চলুন, বন্ধুত্বে বাঁচি

শনিবার, ১১ মে ২০১৯

আনোয়ার আবসার

আমি এক নিতান্ত অগোছালো মানুষ। সবাই ঘুরন্তিসে ১৮ বয়সের ছবি দেয়, আমি দেই ত্রিশের ছবি কারণ আমি কখনো জীবনের ছবিগুলোর যতœ নেইনি। সবাই পাফোতে তাদের লেখালেখি নিয়ে পত্রিকার কাটপিস দেয়, আমি দিতে পারি না। আমি কখনো কোনো সংখ্যা রাখিনি।

আমি কখনো আমার মুক্তগদ্য টাইপ লেখালেখিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবিনি, ভেবেছি লেখালেখির জগতে এসবের কোনো আবেদন নেই। এখন এই উষ্ণতরো বন্ধুভাবাপন্ন দিনগুলোয় এসে মনে হয়- আমার বর্ণাক্ষর, আমার সম্পদ ছিল।

আমার এও মনে হয়, ক্ষতি কি হতো যদি মুক্তগদ্য আমাদের লেখালেখির একটা জায়গা দখল করে নিত! এসব মনে হওয়া টাইপের ব্যাপারগুলোর একটা সূ² কারণও আছে।

‘একটি আধো আলো, আধো ছায়ার সুনসান রেস্তোরাঁ, তুমি আর আমি পরস্পর মুখোমুখি। তোমার দেহ হতে সৌন্দর্যের ছায়া গলে গলে নেমে আসে ঈষদুষ্ণ কফির পেয়ালায়, আমি যতœ করে তুলে নেই চুমুকে, ঠোঁটের পাকস্থলিতে’- আমি জীবনে এই টাইপের রোমান্সকর ব্যাপার স্যাপার লিখতে সিদ্ধ হইনি। লিখেছি অন্তর্দহন নিয়ে, লিখেছি বোধের মানচিত্র থেকে ছিটকে পড়া প্রান্তজন নিয়ে- আলফ্রেড সরেন, এখনো অভিঘাত হয়ে ফিরে আসে। ওই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র লেখালেখির কিছু অন্ত্যজ চরিত্র এখনো আমাকে বুঁদ করে রাখে। আমি সেসবের অযতœ করেছি।

৩ তারিখের মিলনমেলায় মঞ্চ কেন্দ্রিক প্রোগ্রামের কারণে অনেককে মিস করেছি। দীর্ঘ যুগ ধরে যাদের নাম জানি, তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারার মধ্যে যে পুলক, তা অনির্বচনীয়! কিমি, শাম্মী, একাধিক পলি এদের দেখেছি কিন্তু আলাদা করে বুঝতে পারিনি কে কোন জন! একজন নাম জিজ্ঞেস করলে বলি, আমি মরিযাদ হারুন! তিনি আত্মহারা হয়ে বললেন, বহুদিনের পরিচিত নাম। ভাবলাম, সরে যাই, যদি হারুন চলে আসে!

একজন বন্ধুকে (বুকে অনুষ্ঠানের আইডি ঝুলানো কিন্তু দেখতে কর্পোরেট টাইপ, গায়ের রঙ ফর্সা, পরনে কালো অথবা ডার্ক ব্লু পোশাক) নাম জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, তিনি খুব গা বাঁচিয়ে হেঁটে চলে গেলেন! হায় খোদা, আমাকে ইরাম নাদান বানিয়ে ছেড়ে দিছো ক্যানো (চাইলেতো আরেকটু রক্ষণশীল করতে পারতে)!

মম চিত্তে, নিতি নৃত্যের সঙ্গে কী অসাধারণ মুদ্রায় নিজেকে সঁপেছে ক্ষুদে নৃত্যশিল্পী। কী ফুটফুটে অভিব্যক্তি! পরে অঞ্জন দা বললেন, সে আমাদের নাদিম ভাইয়ের প্রিয় বোন। বুঁদ হয়ে তার নৃত্য উপভোগ করছিলাম। ফকির শাহাবুদ্দিনের গায়কী ঢং আর লৌহদরাজ কণ্ঠ মাতাল করে দিচ্ছিল। নাচতে পারি না কিন্তু নাচন আমায় ডাকছে। ঝিম ধরে বসে আছি। আমার বউ সাবধান করেছে, আমার নাচ কোনো নাচের পর্যায়ে পড়ে না। কিন্তু জয়দীপ দে শাপলু যখন উঠে নাচতে শুরু করেছে, তখন হয়ে উঠি সাহসী তৈমুর লং। নেচেছি, নৃত্যমঞ্চে তুলে এনেছি হাফিজ ভাই, অঞ্জন দা, কলি আপাসহ অনেককে। মনের কুণ্ঠা ততক্ষণে মরে প্রেতাত্মা হয়ে গেছে।

নাচন-কুদনের পর চেয়েছি চিরচেনা অদেখা বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় চেষ্টার ব্রতখানি আবার কাঁধে তুলে নিতে। কিন্তু ক্লান্তি আর তাপমাত্রায় তা উবে যায়। ভাবছিলাম, সবার জন্য অতি সংক্ষেপ একটি পরিচিতি পর্ব নিশ্চয় থাকছে। তা থাকলে ভালো হতো। প্রতিটি বন্ধু কত অসাধারণ মন নিয়ে পরস্পর সান্নিধ্যে এসেছি কিন্তু অদেখাই রয়ে গেলাম অনেকে।

আমাদের সবারই চল্লিশের বেশি বয়স। এখনো বেঁচে আছি, এই এক বড় প্রাপ্তি। কবে কে নাই হয়ে যাবো, আরো যারা বেঁচে থাকবে, তাদের মননেই আমরা বসবাস গড়ে তুলবো- এই তো। এছাড়া আর কী! চলুন মরণের আগে সবাই বাঁচি, বন্ধুত্বে।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj