দিন যায় কথা থাকে : কনকচাঁপা

শনিবার, ১১ মে ২০১৯

লেখার কলম আমার কখনোই তার তারল্য হারায় না। লিখতে গেলে আমি আবেগপ্রবণ হই, কখনো রাগান্বিত কিন্তু কলম আমার যমুনার জলের মতো চলতেই থাকে কিন্তু আজ? কাল রাতে মৌর সঙ্গে ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে কথা হচ্ছিল। ফাল্গুনী নন্দী মৌ সুবীরদার একমাত্র কন্যা। শেষ চিকিৎসায় মৌ তার বাবার সঙ্গে অবস্থান করছে। ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার আশঙ্কা হচ্ছিল সুবীর দা আজকের রাতটা পেরোতে পারবেন না। মৌকে শক্ত হতে বললাম। কিন্তু ওকে আমি শক্ত হতে বলে নিজেই আর ঘুমাতে পারছিলাম না। প্রায় সারারাতই জেগে আধাঘুমে পার করে সেহরি খেতে উঠে ইচ্ছে করেই ফোন বন্ধ করে দিলাম। কারণ কোনো দুঃসংবাদ নেয়ার মতো শক্তি পাচ্ছিলাম না।

না আমি সুবীর দার মেয়ের বয়সী, না সুবীরদা আমার বাবার বয়সী কিন্তু আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছিল বাবা-মেয়ের মতো। উনার কাছে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে কখনো কিছু শিখিনি বটে কিন্তু উনাকে আমি আমার অজান্তেই শিক্ষকের জায়গায় স্থান দিয়েছি। কত অনুষ্ঠানে এক সঙ্গে গেয়েছি তা আসলেই অগুনতি। অনুষ্ঠানে সুবীরদা থাকলে আমি যে সেই অনুষ্ঠানে গাইব তা আমার কাছে গৌন হয়ে শ্রোতা হিসেবে গান শোনাটাই মুখ্য হয়ে উঠত। আমি ও আমার জীবনসঙ্গী সুরকার সঙ্গীত পরিচালক মইনুল ইসলাম খান সাহেব বলাবলি করতাম যে উনার কণ্ঠে কি আছে! উনি ও বলতেন আসলেই সুবীরদার কণ্ঠে যেন অটো রিভার্ব ডিলে ইকো সব দেয়া আছে। দিনদিনই যেন তার কণ্ঠ আরো খুলে যাচ্ছিল! খুব সাদামাটা পোশাকে সাদামাটা ভঙ্গিতে মঞ্চে গাইতে উঠলেই তার কণ্ঠ জাদু ছড়াতো প্রতিদিন। বিক্ষিপ্ত শ্রোতারা সারিবদ্ধ হয়ে বসে যেত সুবীরদার গান শুনতে।

তিনি তার সুমধুর কণ্ঠে প্রেমের আবেগ, অনুরাগ, কটাক্ষ, দেশপ্রেম সব একত্রিত করে যেন মাখনে মেখে পরিবেশন করতেন। আমরা শিল্পীরা মধু তুলসীপাতা খাই গলা ঠিক রাখতে কিন্তু সুবীরদার কণ্ঠটাই ছিল মধুতুলসীর যোগ! উনি যত বড় শিল্পী ছিলেন ঠিক ততটাই নমনীয় মানুষ ছিলেন। কখনো কোনো উপলক্ষে নিমন্ত্রণ করলে কি খুশি হয়ে সপরিবারে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতেন! এবং খুব আনন্দিত সময় কাটাতেন যেন এই নিমন্ত্রণের জন্য উনি অপেক্ষা করছিলেন। কখনই তারকাসুলভ ভঙ্গিতে উনি বলেননি না কনক আমার অমক কাজ আছে আসতে পারব না।

আমি কোনো পুরস্কার পেলেই ফোনে আশীর্বাদ জানাতে ভুলতেন না। আমার পুরো পরিবারকে উনি খুব ভালোবাসতেন। সারা বাংলাদেশ আজ একটি সুরেলা অধ্যায়কে হারালো যা আসলে অপূরণীয়। আমরা আর তাকে গাইতে দেখব না এটা ভাবলেই আমি ঘেমে যাচ্ছি। আমি আর এত চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না। একসঙ্গে সবাই চলে গেলে বেঁচে থাকার প্রেরণা পাবো কাদের কাছ থেকে! লেখাগুলো বা কথাগুলো নাটকীয় মনে হলেও আমি এভাবেই ভাবি। একের পর এক হারাচ্ছি আর হারাচ্ছি। আমি আর হারাতে চাই না। আমার মন বড়ই ভারাক্রান্ত।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj