সুবীর গান করত হৃদয় দিয়ে : মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান

শনিবার, ১১ মে ২০১৯

আমি তখন সিলেট রেডিওতে। ১৯৭৬ সালে একবার ট্যালেন্ট হান্টের জন্য হবিগঞ্জে গিয়েছিলাম। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয়। সে তখন সিলেট বেতারের শিল্পী। সেখানেই তার গান শুনেছি, আড্ডা দিয়েছি। ঢাকায় আসার পর প্রথম সে আমার গান করে। সত্য সাহা এসে বললেন, একটা গান করতে হবে সাবিনার জন্য। আরেকটা করতে হবে নতুন এই ছেলেটার জন্য। আমি বললাম, এই ছেলে আমার পরিচিত। আমি তার জন্য লিখলাম, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, শত্রু বলে গণ্য হলাম’। এ গানের সঙ্গে আমরা আরো দুটো গান করেছিলাম। একটি খন্দকার নুরুল আলমের সুরে ‘পাহাড়ের কান্না দেখে’, আরেকটা ছিল ‘বধূয়ার মান ভাঙাতে জীবন গেল’। তখন আমাদের একটা পরিকল্পনা ছিল। সেটা হচ্ছে, একজন শিল্পীর দুটি বা তিনটি করে গান একসঙ্গে প্রকাশ করব। একটা না একটা তো জনপ্রিয় হবেই। সুবীরের ক্ষেত্রে দেখা গেল, তিনটি গানই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল। ১৯৭৬-৭৮ আমরা একসঙ্গে রেডিও-টেলিভিশনে বহু গান করেছি। সেগুলোর মধ্যে আছে বহু দেশের গান, আধুনিক গান। আমার লেখা ও তার গাওয়া ‘কত হাজার বছর ধরে’, ‘গলির মোড়ের ভাঙা বাড়ি’ গান দুটি অসাধারণ দুটি দেশের গান। যখন চলচ্চিত্রের জন্য গান লিখতে শুরু করলাম, এমন কোনো ছবি ছিল না, যেখানে সুবীরকে দিয়ে গান করানোর কথা আমি ভাবিনি। বিশেষ করে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রগুলো। ‘শুভদা’ ছবির ‘তুমি এমনই জাল পেতেছো সংসারে’ কী চমৎকার যে সে গেয়েছে। আমার মনে হয়, সুবীর ছাড়া আর কারো পক্ষে এভাবে গানটা করা সম্ভব ছিল না। তারপর ‘চন্দ্রনাথ’ ছবির ‘অবুঝ নদীর দুই কিনার’, রামায়ণ পাঠের সঙ্গে গানটা কী দুর্দান্ত যে সে গেয়েছে …। তারপর দেবদাসের শেষ যাত্রায় গাড়োয়ানের গান ‘মনরে ওরে মন, সুখ পাখি তোর হইল না আপন’ গানটা। বাদ্য ছাড়া গরুর গাড়ির চাকার শব্দ, গরুর গলার ঘণ্টি আর ঝিঁঝি পোকার শব্দ। ‘বিরাজ বৌ’ ছবির ‘বধূ তোমার আমার এই যে পিরিতি’ গানটির কথাও বলতে হয়। অনেক সময় গান লেখার সময়ও সুবীর উপস্থিত থাকত। সুর করার সময় সুর তুলে নিত, তারপর নিজের মধ্যে সুরটা বসাত। রেকর্ডিংয়ের সময় অনুশীলন করত। এখনকার শিল্পীদের সেই সময় নেই। তারা পাগলের মতো অর্থের পেছনে ছুটছে। স্টুডিওতে গিয়ে এক লাইন সুর শুনছে আর গেয়ে দিচ্ছে। ফলে সামগ্রিকতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই শিল্পীরা গান করছে কণ্ঠ দিয়ে, সুবীর গান করত হৃদয় দিয়ে। এই যুগে তার মতো শিল্পী আমরা আর পাব না। আবার যদি কখনো সুস্থির সময় ফিরে আসে, তখন হয়তো পাওয়া যাবে। গানে যে সাধনা, ত্যাগ, আত্মনিবেদন দরকার সেটা যদি কেউ ভাবে, গানকেই যদি নিজের জীবন ভাবে, তাহলে হয়তো সুবীরের মতো শিল্পী আমরা পাব। কিন্তু আমি আর সেই ভরসা পাই না। তার

মতো এমন অমর গানের শিল্পী ৫০ বা ১০০ বছরে হয়তো এক একজন আসে। আমরা যা হারালাম, সেটা পূরণ হওয়ার নয়। আমাদের আরো কয়েকজন শিল্পী আছেন, তাদের যদি যতœ না করি, তাহলে তাদের হারিয়েও আমাদের আফসোস করতে হবে। আমি মনে করি, সে যে ‘সুবীর নন্দী’ হয়েছে, এর পেছনে আমাদের কোনো অবদান নেই। কেবল একটু সহযোগিতা ছিল। তার শক্তি, গুণ, ক্ষমতা ও সাধনা ছিল। এসবের বলেই সে সুবীর নন্দী হয়েছে। আমরা একটু কেবল হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমরা চাইলেই কোনো শিল্পীকে সুবীর নন্দী বানিয়ে দিতে পারব না। অনেক সময় আমরাই ধন্য হয়েছি এই কারণে যে, তারা আমাদের গানগুলো দরদ দিয়ে গেয়েছে।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj