হাস্যরসিক রবীন্দ্রনাথ : জহিরুল ইসলাম

বুধবার, ৮ মে ২০১৯

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক অনেক লেখালেখি করেছেন। তার লেখা গানের সংখ্যাই ২২৩২টি। চিন্তা করা যায়! শুধু লেখাই না, এসব গানে তিনি সুরও করেছেন। গান ছাড়াও তিনি কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক আর প্রবন্ধ লিখেছেন অনেক। তার রয়েছে ৫২টি কবিতার বই। লিখেছেন ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন। ছোটগল্প লিখেছেন ৯৫টি। ‘গল্পগুচ্ছ’ বইয়ে তার ছোটগল্পগুলো এবং ‘গীতবিতান’ বইয়ে তার গানগুলো সংকলিত হয়েছে। এসব লেখালেখি ছাড়াও তিনি প্রায় দুই হাজার ছবিও এঁকেছিলেন।

শুধু বড়দের জন্যই নয়, শিশুদের জন্যও তিনি রচনা করেছেন অনেক ছড়া, কবিতা, গান ইত্যাদি ইত্যাদি। শিশু, শিশু ভোলানাথ, খাপছাড়া, ছড়া ও ছবি, গল্পসল্প, কল্পনা, সহজপাঠ ইত্যাদি গ্রন্থ তিনি শিশুদের জন্য রচনা করেছেন। এতসব লেখালেখির কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে গণ্য করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখাই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

লেখালেখি ছাড়াও তিনি অভিনয় করেছেন, গানও গেয়েছেন। আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা, তা তো আমরা সবাই জানি। ভারতের জাতীয় সংগীতও কিন্তু তার লেখা। ভালোবেসে লোকজন তাকে গুরুদেব, কবিগুরু, বিশ্বকবি ইত্যাদি নামে ডাকে।

এতসব লেখালেখির মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত হাস্যরসিক। তারই কয়েকটি গল্প আজ শোনাব তোমাদের।

শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক বিধুশেখর শাস্ত্রীকে কবিগুরু একবার লিখে পাঠালেন, ‘আজকাল আপনি কাজে অত্যন্ত ভুল করছেন। এটা খুবই গর্হিত অপরাধ। এজন্য আগামীকাল বিকেলে আমি আপনাকে দণ্ড দেব।’ দণ্ড দেওয়ার অর্থ শাস্তি দেওয়া। দণ্ড শব্দের আরেকটি অর্থও আছে। সেটা হলো লাঠি।

গুরুদেবের এমন কথায় শাস্ত্রী মশাই তো ভয় পেয়ে গেলেন। কী এমন অন্যায় তিনি করেছেন যার জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে? চিন্তিত ও শঙ্কিত বিধুশেখর শাস্ত্রী নির্ঘুম রাত কাটিয়ে পরদিন উপস্থিত হলেন কবির কাছে। কবি তাকে বেশ কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখলেন। অবশেষে পাশের ঘর থেকে একটি লাঠি হাতে

বেরিয়ে এলেন। শাস্ত্রী মশাই ভাবলেন, সত্যি বুঝি আজ তার মাথায় লাঠির বাড়ি পড়বে। কবিগুরু লাঠিটি তার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, এই নিন আপনার দণ্ড। সেদিন যে এখানে ফেলে রেখে গেছেন, তা একদম ভুলে গেলেন!

আরেক দিনের কথা। শান্তিনিকেতনে একটি লোক এসে অনেকদিন ধরে থাকছে। তাও সপরিবারে। খাচ্ছে দাচ্ছে, দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাওয়ার নাম পর্যন্ত নেই। অনেকদিন পর একদিন লোকটি লটবহর নিয়ে বেরিয়েছে। পথে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা। রবীন্দ্রনাথ তাকে দেখে বললেন, তা যাচ্ছেন বুঝি!

আজ্ঞে গুরুদেব।

আরও কটা দিন থেকে গেলেই পারতেন।

লোকটি বলল, গুরুদেব যখন বলছেন, তবে তো থাকতেই হয়। বলে লোকটি আবার সপরিবারে থাকার জন্য ফিরল।

লোকটির ফিরে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ বললেন, মানুষের সঙ্গে কি ভদ্রতাটুকুও করা যাবে না!

একবার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকের মহড়া চলছিল। নাটকে রঘুপতি সেজেছিলেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর জয়সিংহের ভূমিকায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একটা দৃশ্য ছিল এমন, জয়সিংহের মৃতদেহের ওপর আছড়ে পড়ে শোকবিহŸল রঘুপতি।

দৃশ্যটার মহড়া চলছিল বারবার। দীনেন্দ্রনাথ বাবু ছিলেন কিছুটা মোটাসোটা ধরনের। বারবার তার ভার বহন করা কবিগুরুর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল। একবার দীনেন্দ্রনাথ একটু বেকায়দায় রবি ঠাকুরের ওপর আছড়ে পড়লেন। রবীন্দ্রনাথ কঁকিয়ে উঠে বললেন, ওহে দিনু, মনে করিস নে আমি সত্যি সত্যিই মারা গেছি।

অন্য একটি ঘটনা। ঔপন্যাসিক ও কবি মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়িতে বেড়াতে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রোজই তার জন্য বিভিন্ন রকমের খাবারদাবার রান্না হয়। একদিন মগজ রান্না করা হলে রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করলেন, এ পদার্থটি কী?

মৈত্রেয়ী দেবী উত্তর দিলেন, মগজ।

কবিগুরু দুষ্টুমি করে বললেন, বিশ্বকবির ‘ব্রেনে’ ঘাটতি পড়েছে, এ কথাটি সোজাসুজি বললেই হতো! এত কৌশল করা কেন?

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন কথাশিল্পী প্রমথনাথ বিশী। একবার প্রমথনাথ বিশী কবিগুরুর সঙ্গে শান্তিনিকেতনের আশ্রমের একটি ইঁদারার (কুয়া) পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে একটি গাবগাছ লাগানো ছিল। কবিগুরু হঠাৎ প্রমথনাথকে উদ্দেশ করে বলে উঠলেন, জানিস, একসময় এই গাছের চারাটিকে আমি খুব যতœসহকারে লাগিয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল, এটা অশোকগাছ; কিন্তু যখন গাছটি বড়ো হলো, দেখি, ওটা অশোক নয়, গাবগাছ।

এরপর কবিগুরু প্রমথনাথের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে যোগ করলেন, তোকেও অশোকগাছ বলে লাগিয়েছি, বোধকরি তুইও গাবগাছ হবি।

একবার রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী একসঙ্গে বসে সকালের নাশতা করছিলেন। গান্ধীজি লুচি পছন্দ করতেন না, তাই তাকে ওটসের পরিজ খেতে দেওয়া হয়েছিল; আর রবীন্দ্রনাথ খাচ্ছিলেন গরম গরম লুচি।

গান্ধীজি তাই দেখে বলে উঠলেন, গুরুদেব, তুমি জানো না যে তুমি বিষ খাচ্ছ।

উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বললেন, বিষই হবে; তবে এর অ্যাকশন খুব ধীর। কারণ আমি গত ষাট বছর ধরে এই বিষই খেয়ে চলেছি।

সাহিত্যিক বনফুল তথা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের এক ছোটোভাই বিশ্বভারতীতে পড়ার জন্য শান্তিনিকেতনে এসেই কার কাছে যেন শুনলেন, রবীন্দ্রনাথ কানে একটু কম শোনেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গেলে রবীন্দ্রনাথ বললেন, কী হে, তুমি কি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি?

তখন বলাইবাবুর ভাই চেঁচিয়ে জবাব দিলেন, আজ্ঞে না, আমি অরবিন্দ।

রবীন্দ্রনাথ তখন হেসে বললেন, না কানাই নয়, এ যে দেখছি একেবারে শানাই।

আরেকবার কালিদাস নাগ নামে এক ব্যক্তি এবং তার স্ত্রী জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথ মৃদুহাস্যে নাগ-দম্পতিকে প্রশ্ন করলেন, শিশু নাগদের কোথায় রেখে এলে?

জীবনের শেষদিকে এসে রবীন্দ্রনাথ একটু সামনের দিকে ঝুঁকে উপুড় হয়ে লিখতেন। একদিন তাকে ওইভাবে লিখতে দেখে একজন বলল, আপনার নিশ্চয় ওভাবে উপুড় হয়ে লিখতে কষ্ট হচ্ছে। বাজারে এখন এরকম অনেক চেয়ার আছে যেগুলোতে আপনি হেলান দিয়ে বেশ আয়েশের সঙ্গে লিখতে পারেন। ও রকম একটা আনিয়ে নিলেই তো পারেন।

লোকটার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে রবীন্দ্রনাথ বললেন, তা তো পারি। তবে কি জানো, এখন উপুড় হয়ে না লিখলে কি আর লেখা বেরোয়! পাত্রের জল কমে তলায় ঠেকলে একটু উপুড় তো করতেই হয়।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj