বিশ্ব হতে চিত্তে বিহার

শুক্রবার, ১০ মে ২০১৯

মৃণাল বসুচৌধুরী

শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত যে মানুষটি তাঁর ব্যক্তিত্ব, মনন ও সৃষ্টির মূর্ছনা নিয়ে নিয়তই মূর্ত হয়ে ওঠেন আমার মনোজগতে, তিনি রবীন্দ্রনাথ।

পূজা, প্রেম, প্রকৃতিই শুধু নয়, সুখ-দুঃখ, বিরহমিলন, আনন্দ-বিষাদ, শোক-সন্তাপ, জয়-পরাজয়, স্নেহ-মায়া, সমস্ত অনুভবেই তিনি আছেন। কখনো সামনে, কখনো আড়ালে। তাঁর এই নিত্য আসা যাওয়া বুঝতে পারি অন্তর্জগতের আপন আনন্দে। এখন এই বয়সেও মৃদু ঝড়ে ওলটপালট হয়ে যায় স্মৃতি। দেখতে পাই জ্ঞান হওয়া থেকে এই সময় পর্যন্ত নানান রূপে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আমার স্মৃতিসত্তায়।

মনে পড়ে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিনই দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছিল সারি সারি লাইনে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদের পেছনে। প্রার্থনা গানের জন্য। গানটি ছিল ‘সঙ্কোচের বিহŸলতা নিজেরে অপমান/সংকটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ /মুক্ত করো ভয় /আপনা মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়।’

প্রথমদিন গাইতে পারিনি। রাত্রে মা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। ওঁর কাছেই শুনেছিলাম গানটি রবীন্দ্রনাথের লেখা। বিশ্বকবির নামের সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়। কয়েকদিনের মধ্যেই আরো দুটি গান শিখতে হয়েছিল। ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ এবং ‘খরবায়ু বয় বেগে’। এই দুটো গানও যে রবীন্দ্রনাথের লেখা সেটাও শুনেছিলাম মা’র কাছে। একটু বড়ো হতেই একজন শিক্ষক, কবিগুরুর কবিতা আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন। তাঁরই উৎসাহে বিশ্বকবির লেখা ‘মুকুট’ নাটকে অভিনয়ও করেছিলাম। এভাবেই নিজের অজান্তেই পরম আগ্রহে বিশ্বকবির সঙ্গে আমার জড়িয়ে যাওয়া।

স্কুল পেরিয়ে কলেজ, কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, বয়স যত বেড়েছে, নতুন নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি এই মহান স্রষ্টাকে। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অনবদ্য অবদানের কথা জেনেছি মুগ্ধ বিস্ময়ে। নিজের মতো করে তাঁকে বোঝার চেষ্টা করেছি, কোথাও কোথাও তাঁর সমালোচনাও করতে শিখেছি। কিন্তু তাঁর কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, ভ্রমণ কাহিনী, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে এবং থাকবে, এই বোধ থেকে নিরন্তর নতজানু হয়েছি তাঁর কাছে। জীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনস্মৃতি’ এবং পত্রসাহিত্য ‘ছিন্নপত্র’ যে কোনো ভাষার সাহিত্যের গর্ব। প্রসঙ্গত বলে রাখি এই মহাকবির অন্যান্য আরো কিছু সৃষ্টির সঙ্গে এই বই দুটিও আমার খুব প্রিয়।

প্রকৃতিই বোধহয় রবীন্দ্রনাথের জীবনে প্রধানতমা নায়িকা। প্রকৃতির সঙ্গে চিত্তবিনিময়ের লীলাই ছিল তাঁর একমাত্র লীলা। উদ্দীপন শক্তিও বলা যায়। শৈশব থেকেই প্রকৃতি প্রেমে আপ্লুত তিনি। বাড়ির শাসন তাঁকে হয়তো শৈশবে প্রকৃতির মধ্যে ছোটাছুটির সুযোগ দেয়নি। কিন্তু নিজের মত করে তিনি উপভোগ করতেন প্রকৃতিকে। জীবনস্মৃতির ‘ঘর ও বাহির’ এ তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণের মধ্যেই প্রকৃতি প্রেম স্পষ্ট।

বাবার কথায় জমিদারির এজমালি অংশ দেখাশোনা করতে শিলাইদহ গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ছিলেন প্রায় দশ বছর। এ কাজের মধ্যেও তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন নিজের আনন্দ। কখনো থাকতেন কুঠিবাড়িতে, কখনো বজরা বা নৌকায়। ঘুরে বেড়াতেন এদিক-ওদিক।

গ্রাম বাংলার সংস্পর্শে তাঁর কাব্যভাবনা পেয়েছিল এক অন্যমাত্রা। সোনারতরী, খেয়া বা অন্য সব কিছুর কথা ছেড়ে ছিন্নপত্রের কথায় ফিরি। সম্ভবত প্রথম চিঠি লিখেছিলেন ইন্দিরাদেবীকে। লিখেছিলেন- পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী তা কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়।

অসাধারণ কিছু চিঠির সম্ভার এই ‘ছিন্নপত্র’। প্রকৃতিপ্রেম শুধু নয়, অভিনব জীবনবোধ ও দর্শন ছড়িয়ে আছে প্রতিটি পঙ্ক্তিতে। একটি চিঠির কয়েকটি পঙ্ক্তি তো আমার জীবনের প্রিয়তম সঙ্গী। নিত্যসঙ্গীও বলা যায়।

‘অনেকদিন পর আবার এই বুড়ো পৃথিবীর সঙ্গে যেন দেখা-সাক্ষাৎ হলো। সেও বলল এই যে, আমিও বললুম- এই যে। তারপর দুইজনে পাশাপাশি বসে আছি, আর কোনো কথাবার্তা নেই’।

প্রথম পাঠের দিন থেকে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে, কতবার যে পঙ্ক্তিগুলো উচ্চারণ করেছি মনে মনে তার হিসাব নেই। এই পৃথিবী, এই জীবনের পাশাপাশি শব্দহীন বসে থাকারও একটা আনন্দ আছে।

শিলাইদহে কবির বসবাস ও সাহিত্যকর্ম মনে থাকবে অন্য আরো একটা কারণে। এখানে বসেই তিনি অনুবাদ করেছিলেন ‘গীতাঞ্জলি’র ৫৩টি কবিতা। ১৯১০ সালে প্রকাশিত গীতাঞ্জলির ১৫৭টি কবিতা থেকে এই ৫৩টি অনুবাদ নেয়া হয়েছিল ইংরেজি গ্রন্থের জন্য। বাকি ৫০টি কবিতা সমসাময়িক কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া। এই ১০৩টি কবিতার অনুবাদ নিয়ে ১৯১২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ংড়হমং ড়ভভবৎরহমং . এই গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন ইন্ডিয়া সোসাইটি। ভূমিকা লিখেছিলেন ডব্লিউ বি ইয়েটস। সবাই জানি এই গ্রন্থটির জন্য কবিকে নোবেল পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা করা হয় ১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর। যাইহোক এই পুরস্কার কবি নিজে গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁর হয়ে সেটি গ্রহণ করেন ওই দেশের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ক্লাইভ। পুরস্কারের শর্ত অনুযায়ী নোবেল বক্তৃতাও তিনি দিতে পারেননি সময়মতো। সাত বছর পর ১৯২১ সালের মে মাসে তিনি সেই বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আমাদের গর্বের বিষয় হলো ঐ সময় পর্যন্ত নোবেল প্রাপকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথই ছিলেন প্রথম অশ্বেতাঙ্গ।

এই নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে অনেক কথাই শুনতে হয়েছিল কবিকে। অনেকে এমন ইঙ্গিতও করেছিলেন যে ইয়েটসের ভূমিকার জন্যই এই পুরস্কার। অনেকে গভীর ষড়যন্ত্রের ছায়াও দেখেছিলেন। এমন অবান্তর কথায় এখন হাসি পেলেও কবির ওপর দিয়ে কী ঝড় গিয়েছিল, বুঝতে পারি। বিভিন্ন গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা জানি সারাজীবন কোনো না কোনো অশান্তি বা টানাপড়েনের মধ্যে দিন কেটেছে তাঁর। সৃষ্টিমূলক কাজের অনুক‚ল পরিবেশ সেই অর্থে তিনি পাননি কখনো। শুনেছি কবির নোবেল প্রাপ্তিতে খুশি হতে পারেননি ইয়েটস স্বয়ং। হয়তো বারবার নমিনেশন পাবার পরও তিনি তখনো নোবেল পাননি বলেই। ১৯০২ থেকে সাতবার তাঁর নাম উপস্থাপিত হলেও তিনি এই পুরস্কারটি পান ১৯২৩ সালে। পৃথিবীর সমস্ত পুরস্কার নিয়ে নানান কথা বলেন নিন্দুকেরা। নোবেলও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এটাও ঠিক তলস্তয়, এমিল জোলা, জর্জ মেরিদিথ, ইবসেন, হার্ডির মতো সাহিত্যিকদের নোবেল না পাওয়া বেশ দুঃখজনক।

রবীন্দ্রনাথকে নানাভাবে দেখা বা জানার ইচ্ছে থেকেই তাঁর ব্যক্তিজীবন, সংসার জীবনের ইতিবৃত্তে চোখ রাখলে বুঝতে পারি ঐ আপাত শান্ত, হাস্যময় চেহারার পেছনে কী করুণ বিড়ম্বনা, অপমান, লাঞ্ছনা, আঘাত ও অশান্তি লুকিয়েছিল। কিন্তু কোনো কিছুতেই তিনি হার মানেননি। হৃদয় মন্থন করে মানুষের সমস্ত অনুভূতিকে স্থান দিয়েছেন তাঁর লেখায়। তাই তারা প্রাণবন্ত।

দুঃখের অগ্নিস্নানে পরিশুদ্ধ হয়ে তিনি উদ্ভাসিত হয়েছেন আবার নতুন রূপে। সারাজীবনই তিনি ভাষা, ছন্দ এবং অন্যান্য বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। নিজেকে নতুনভাবে পাল্টে নেয়ার চেষ্টা করেছেন অনবরত। ষাট বছর বয়সে তিনি শুরু করেন চিত্রাঙ্কন। ফ্রান্সের একদল শিল্পীর উৎসাহে প্যারিসে তাঁর ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়। পরে সারা ইউরোপে প্রদর্শিত হয় তাঁর চিত্রাবলি।

অনেক সময় তাঁর নিজের সৃষ্টিকর্মের সমালোচনা করেছেন নিজেই। নিজের অনেক লেখা নিয়েই তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। প্রথমদিকের কাব্যগ্রন্থ কবি কাহিনী ‘বন-ফুল’কে তিনি বর্জন করেছিলেন নিজেই। ‘সন্ধ্যা-সঙ্গীত’ কাব্যাগ্রন্থ নিয়েও তিনি খুশি ছিলেন না, তবু সেটাকেই শেষ পর্যন্ত কাব্যরচনার সোপান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন যে প্রথম জীবনে রবীন্দ্রনাথের কবিতার থেকে তাঁর গদ্য অনেক সার্থক। সেসব আলোচনা বরং গবেষক ও পণ্ডিতদের জন্য তোলা থাক। একজন কালজয়ী লেখক হয়েও, শেষ জীবন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখার সাহিত্যমূল্য নিয়ে কতটা চিন্তিত ছিলেন তা বুঝতে পারি তাঁরই একটি বক্তব্য থেকে…

‘…আমার শেষ কর্তব্য হচ্ছে, যে লেখাগুলোকে মনে করি সাহিত্যের লক্ষ্যে এসে পৌঁছেছে তাদের রক্ষা করে বাকিগুলোকে বর্জন করা। কেননা, রসসৃষ্টির সত্য পরিচয়ের সেই একমাত্র উপায়। সব কিছুকে নির্বিচারে রাশিকৃত করলে সমগ্রকে চেনা যায় না।… অরণ্যকে চেনাতে গেলেই জঙ্গলকে সাফ করা চাই, কুঠারের দরকার।’

সদ্যযৌবনে হাতে পেয়েছিলাম ‘গল্পগুচ্ছ।’ অসাধারণ এক মুগ্ধতায় ভরে গিয়েছিল মন। দেনা-পাওনা, পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা, ক্ষুধিত পাষাণ, সমাপ্তি, স্ত্রীর পত্র, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, হৈমন্তী, নষ্টনীড় এবং আরো কিছু গল্প নতুন এক অধ্যায় যোগ করেছিল বাংলা সাহিত্যে। এর মধ্যে কিছু গল্প পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রায়িত হওয়ার কারণে হয়তো আরো বিখ্যাত হয়েছে, কিন্তু তাঁর গল্পগুলো শৈল্পিক সুষমায়, নান্দনিক ব্যঞ্জনায়, মানবিক ঐশ্বর্যে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিল তা স্বীকার না করে উপায় নেই। গল্পগুচ্ছ ছাড়াও তাঁর কিছু গল্প পড়েছি অন্যান্য সংগ্রহে। এক কথায় বলতে পারি সে এক অনুপম মুগ্ধতা।

ছোটবেলা থেকেই দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, বিভিন্ন মানুষের আত্মত্যাগ নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি। দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন যে সব বীরযোদ্ধারা তাদের কথা জেনেছি। এইসব জানতে জানতেই বয়স বেড়েছে। জেনেছি রবীন্দ্রনাথের স্বাদেশিকতা, জাতীয়তাবোধ বিশ্বমানবতাবোধ এবং সমাজ ও শিক্ষার সংস্কার নিয়ে তাঁর ভাবনাচিন্তার কথা। পড়েছি তাঁর লেখা স্বদেশচিন্তা বিষয়ক নানান প্রবন্ধ। সমৃদ্ধ হয়েছি। তাঁর অসীম উজ্জ্বলতায় গর্বিত হয়েছি প্রতিনিয়ত।

কিছুদিনের মধ্যেই এক বান্ধবীর সৌজন্যে পড়ে ফেলেছিলাম তিনটি উপন্যাস। ‘গোরা’ ‘ঘরে বাইরে’ ও ‘চার অধ্যায়’। এই তিনটি উপন্যাসেরই প্রেক্ষাপট রাজনৈতিক আন্দোলন, দেশপ্রেম এবং অস্থির সময়। উনিশ শতকের রাজনীতি, ধর্ম ও সমাজ ঘিরেই আবর্তিত ‘গোরা’র কাহিনী। সঙ্গে ছিল গোরার প্রেম। এই উপন্যাসের দেশপ্রেম ও ব্যক্তিগত প্রেমের দোলাচল আপ্লুত করেছিল আমায়। একইভাবে ‘ঘরে বাইরে’ ও ‘চার অধ্যায়’ হৃদয়জুড়ে ছড়িয়েছিল মুগ্ধতার রঙ। বিশেষ করে ‘চার অধ্যায়’। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, এই কাহিনীর নায়িকা এলা আমার অদৃশ্য বান্ধবী ছিল দীর্ঘদিন। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত নায়িকাদের মধ্যে এলাকেই সব থেকে সাহসী মনে হয়েছিল আমার। দেশের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছিল সে আবার অতীনের প্রেমে নিজেকে তার কাছে সমর্পণ করতে কোনো দ্বিধা ছিল না এলার। চার অধ্যায় উপন্যাসের সংলাপ ছিল খুব লিরিক্যাল। সংলাপ প্রধান এই উপন্যাস, মনে হয়েছিল প্রায় নাটকের কাছাকাছি।

কিছুদিনের মধ্যেই হাতে এসেছিল ‘চতুরঙ্গ’। একেবারে নতুন রীতির উপন্যাস। পরে জেনেছি, এই উপন্যাস লেখার আগে ৫/৬ বছর উনি কোনো উপন্যাস লেখেননি। নতুন আঙ্গিক, নতুন শিল্পরীতির সন্ধানে ছিলেন হয়তো। সেই সময় ইউরোপেও, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় নতুন রীতির চর্চা হচ্ছিল খুব। ভার্জিনিয়া উলফ, ডরোথি রিচার্ডস, জেমস জয়েস আরো অনেকেই নতুনভাবে লেখার কথা ভাবছিলেন। এ রকম একটা সময়েই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন নতুন রীতির উপন্যাস ‘চতুরঙ্গ’। এই উপন্যাসের নায়িকা দামিনীকেও আমার ভালো লেগেছিল খুব। ভালোবাসার দাবি আদায়ের জন্য, এতই একরোখা, ধর্ম, প্রথা, ঐতিহ্য কোনো কিছুরই পরোয়া করেনি। গুরুকে সে অগ্রাহ্য করেছে, শচীশের কাছে নিবেদন করেছে নিজেকে আবার সমাজকে অগ্রাহ্য করে বিয়ে করেছে শ্রীবিলাসকে। যোগাযোগ’, চোখের বালি এবং অন্য কিছু উপন্যাস ভালো লাগলেও ওই চার-পাঁচটি উপন্যাসের মধ্যেই আবর্তিত ছিল আমার পৃথিবী, কিছুদিন।

বয়স যত বেড়েছে, পাঠক হিসেবে অভিজ্ঞতাও বেড়েছে অনেক। দেশ-বিদেশের লেখকদের লেখা পড়েছি, রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ কর্মের মধ্যে মগ্ন থেকেছি, তুলনামূলকভাবে ভিন্ন চোখে তাকে দেখতে শিখেছি, মুগ্ধতা সরিয়ে বিশ্লেষণ করেছি তাঁর সৃষ্টিকে। কিন্তু অসীম প্রতিভাধর এই স্রষ্টাকে সরিয়ে রাখতে পারিনি কখনো। তবে এটাও ঠিক তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকে ছাপিয়ে দীপ্ত হয়ে ওঠে তাঁর গান। রবীন্দ্রসৃষ্টিকর্মের বিভিন্ন শাখায় নিয়ত অবগাহন করার পর আজ এই বয়সে এসে মনে হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত গানের তরী বেয়েই বোধহয় খুঁজে পাওয়া যায় তাঁকে। বুঝতে পারি আশৈশব তাঁর গানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমার ভালোবাসা, প্রণতি, আমার স্মৃতিকাব্য।

রবীন্দ্রনাথ, একটি চিঠিতে অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তীকে লিখেছিলেন- ‘যখন বাস্তব সাহিত্যের পাহারাওয়ালা আমাকে তাড়া করে, তখন আমার পালাবার জায়গা আছে, আমার গান।’

এই অনুভব আমাদের অনেকেরই। সমস্ত রকম ঈর্ষা-দ্বেষ, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের জটিলতায় পার্থিব দেয়া-নেয়ার সংকট থেকে পালিয়ে মুক্তির নিঃশ্বাস নেয়ার একটাই জায়গা আমার। রবীন্দ্রনাথের গান। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত, তাঁর গানের জন্যই তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছেন আমার হৃদমাঝারে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj