বাঁচবেন তিনি বাঁচাবেন

শুক্রবার, ১০ মে ২০১৯

জুলফিকার মতিন

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু- (১৯৪১)-র পর অর্ধ-শতকেরও বেশি সময় পার হতে চলেছে। আমরাও এসে পৌঁছেছি বাংলা পঞ্চদশ শতকে। তবে ঢাকঢোল পেটাচ্ছি ইংরেজি একুবিংশ শতাব্দী নিয়ে। যা হোক, এত দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হবার পরও তাঁর উপস্থিতি এখনো যে আমাদের মাঝে কত জীবন্ত, তা বোধকরি বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। আমাদের জীবনের সংকটে ও আনন্দে আমরা তাঁকে স্মরণ করে চলেছি প্রতিনিয়ত। কবিতা, গল্প, গান, নাটক, উপন্যাস ও নানা জাতীয় মননশীল গদ্য রচনায় সততই তিনি বাস করছেন আমাদের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ নিজে কি এতটা আশা করেছিলেন? প্রত্যেক কবি, প্রত্যেক লেখকেরই আকাক্সক্ষা থাকে বেঁচে থাকার। এই বেঁচে থাকাটা শারীরিক নয়, আপন কবিসত্তাকে জাগ্রত রাখা। মানুষের কাছে- পাঠকের মাঝে নিজের কালের সীমাকে অতিক্রম করে অনাগত সময়ে, তারা চান নিজেদের মূর্ত করে রাখতে। এই বাসনা রবীন্দ্রনাথেরও ছিল বৈকি? না হলে, প্রায় একশ বছর পরের কথাটি ভেবে, ‘১৪০০ সাল’ নাম দিয়ে কেন তিনি লিখবেন অমন কবিতা :

আজি হতে শতবর্ষ পরে

কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌত‚হল ভরে?

‘চিত্রা’ (প্রথম প্রকাশ, ফাল্গুন ১৩০২) কাব্যগ্রন্থে সংকলিত এই কবিতাটি রচিত হয়েছিল ২ ফাল্গুন, ১৩০২ তারিখে। এ কবিতা লেখার তিন যুগের মধ্যেই, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই অবশ্য আমাদের আরেক প্রধান কবি কাজী নজরুল ইসলাম একটি জবাবও দিয়েছিলেন। তাতে তিনি স্পষ্ট করে বলেও ছিলেন :

আজি মোরা শতবর্ষ পরে

যৌবন বেদনা-রাঙা তোমার কবিতাখানি

পড়িতেছি অনুরাগ ভরে।

(চক্রবাক, প্রথম প্রকাশ : ১৩৩৬)

কিংবা

শতবর্ষ পরে আজি, হে কবি-সম্রাট

এসেছে নতুন কবি- করিতেছে তব নান্দীপাঠ। (ঐ)।

কিন্তু তারপরও তো অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। আমাদের জাতীয় জীবনের নানা ক্ষেত্রে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তারই সূত্র ধরে পাঠক রুচিও পরিবর্তিত হয়েছে এবং হচ্ছে নতুনভাবে। ফলত ক্রমাগত এবং আবার নতুন করে আমাদের রবীন্দ্রনাথের দিকে ফিরে চাওয়া। তাই তো চলছে তাঁর অবস্থান মূল্যায়নের নতুন প্রচেষ্টা। এটা ঠিক যে, সা¤প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের কাছে রবীন্দ্রনাথের গুরুত্ব বেড়েছে স্বপ্ন-পূরণের বাহন রূপে। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে নতুন মাত্রা সৃষ্টি হয়, আরও আরও অনেক কিছুর সঙ্গে তার উত্তরণ ঘটে মুক্তিযুদ্ধে। পদদলিত স্বাধীনতার মূল্যবোধের পরিচর্যায় এখন আবার তিনি রৌদ্রের চিকিৎসা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন আমাদের মাঝে। তাঁর কাব্যমূল্যে চলছে আমাদের জীবন-মূল্যের বিনিয়োগ। এ সত্য, বোধ করি, অস্বীকার করবার কোনো জো নেই।

এক সময় প্রশ্ন উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতা কে পড়বে? স্বপ্নবিলাসী রোমান্টিকতা বাস্তবতার কংক্রিটে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। মানুষের বুদ্ধিমত্তা তার আবেগকে গলা টিপে মারছে। প্রেরণা নয়, অভিজ্ঞতাই হবে কবিতার শিল্পভূমি। আর অবস্থা যদি এই দাঁড়ায়, তবে কোথায় যাবেন রবীন্দ্রনাথ? না, কোথায়ও যাননি তিনি। কেন না, কবিতা তো ঢং নয়, ভড়ং নয়, কবিতা হলো মানুষের মূলীভূত চেতনার মর্মবাণী। যার ভেতর দিয়ে মানুষ জাগে। বলে :

কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,

চারিদিকে তার বাঁধন কেন?

ভাঙ রে হৃদয়, ভাঙ রে বাঁধন,

সাধ রে আজিকে প্রাণের সাধন,

… …. … …

মাতিয়া যখন উঠেছে পরাণ

কীসের আঁধার, কীসের পাষাণ!

উথলি যখন উঠেছে বাসনা

জগতে তখন কীসের ডর!

(নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, প্রভাত সংগীত, ১২৯০)

আর এই উথলি ওঠা বাসনার বন্যাবেগেই তিনি ছাপিয়ে যান অচলায়তনের বেড়া, যে বন্যাবেগের ভেতর দিয়ে সূচিত হয় মানবতারই নতুন দিগন্ত।

এটা ঠিক যে, কবি হিসেবে তাঁর সমকালে রবীন্দ্রনাথ অবিমিশ্রভাবে নিন্দিত অথবা প্রশংসিত হননি। কাব্যের বিষয়বস্তু তো বটেই, কাব্যভাষা নিয়েও সমালোচনার বিরূপ মন্তব্য তাঁকে বিদ্ধ করেছে। এই বিরূপ মন্তব্য যেমন দুর্বোধ্যতার, তেমনই অশ্লীলতার। আজকের দিনের একজন রবীন্দ্র-পাঠকের কাছে উক্ত অভিযোগ খুব মজার বলে মনে হতে পারে। কেন না শুদ্ধ কবি হিসেবে- নিছক সৌন্দর্য সৃষ্টির কবি রূপেই তার পরিচয় স্থায়িত্ব পেয়ে গেছে। রবীন্দ্রপ্রবর্তিত কাব্যধারার বিরুদ্ধে, বলা হয়, বিদ্রোহ ছিল তিরিশের কবিদেরও। আর বামপন্থি সাহিত্যবোদ্ধারা তো তাঁকে আক্রমণ করেই ছিলেন জীবন বিমুখতার ¯েøাগান তুলে। তাই ভাবতে আশ্চর্য লাগে, এত সব প্রতিক‚লতার মধ্যে, বিরুদ্ধতার মধ্যেও কালের অবক্ষয় এড়িয়ে টিকতে টিকতে তিনি এসেছেন এত দূর পর্যন্ত। তবে অবশ্যই তা অকারণে নয়। এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যা পাওয়া যায়, তা হলো, সংকট থেকে মানবতার উত্তরণ ঘটানোটাই ছিল রবীন্দ্রনাথের কবিদৃষ্টির প্রধান অবলম্বন। জীবনে-সমাজে-রাষ্ট্রে মঙ্গল চেতনার- কল্যাণবোধের প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর ব্রত। বাঙালির কবি হয়েও এ কাজে তিনি ছিলেন সর্বমানবিক। এজন্য এখনো আমাদের কাছাকাছি তাঁর অবস্থান। তদুপরি সা¤প্রতিক সময়ে এসে মানবাত্মার যে নতুনতর সংকট আমরা প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছি, তাতে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সত্যই আমাদের জীবনের সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। ‘ব্যাপ্ত হয়েছে পাপের দুর্দহন/সভ্য নামিক পাতালে যেথায় নেমেছে পাপের ধন।’

তাঁর এ উচ্চারণের বাস্তবতা কি নতুন করে বলে দেওয়ার? হিংস্রতা, অন্ধতা, মূঢ়তার যে আক্রমণ শুরু হয়েছে, তাতে এত দিনের মানবিক অর্জনই দাঁড়িয়েছে বিনাশের মুখোমুখী। মানুষ নিজেই হয়ে দাঁড়াচ্ছে নিজের সৃষ্ট সভ্যতার হন্তারক। এরচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য আর কি আছে মানুষের জীবনে? আর এ জন্যই রবীন্দ্রনাথের কবিতাতে আমরা খুঁজছি আশ্রয়। আমরা তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে পারছি, ‘মাটির পৃথিবী মানবের তরে, দানবের তরে নয়।’

সন্দেহ নেই, রবীন্দ্রনাথ আস্তিক কবি। কেবল আস্তিক বললে বোধকরি কথাটা সম্পূর্ণ হয় না। সম্প্রদায়গতভাবে তিনি ছিলেন নিরাকার একেশ্বরবাদী। রামমোহন রায় যে ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন, পৌত্তলিক ধর্মের সঙ্গে তার পার্থক্য ছিল মৌলিক। নিরাকার একেশ্বরবাদিতাই ছিল ব্রাহ্মধর্মের মূল। এই নিরাকার একেশ্বরবাদী ধর্মচিন্তার ভিত্তিতে তিনি যখন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা ঘটান, ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় হিন্দুসমাজ হয়ে উঠেছিল খড়গহস্ত। আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথের পরিবার- জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারও এই ব্রাহ্মসমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার একজন নেতাও হন। আমার এ কথা বলার উদ্দেশ্য অবশ্য এক শ্রেণির বাঙালি মুসলমান যেখানে রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু পৌত্তলিক বলে প্রত্যাখ্যান করার অপচেষ্টায় লিপ্ত, সেখানে তাঁর পারিবারিক একেশ্বরবাদিতার তথ্য দিয়ে তাঁকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রয়াস নয়। আর হিন্দুত্ব, মুসলমানত্ব কিংবা ব্রাহ্মত্ব দিয়ে কোনো কবির বিচার হয়ও না। বরং এই হিন্দুত্ব, মুসলমানত্ব কিংবা ব্রাহ্মত্বের সংকীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে একজন কবিকে আবদ্ধ করা হলে তার সৃষ্টির মহত্ত্ব খর্বই হয়। মূর্খরা একথা না বুঝলেও কবিদের কাছে তা অজানা নয়। কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বলেন, যে কুলে আমি জন্মেছি সে আমার দৈব, তাকে অতিক্রম করতে পেরেছি বলেই আমি কবি। তবে ঈশ্বর বিশ্বাস কিংবা আস্তিকতা একটা ব্যাপক জিনিস। এই ব্যাপকতার উপলব্ধি যাদের নেই, তারাই নিজেদের কারও জন্য আল্লাহ, কারও জন্য ভগবান, কারও জন্য গড তৈরি করে নানা রকম অনর্থের জন্ম দেয়। দ্বেষ-বিদ্বেষ থেকে শুরু করে মারামারি, হানাহনি, এমনকি শতাব্দীব্যাপী ধর্মযুদ্ধ-ক্রুসেডেরও সূচনা ঘটায়। অন্য পক্ষে ঈশ্বর বিশ্বাস কিংবা আস্তিকতার উপলব্ধি সার্বজনীন। আর এই সার্বজনীনতার বোধ থেকে যে কবিচৈতন্যের পরিচয় পাওয়া যায়, তা এক জনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রূপেই নির্দেশিত হতে পারে। রবীন্দ্রনাথেরই একটি গানে আছে, ‘শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে’।

গানটি পূজা পর্যায়ের। একজন আস্তিক কবির পক্ষেই এমনটি বলা সম্ভব। তাদের দৃষ্টিতে সৃষ্টির বিশালতা ও বৈচিত্র্যের কোনো শেষ নেই- শেষ নেই স্রষ্টারও সৃষ্টি-চঞ্চলতার। এ সবের মধ্যে যে রহস্যময়তা আছে, তার জাল ভেদ করার আকাক্সক্ষা ও সাধনাও আস্তিক মানুষের চিরকালের। কিন্তু তার আকাক্সক্ষার অচরিতার্থতা ও সাধনার বিফলতাও সদা সত্য। তবে এই অচরিতার্থতা ও বিফলতার ভেতর দিয়ে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মহিমাও তার কাছে চির জাগরুক। এখন কথা হলো, একজন কবিও স্রষ্টা। অনেকেই তাকে বলেন দ্বিতীয় ঈশ্বর। তার মধ্যে যে সৃজনশীলতা রয়েছে, তাই তাকে এই অভিধায় চিহ্নিত করতে প্ররোচিত করে। যে সৃষ্টি কবি করেন, তাও ঈশ্বরের সৃষ্টির মতোই বিশাল। বৈচিত্র্যময়। যে রহস্যময়তা সেই সৃষ্টির ভেতরে আছে, তার অর্থ উদ্ধারের অধ্যবসায়ী প্রয়াসও থেমে থাকে না কখনো। নানা জনে নানাভাবে নানা দিক দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। নানা ব্যাখ্যা উঠে আছে সেখান থেকে। এরও শেষ নেই বলেই, বোধ করি শেষ কথাটি বলা যায় না। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একথাটি বোধহয় আরো সত্য। যতই দিন যাচ্ছে, ততই চলছে তাঁকে নতুন করে আবিষ্কারের চেষ্টা।

এটা ঠিক যে, রবীন্দ্র-সমালোচনার ক্ষেত্রে আমরা ইতিমধ্যেই নানা ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। তাঁর কবিতায় প্রেম ও প্রকৃতি কিংবা জীবন ও জগৎ কীভাবে মূর্ততা পেয়েছে, সাধারণভাবে এসবই আমাদের এই অভিজ্ঞতার ভিত্তি। সৌন্দর্যের দিক থেকে- বস্তুনিরপেক্ষ মনোভাবের দিক থেকে তাঁর প্রথম দিকের কাব্য বিচার প্রথাগত শিল্প সমালোচনার রীতিকেই অনুসরণ করেছে। ইংরেজি রোমান্টিক কবিদের বহু চর্চিত মূলধনকে তিনি যেভাবে নিজ মণীষা ও ভারতবর্ষীয় ঐতিহ্যের সমীকরণে অনন্য করে তুলেছেন, তার জন্য ওই মানদণ্ডই ছিল স্বাভাবিক। সে সময়ে তার কাব্যের অর্থহীনতা ও অশ্লীলতা নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছিল, তারও ভিত্তি ছিল ওই মানদণ্ডই।

পাশ্চাত্য রোমান্টিক কবিদের উত্থানের পেছনে যে সামাজিক অনিবার্যতা ছিল, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও অনেকটা সে রকমই দেখা যায়। ধর্মীয় আচার ও সমাজ শৃঙ্খল থেকে ব্যক্তির মুক্তিই ছিল সেই অনিবার্যতা। আর এর পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রভাব। বঙ্গদেশীয় তথা ভারতবর্ষীয় ঔপনিবেশিক সমাজে পুঁজি সংগঠন যৌক্তিক কারণে সীমাবদ্ধ থাকলেও বুর্জোয়া শিক্ষা গ্রহণের দুয়ার রুদ্ধ ছিল না। বাঙালি হিন্দুসমাজে ও পরবর্তীতে বাঙালি মুসলিমসমাজে যে সংস্কার আন্দোলনগুলোর জন্ম হয়, তার পেছনেও রয়েছে ওই শিক্ষার কার্যকারিতা। বস্তুত রবীন্দ্রনাথের কবিতা ছিল ওই সমাজ রূপান্তরের শিল্পিত রূপ। তৎসত্ত্বেও প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তী কালে রবীন্দ্রনাথের কবিতা প্রত্যাখ্যান করার এক সংঘবদ্ধ উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। কারণ ততদিনে সামাজিক শোষণ মুক্তির প্রশ্নে নতুন চিন্তার আবির্ভাব হয়েছে। মার্কসের দর্শন ও রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব উৎপাদন সম্পর্ক ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ভারতবর্ষেও এর প্রভাব হয়েছে সুদূরপ্রসারী। রবীন্দ্রনাথের শ্রেণি অবস্থান বিবেচনা করেই তাঁর রচিত সাহিত্য উক্ত দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়- এটাই ছিল অভিযোগ। জীবন সংগ্রাম ও তার ছবি এবং তা দরিদ্র শোষিত মানুষের- রবীন্দ্রসাহিত্যে নেই বলেই এই সরলীকৃত প্রস্তাবনা। এই যান্ত্রিক তত্ত্বীয় বিচার যে নিতান্তই অবিবেচনা প্রসূত, তা হয়তো বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু যে দেশে বুর্জোয়া বিপ্লবই হয়নি, সে দেশের কবি রবীন্দ্রনাথকে ‘বুর্জোয়া কবি’ বলে গালি দেয়ার ঐতিহাসিক ঘটনাও হাস্যকর বৈকি?

এমনিতেই প্রত্যেক কবিরই একটি শ্রেণি ও সামাজিক অবস্থান থাকে। তার কবিচৈতন্য ও জীবন প্রত্যয় গড়ে ওঠে তারই ভিত্তিতে। কাব্য-সৃষ্টিও হয়ে থাকে পরিবেশ ও তৎ-সংশ্লিষ্ট উপাদান নির্ভর। কিন্তু কবি কি সেই শ্রেণি অবস্থান ও পরিবেশগত উপাদানের ক্রীতদাস হবেন? বিশেষত সেই শ্রেণি অবস্থান ও পরিবেশগত উপাদান যদি হয় প্রতিক্রিয়াশীল? অনেক কবি নামধারীরা তা হয়েছেনও বৈকি? কিন্তু রবীন্দ্রনাথ?

না, তিনি অতিক্রম করে গেছেন এই সব সীমাবদ্ধতাকে। বিরাজমান বাস্তবতা, তা সে যে সমাজেরই হোক, ধর্মেরই হোক, সম্প্রদায় কিংবা আর যারই হোক, তার সঙ্গে মানবাত্মা আর মানবিকতাবোধের যে সংঘাত, সেটাই ছিল রবীন্দ্র্রসাহিত্যের মৌল বিষয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গটি নিয়ে এসে তার সাহিত্যের রস উপলব্ধিকে করা হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। ঠিক আছে, রবীন্দ্রনাথ মুসলমান ছিলেন না, মুসলমানদের নিয়ে তিনি লেখেননি। না লেখাটাই স্বাভাবিক। সাধারণভাবে মুসলমান লেখকদের বেলাতেও এ কথা প্রযোজ্য যে, তারাও হিন্দু জনজীবনকে তাদের লেখার উপজীব্য করেননি। এক কাজী নজরুল ইসলাম যতটুকু লিখেছেন, তাতে তাঁর পুরস্কার জুটেছিল কাফের বলে। আসলে লেখকেরা নিজেদের পরিবেশগত- ঐতিহ্যগত- সংস্কৃতিগত বিষয়গুলোকেই নিয়ে আসেন তাদের লেখায়। তার ভেতর দিয়েই চলে মানবাত্মার পরীক্ষা।

কাজেই এজন্য রবীন্দ্রনাথকে অভিযুক্ত করার কী আছে? তিনিও তাঁর লেখার উপাদান সংগ্রহ করেছেন তাঁর চারপাশ থেকে। এখন যদি বলি সেটা হিন্দুসমাজ, সেটাও ঠিক আছে, তবে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে ধর্মীয়-সামাজিক শৃঙ্খলের সঙ্গে মানবাত্মার যে সংঘাত, তার যে রক্তাক্ত রূপ, তা কত বিশ্বস্তভাবে ফুটে উঠেছে সেখানে। তিনি ধর্মের জয়ঢাক বাজাননি, উপস্থাপিত করেছেন মানুষেরই সংকটাপন্ন আত্মাকে। এখানেই তাঁর শিল্প সৃষ্টির চিরচলিষ্ণুমানতা, যা তাঁকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে কাল থেকে কালান্তরে। এজন্যই বলি তিনিও বাঁচবেন, আমাদেরও বাঁচাবেন।

আরেকটি কথাও বলি। রবীন্দ্রনাথ ‘১৪০০ সাল’ কবিতাটির ভেতর দিয়ে যা বলতে চেয়েছেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে নজরুল ব্যতিরেকে অন্য কারো কোনো কবিতা আছে কি-না, ঠিক বলতে পারছি না। তবে তাঁর সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে এসে আমি একটি কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলাম, সেটি ছিল এ রকম :

‘আজ থেকে শতবর্ষ আগে

কে তুমি লিখেছ বসে অমন কবিতাখানি প্রগাঢ় আবেগে?

সেদিনের বসন্তের আনন্দের ভার

প্রস্ফুটিত ফুলের সুবাস

বিহঙ্গের গান আর রক্তরাগে আঁকা ছবি

অনুরাগে সিক্ত করে পাঠিয়েছ আমাদের ধূলির সংসারে।

সুদূরের মর্ম থেকে ভেসে আসা মুগ্ধ বাতাস

উদ্বেলিত হৃদয়ের দ্বারে এসে বারে বারে করাঘাত করে

অতীতের গন্ধমাখা প্রাচীন স্বপ্নের মায়া কি আবেশে শুধুই জড়ায়!

যে স্বপ্ন ভাণ্ডার তুমি রেখেছিলে বক্ষের ভেতরে সযতনে

দিগন্ত প্রসারী তার বর্ণচ্ছটা প্রতিভাস লাবণ্যবিলাসে

হীরক দ্যুতিতে জ্বলে শাশ্বত হয়ে।

খুলে দিয়ে দখিন দুয়ার

বাতায়নে বসে দেখি

আকাশ ছুঁয়েছে মাটি দিগন্তের কোল ঘেঁসে আত্মীয়ের মতো।

তখনও এমন ছিল …. রোমাঞ্চিত কল্পনারা ডানা ঝাপটায়….

সমস্ত প্রকৃতি জোড়া বাঁধাবন্ধহীন পাখী পুলকে চঞ্চল

নিখিলের মর্মবাণী হৃদয়ের মীড়ে এসে দোল খায় উন্মত্ত অধীর,

তোমার পাঠানো এই লিপি

আমাদের নিয়ে যায় শতবর্ষ পূর্বের পুষ্পরেণুগন্ধমাখা অমর্ত ভুবনে।

এখনও কবিরা

বসন্ত দিনের গান লিখে দেয় উচ্ছ¡সিত অন্তরের প্রবল জোয়ারে,

তাদের কণ্ঠে ফোটে চিরায়ত জীবনের তরঙ্গিত ঢেউয়ের প্রতাপ,

যৌবন দীপ্তরাগ

অসংকোচ প্রকাশের মহিমায় ভরে তোলে মর্তভূমি- অধরা আকাশ।

যে বসন্ত অভিবাদন প্রেরণ করেছ তুমি তাদের সমীপে,

তারই মালা গেঁথে তারা

হৃদয় অর্ঘ ভরা সাজিয়ে সুবর্ণ ডালি পাঠায় তোমার কাছে

নব অনুরাগে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj