বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা নিয়ে কিছু কথা

শুক্রবার, ১০ মে ২০১৯

আহমদ রফিক

রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ভুবনে এক বিস্ময়কর প্রতিভা। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখা তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ, এমনকি সঙ্গীত, নৃত্যকলা ও চিত্রশিল্প সম্পর্কেও একই কথা খাটে। এসবের পাশাপাশি সমাজ, সম্প্রদায় ও রাজনীতির মতো বহুবিধ বিষয় নিয়েও তাঁর বক্তব্য ও মতামত শিক্ষিত মানসে প্রশ্ন ও ভাবনার জন্ম দিয়েছে। স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিকতা ও ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্য তাঁর জীবদ্দশায়ই স্বদেশে-বিদেশে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তাঁর মৃত্যুর পরও ওই ধারা অব্যাহত। অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে যে, ১৯৯৫-তে পৌঁছেও এন্ড্রু রবিনসনের মতো লেখক-বুদ্ধিজীবী রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভা চিহ্নিত করেও একাধিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও সেসব প্রশ্ন সব সময় তথ্য ও যুক্তির পথ ধরে চলেনি।

এমন একজন ব্যক্তি যে পাকিস্তানি রাজনীতি-সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের টানে। সম্প্রদায়গত বৈষম্য ও বিভেদের পথ ধরে স্বাতন্ত্র্যবাদিতার প্রকাশ একদা বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রবল হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে গত চল্লিশের দশকে। তখন পাকিস্তানবাদী লেখক-বুদ্ধিজীবীদের বিচারে রবীন্দ্রনাথ খুব একটা গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সংস্কৃতির বিবেচনা ছিল প্রধান।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পূর্বোক্ত ধারণা আরো জোরালো হয়ে ওঠে। স্বভাবতই পাকভূমিতে রবীন্দ্রসাহিত্যের চর্চা স্বভাবিক পথ ধরে চলতে পারেনি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসরণ তো দূরের কথা। তৎকালীন পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ লেখক-বুদ্ধিজীবীর মনে রবীন্দ্রনাথকে ঐতিহ্য হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দ্বিধা-সংশয় কাজ করেছে, কারও কারও মধ্যে বিরূপতাও উপস্থিত ছিল। অন্যদিকে শাসক শ্রেণির রক্ষণশীল চেতনায় রবীন্দ্রনাথ পাকিস্তানি আদর্শের পরিপ্রেক্ষিতে ‘অ্যালিয়েন’ বিবেচিত হয়েছেন।

ফলে সংস্কৃতি অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন দূরের মানুষ। রবীন্দ্রসাহিত্যের চর্চা তখন সহজ-স্বচ্ছন্দ থাকেনি। এদিকে প্রগতিবাদী বা উদার চেতনার সাহিত্যিকদের আগ্রহ ছিল ঢিলেঢালা। রবীন্দ্রসাহিত্য বিষয়ক রচনাদি থেকে তা বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথ তাই শিক্ষায়তনের পাঠ তালিকাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন। তাঁর সাহিত্য নিয়ে চর্চা ও সৃষ্টি একপা-দুপা করে হেঁটেছে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা সীমাবদ্ধ থেকেছে ব্যক্তি বিশেষের বিরল চৌহদ্দিতে আর ঢাকা বেতারের কিছু পরিবেশনায়। পঞ্চাশের দশকে সফল ভাষা আন্দোলন (ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২) সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে পাকরক্ষণশীলতার বাঁধ অনেকাংশে ভেঙে দেয়। এর ধারাবাহিক উত্তরপ্রভাবে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায় সম্প্রদায় চেতনার প্রভাব কমে আসে এবং প্রগতি-চেতনার প্রকাশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। তা সত্ত্বেও সাহিত্যের অ্যাকাডেমিক বা আধুনিকতার চর্চা ততটা প্রসার লাভ করেনি। হয়তো তাই রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে বৈদগ্ধের চর্চাও গুরুত্ব পায়নি। বরং তুলনায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা কিছুটা হলেও এগিয়ে ছিল। দেশ বিভাগের পরপরই রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চায় যে শূন্যতা দেখা দেয় তা পূরণ হতে সময় লেগেছে। শুরুতে আবদুল আহাদ ও কলিম শরাফীর মতো দু’একজন এ বিষয়ে তৎপর হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট ছিল। ঢাকা বেতারে তখন লায়লা আর্জুমান্দ বানু, অঞ্জলি মুখোপাধ্যায় বা কাজী শাজাহান হাফিজের মতো দু’চারজন শিল্পীই রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। কিছুকাল পর রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন আতিকুল ইসলাম, ফজলে নিজামী, সনজিদা খাতুন প্রমুখ একাধিক সঙ্গীতশিল্পী। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালন এবং ১৯৫৪ সালে সরকারবিরোধী যুক্তফ্রন্টের বিজয় ও সরকার গঠনের পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিবাদী সংস্কৃতি চর্চার অনুক‚ল পরিবেশ তৈরি হয় এবং তাতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চাও আনুক‚ল্য পায়। একুশ-পরবর্তী সংস্কৃতি সম্মেলনগুলোর সাঙ্গীতিক অনুষ্ঠানে এর প্রমাণ মেলে। বাহান্নর আগস্টে কুমিল্লায় এবং চুয়ান্নর এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সংস্কৃতি সম্মেলনে পরিবেশিত রবীন্দ্রসঙ্গীতের শ্রোতা-দর্শকপ্রিয়তা ছিল লক্ষ করার মতো। কলিম শরাফী, আতিকুল ইসলাম ও ফজলে নিজামী থেকে মাহবুবা হাসনাত, ফরিদা বারি প্রমুখ অনেকে এ সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। পঞ্চান্ন সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বাফা’র (বুলবুল ললিতকলা একাডেমি) রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগ রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চায় বিশেষ অবদান রাখে, এ ছাড়া ব্যক্তিগত চেষ্টা তো ছিলই। তখন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা ও জনপ্রিয়তা দুই-ই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে এবং সে ধারা এখনো অব্যাহত। অবশ্য গানের তুলনায় রবীন্দ্রসাহিত্যের চর্চা ধীর পায়ে এগিয়েছে। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও আশ্চর্য যে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ খায়রুল বাসারের ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ’ প্রকাশ পায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিশ বছর পর (১৯৬৭) এবং এক বছর পর আ ন ম বজলুর রশীদের রবীন্দ্রনাথ। দুটোই ছিল প্রশস্তিবাচক রচনা, বীক্ষণধর্মী নয়। ঢাকায় ও দেশের অন্যত্র রবীন্দ্রজন্মশত বার্ষিকীর (১৯৬১) অনুষ্ঠানই সম্ভবত রবীন্দ্রচর্চায় লেখকদের সচেতন করে তোলে, হয়তোবা সরকারি বাধা নিষেধের কারণে। তবু এক দশকে রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রসাহিত্যচর্চার উল্লেখযোগ্য ফসল হাতে গোনা কয়েকটি গ্রন্থ। এর মধ্যে আবার অভিসন্দর্ভ-নির্ভর গ্রন্থও রয়েছে (যেমন সৈয়দ আকরম হোসেনের)। এ সময়ে রবীন্দ্র অধ্যয়নের গ্রন্থবদ্ধ শৈল্পিক প্রকাশের ক্ষেত্রে পথিকৃত নিঃসন্দেহে আনোয়ার পাশা ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (শহীদ)। অবশ্য পূর্বোক্ত সময় পরিসরে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে পত্রপত্রিকায়। আনিসুজ্জামান সম্পাদিত (১৯৬৮) ‘রবীন্দ্রনাথ’ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ সংকলন।

লক্ষণীয় যে পাকিস্তানি শাসকদের রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান হয়ে ওঠে জটিল। সরকারি বিরূপতার কারণে উদারনৈতিক লেখক-বুদ্ধিজীবীগণ রবীন্দ্রনাথের পক্ষে দাঁড়িয়ে যান এবং রবীন্দ্রনাথ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। এ অবস্থা চলেছে গোটা পাকিস্তানি শাসনামল জুড়ে। তাই এ সময়কার রবীন্দ্রবিষয়ক রচনায় শৈল্পিক উৎকর্ষের চেয়ে রবীন্দ্রনাথকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় যুক্তিতর্কই প্রধান হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে পড়েন।

দুই.

রবীন্দ্রচর্চার ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত অবস্থার পরিবর্তন ঘটে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথের স্বদেশিচেতনার গানে স্বাদেশিকতায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষিত বাঙালির জন্য প্রেরণাদায়ক হয়ে উঠেছিল। পরিণামে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সেইসঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চায়ও যথেষ্ট উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে, রবীন্দ্রনাটকের পরিবেশনা দর্শকের চিত্তজয় করেছে। রবীন্দ্রসাহিত্যের চর্চা ক্রমশ পরিণতির স্বাক্ষর রেখেছে।

অবস্থার পরিবর্তন সত্ত্বেও স্বাধীনতা লাভের পরপরই সাপ্তাহিক বিচিত্রাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি। অল্প সময়ে অনেক লেখা হয় রবীন্দ্রনাথের পক্ষে-বিপক্ষে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী লেখেন যে রবীন্দ্রনাথ তার কল্যাণবোধ নিয়ে আমাদের জন্য উদ্দীপনার উৎস। কবি হাসান হাফিজুর রহমান অবশ্য রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ইতি ও নেতির দুদিকই ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছেন। তবে শ্রেণিসংগ্রামে উদ্দীপ্ত কোনো কোনো তরুণ এ বির্তকে অংশ নিয়ে ‘রবীন্দ্রনাথ শ্রেণি সংগ্রামের প্রেরণা নন’ বলে মন্তব্য করেছেন। প্রায় একই সুরে প্রবীণ অধ্যাপক আহমদ শরীফের মন্তব্য : রবীন্দ্রনাথ আমাদের ঐতিহ্য, তবে সম্পদ নন। তার সাহিত্য এখন আর আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে না। এরপরও নানা প্রসঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের মাটি থেকে নির্বাসনে পাঠাতে চেয়েছেন। তার বক্তব্যে যুক্তির চেয়ে ব্যক্তিগত অপছন্দই যেন বড় হয়ে উঠেছিল। তার রবীন্দ্র-মূল্যায়ন খারিজ করে দিয়ে অধ্যাপক আসহাবুর রহমান রবীন্দ্রনাথকে শেকসপিয়র, গ্যেটে প্রমুখ কালজয়ী লেখকের সঙ্গে এক সারিতে বসিয়ে সিদ্ধান্তে আসেন যে, রবীন্দ্রসাহিত্যে মানবিক আবেদনই বড় কথা। এ ধরনের বিতর্কের মধ্যেই স্বাধীনতা-উত্তরকালে রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র-সাহিত্যের বিচার-বিশ্লেষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রা অর্জন করে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প-উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধাদি নিয়ে লেখা হয় বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ ও বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধ। রবীন্দ্রনাথের গান এবং ছবিও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, তবে সংখ্যায় খুবই কম। স্বীকার্য যে এ সময়ের রচনায় রবীন্দ্রপক্ষ সমর্থন বা রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে সাদামাটা আলোচনা প্রধান, যদিও ব্যতিক্রম নেহাত কম ছিল না।

রবীন্দ্র বিষয়ক রচনার একটি তথ্য বিবরণীতে (আবদুর রাজ্জাক) দেখা যায় ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সময় পরিসরে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা যেখানে তেরো, পরবর্তী একই সময়ে (১৫ বছরে) তা বেড়ে ৩৪-এ উন্নীত। পরে এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে অধিকতর হারে বেড়েছে। তবে ওই বৃদ্ধি শুধু সংখ্যাতেই নয় রচনার উৎকর্ষ বিচারেও বটে। প্রকৃতপক্ষে গত দেড় দশকে রবীন্দ্রসাহিত্যের চর্চায় যেমন বৈচিত্র্যের প্রকাশ ঘটেছে তেমনি মননশীলতার পরিচয়ও পরিস্ফুট হয়েছে। ভক্তির চেয়ে যুক্তিই প্রাধান্য পেয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রসাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ ও গ্রন্থাদির দশকওয়ারি হিসাবে এটা স্পষ্ট যে সময়ের ধারাবাহিকতায় রচনাসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি গুণগত মানেরও উন্নতি ঘটেছে। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রসৃষ্টির পাশাপাশি ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকেও নানা দিক থেকে মূল্যায়নের চেষ্টা চলেছে। শেষোক্ত প্রসঙ্গে কখনো ব্যক্তিগত অসূয়াও প্রকাশ পেয়েছে। যেমন রবীন্দ্রনাথের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে (১৯৮৬) অধ্যাপক আহমদ শরীফের রবীন্দ্র মূল্যায়ন। অবশ্য এ সময়ে এ জাতীয় রচনা বলা চলে বিরল ব্যতিক্রম, বরং তথ্যনিষ্ঠ ইতিবাচক রচনাতেই রবীন্দ্রচর্চার প্রকাশ ঘটেছে।

তিন.

এতসব সত্ত্বেও এমন প্রশ্ন অর্বাচীন নয় যে বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা কি যুক্তিসঙ্গত স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে? এ প্রশ্নের যথার্থতা অস্বীকার করা চলে না যখন দেখা যায় স্বাধীনতা-উত্তর দীর্ঘ সময়ের পরও জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র গবেষণার উপযোগী কোনো প্রতিষ্ঠান জন্ম নেয়নি। অবশ্য বেসরকারি খাতে অর্থাৎ ব্যক্তিগত চেষ্টায় অনেক দেরিতে হলেও গঠিত হয়েছে ‘রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র’ নামে একটি ট্রাস্ট-প্রতিষ্ঠান (১৯৮৯)। আগেই বলা হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চায় নিবেদিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কেন এ ধরনের দ্বিচারিতা তা অবশ্যই গবেষণার দাবি করতে পারে। দ্বিচারিতার প্রশ্ন এ কারণে যে স্বাধীন বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন, মৃত্যুদিন স্বচ্ছন্দ পরিবেশে, গভীর উৎসাহে পালিত হয়ে থাকে। এমনকি ১৯৯০ সাল থেকে সরকারি উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে যেমন ঢাকায় তেমনি রবীন্দ্রস্মৃতি বিজড়িত শিলাইদহ-শাহাজাদপুর-পতিসর ও খুলনার দক্ষিণডিহিতে। সরকারি মঞ্চ থেকে উচ্চারিত হয়ে থাকে এ ধরনের প্রশস্তিসূচক রবীন্দ্রমূল্যায়ন : ‘বাঙ্গালী সংস্কৃতির অনন্য রূপকার রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরকালের অহঙ্কার’ (১৩৯৭), ‘আমাদের জাতীয় জীবনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের অসামান্য অবদান অতীতে যেমন পথ নির্দেশনা দিয়েছে… বর্তমানে অনুপ্রাণিত করেছে আত্ম আবিষ্কারে’ (১৩৯৮), ‘দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন আমাদের জন্য এক পরম নির্ভরতা’ (১৪০২)। উপরে উদ্ধৃত কথাগুলো আমরা পেয়েছি জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় মূল বক্তব্য হিসাবে।

বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে যেমন রবীন্দ্রনাথের জন্ম-মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক উদযাপন চলে তেমনি মাঝেমধ্যে চলে আলোচনা অনুষ্ঠান। অ্যাকাডেমিক চৌহদ্দির বাইরে রবীন্দ্রনাথ যথারীতি উপস্থিত। উৎসবে, অনুষ্ঠানে, বিনোদনে, বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথকে না হলে চলে না। এমন কি সাহিত্যগ্রন্থ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, আবাসন বা অনুরূপ কিছুর নামকরণের জন্যও সংস্কৃতিমনস্কদের কাছে। রবীন্দ্রনাথ অবশ্যপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠেন। নানা কাজে রবীন্দ্ররচনার পঙ্ক্তি উদ্ধার অপরিহার্য বিবেচিত হয়ে থাকে। আর যে কোনো উপলক্ষে রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠানে দর্শক উপচে পড়ার দৃশ্য হয়ে ওঠে অবাক করার মতো ঘটনা।

তা সত্ত্বেও পূর্বোক্ত কথায় ফিরে গিয়ে প্রশ্ন করতে হয় যে রবীন্দ্র সাহিত্যের চর্চা ও উপযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ার দিকে রবীন্দ্রমনস্কদের উদ্যোগ বিরল ঘটনা কেন? ছায়ানট, উদীচী, রবিরাগ ইত্যাদি তো মূলত রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা ও শিক্ষাদানের প্রতিষ্ঠান, পূর্ণাঙ্গ রবীন্দ্রচর্চার নয়। এই না হওয়ার পেছনে কোনো গূঢ় কারণ নিহিত রয়েছে কিনা তা ভেবে দেখার মতো বিষয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের জনমানসে রবীন্দ্রনাথের গান বা রবীন্দ্র-ভাবনার গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও বিবেচনার যোগ্য। এ বিষয়ে একাধিক আলোচনা চোখে পড়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রমনস্ক ধীমানগণ বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বে গ্রহণ করেছেন বলে মনে হয় না। আমাদের মনে হয় এ দেশের সাংস্কৃতিক চেতনার প্রেক্ষাপট রাবীন্দ্রিক নীতিবোধ, সামাজিক চেতনা, সত্যাদর্শ ও মানবিকবোধ নিয়ে বিচার, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা দরকার।

সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে রবীন্দ্র প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত মাত্রায় উঠে আসবে, সৃষ্টি হবে রবীন্দ্র প্রাসঙ্গিকতার সচেতন পরিবেশ। আমরা দেখেছি রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একাধিক সাহিত্য সম্মেলনে দর্শক-শ্রোতার আগ্রহ। দেখেছি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে দশর্ক-শ্রোতার ভিড়। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আগ্রহ নেহাত কম নয়। শিলাইদহ বা পতিসরের মতো প্রত্যন্ত এলাকায়ও দেখেছি রবীন্দ্র জন্মোৎসব উপলক্ষে গ্রামীণ মানুষের বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতি, যা আমাদের ভিন্ন এক বার্তা পৌঁছে দেয়। একে নিতান্ত হুজুগ বলে উড়িয়ে দেয়া চলে না।

রবীন্দ্রনাথের যে পল্লী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে একদা কৃষক, তাঁতী, জেলে ও অন্যান্য শ্রমজীবী গ্রামীণ মানুষ ধর্মসম্প্রদায় নির্বিশেষে ব্যাপক হারে অংশ নিয়েছিল, সেসব কর্মকাণ্ডের রাবীন্দ্রিক ভাবনায় (যেমন ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প) এখনো সাধারণ মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষ আকর্ষণবোধ করতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস। যেমন পারে রবীন্দ্রনাথের গানের আসরে সাংস্কৃতিক চেতনার প্রকাশ ঘটাতে। রবীন্দ্রচর্চায় আগ্রহী সংস্কৃতিমনস্কদের বিষয়গুলো নিয়ে ভেবে দেখা জরুরি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj