বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়েছে। ভেনেজুয়েলার তেলের খনি থেকে লাভ করতে হলে সেখানে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হবে। রাশিয়ানরা আসলে মাদুরো সরকারকে সহায়তা করার জন্য এই আবরণ দিয়েছে। কারণ রোসনেফ্টের যেখানে নিজস্ব তেল খনি রয়েছে, সেখানে ভেনেজুয়েলার তেলের পেছনে এত বেশি অর্থ বিনিয়োগ করার কোনো মানে নেই।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj